Class 10 History Question Bank solved

১. এক কথায় উত্তর দাও (প্রশ্নের মান-১)

Table of Contents

(ক) 1857 In Our History’ গ্রন্থের লেখক কে?

উ:- পি.সি যোশী

(খ)১৯ শতককে সভা সমিতির যুগ কে বলেছেল?

উ:-কেমব্রিজ ঐতিহাসিক ড: অনীল শীল

(গ)ভারতবাসীর প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কোনটি?

উ:-বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা।

(ঘ)জমিদার সভার প্রথম সভাপতি কে ছিলেল?

উ:-রাজা রাধাকান্ত দেব

ঙ) A Nation in Making কার আত্মজীবনী

উ:- সুরেন্দ্রনাথ বন্ধোপাধ্যায়

(চ)মাতৃভাষা সংবাদপত্র আইন প্রত্যাহার করা হয় কার আমলে?

উ:-বড়োলাট লর্ড রিপনের সময়

(ঘ)বর্তমান ভারত’ প্রথম কোল পত্রিকায় একাশিত হয়?

উ:- উদ্বোধন পত্রিকা

(জ)উর্দিধারী কৃষক কাদের বলা হত?

out of syllabus(2022)

(ঝ)বিদ্রোহী বাঙালী’ গ্রন্থের লেখক কে?

উ:- রমেশ গোস্বামী

(9)বাংলার মুকুটহীন বাজা কাকে বলা হয়?

উ:-সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

(ট) ভারতের প্ৰথম ভাইসরয় কে ছিলেন?

উ: – লর্ড ক্যানিং

(ঠ) কোন কবিকে স্বাধীনতার অগ্রদূত বলা হয়?

 

২. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও (প্রশ্নমান-২)

(ক) ১৮৫৭ এর সিপাহী বিদ্রোহকে মহাবিদ্রোহ বলা হয় কেন?

উ: – 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ , মহাবিদ্রোহ, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পরিচিত। এঁতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্যের জন্য এবং নামকরণ বিতর্ক এড়ানোর জন্য ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে মহাবিদ্রোহ বলা হয় কারণ, ইতিপূর্বে এতো ব্যাপক এবং বড়ো বিদ্রোহ ভারতে হয়নি।তাই এর বিস্তৃতি এবং জনগনের ব্যাপক সমর্থনের জন্য একে মহাবিদ্রোহ অ্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

(খ)মহাণীর ঘােষণাপত্র বলতে কী বােঝ?

উ: – মহাবিদ্রোহের পর ইংল্যাণ্ডের রাজনৈতিক মহল মনে করে যে, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের শাসনভার থাকা উচিত নয়। এই কারণে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর এলাহাবাদে এক দরবারের আয়োজন করে মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতীয়দের কাছে কোম্পানির ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা এক ঘোষনা পত্রের মাধ্যমে পেশ করেন এই ঘটনা ইতিহাসে মহারানীর ঘোষণাপত্র বা Queen’s Proclamation নামে পরিচিত

(গ)জমিদার সভার প্রধাণ উদ্দেশ্য কী ছিল?

উ: – 1838 খ্রিস্টাব্দের 12 নভেম্বর কলকাতার বিশিষ্ট জমিদাররা গড়ে তোলেন ‘জমিদার সভা’ বা ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি।
জমিদার সভার উদ্দেশ্য : 
(i) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা প্রদেশের জমিদারদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও স্বার্থ রক্ষা করা, (ii) ভারতের সর্বত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রসার ঘটানো,(iii) ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রকে জমিদারদের অনুকূলে আনা, (iv) নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত হতে না দেওয়া, (v) রাজস্ব, বিচার ও পুলিশ বিভাগের সংস্কার সাধনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো ইত্যাদি।

 ঘ) মঙ্গল পান্ডে স্মরণীয় কেন?

উ: – মঙ্গল পান্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনা ছাউনির ৩৪ নং নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সিপাহি। তিনিই প্রথম গোরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত এনফিল্ড রাইফেলের টোটার মোড়ক দাঁতে কাটতে অস্বীকার করেন। এর বিরুদ্ধে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ তিনি প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অতঃপর তাকে গ্রেপ্তার করা হলে বিদ্রোহের আগুন অন্যান্য ছাউনিতে ছড়িয়ে পড়ে। ৮ এপ্রিল বিচারে তার ফাঁসি হয়। তিনিই ছিলেন সিপাহি বিদ্রোহের প্রথম নায়ক’ ও শহিদ। এই জন্য তিনি আজও ভারত ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে আছেন

ঙ) ইউরোপীয়বা ইলবার্ট বিলের বিবাধিতা করেছিল কেন?

উ: – উদারপন্থী শাসক লর্ড রিপন তার আইন সচিব কোর্টনি পি ইলবার্টের মাধ্যমে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার জন্য একটি বিল প্রস্তুত করেন। এটি ‘ইলবার্ট বিল’ নামে পরিচিত।
ইলবাট বিলের সংশোধন : এই বিলে ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচারের অধিকার দান করা হলে শাসক জাতি শ্বেতাঙ্গরা তা মানতে অস্বীকার করে। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ব্রানসন-এর নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’। ভারত ও ইংল্যান্ডে ইংরেজরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। বাধ্য হয়ে লর্ড রিপন জুরি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে বিলের সঙ্গে মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য মেনে নেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারতসভা এই বিলের স্বপক্ষে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।

(চ) নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন কী?

ভারতে ব্রিটিশ শাসনাধীন সংবাদ প্ত্রের মতাে সমকালীন নাটকগুলিও জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশে সাহায্য করেছিল । গ্ৰাম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত নাটকগুলিতে ভারতবাসীর দরিদ্রতা , ব্রিটিশের আর্থিক শােষণ , অত্যাচার ও নিপীড়ণের কাহিনি তুলে ধরা হলে জনমানসে ব্রিটিশ বিরােধী প্রতিক্রিয়া তীব্র হয় । ব্রিটিশ সরকার সাধারণ ভারতবাসীর ওপর নাটকগুলির প্রভাব দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়ে । এই জন্যে বড়োলাট নর্থব্রূক  ১৮৭৬ খ্রি. ১৪ মার্চ  যে আইন পাসের মাধ্যমে নাটক প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তা নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন নামে পরিচিত

ছ) হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠার দুটি উদ্দেশ্য লেখাে।

উ: –১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে কলকাতায় ‘জাতীয় মেলা’ বা ‘চৈত্র মেলা’ বা ‘হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য ; (i) বাংলা তথা ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যবোধ জাগ্রত করা, (ii) হিন্দুধর্মের অতীত গৌরবগাথা ছড়িয়ে দেওয়া, (iii) সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটানো বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করা,

(ত) বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কবে কেন গড়ে উঠেছিল

 

(ঝ) কী উদ্দেশ্যে সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল?

ইলবার্ট বিল আন্দোলন ভারতীয়দের কাছে ছিল শাপে বর । কারণ তখনও পর্যন্ত বেশ কিছু সংখ্যক ভারতীয়দের ইংরেজদের অভিপ্রায় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না । ইলবার্ট বিল আন্দোলনের ফলে ইউরোপীয়দের বর্ণবিদ্বেষ ও ভারতীয়দের প্রতি ঘৃণা তাঁদের চোখ খুলে দেয় । তাঁরা উপলবদ্ধি করেন ভারতবাসী মাত্রেই ইংরেজদের চোখে ঘৃণার পাত্র ও নিজেদের সম্মান সম্পর্কে সচেতন হন । এর ফলশ্রুতিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্নমুখী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটলে ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ এক সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন । এই উদ্দেশ্যে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় রামতনু লাহিড়ীর সভাপতিত্বে জাতীয় সম্মেলন [All India National Conference -1883] আহ্বান করেন ।

(ঞ) ভারতমাতা চিত্রটির নামকরণ কীভাবে হয়েছে?

1902 খ্রিস্টাব্দে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গমাতা’ চিত্র অঙ্কন করেন। পরে ভারতের স্বদেশি আন্দোলনের আবহে 1905 খ্রিষ্টাব্দে তা ভারতমাতা রুপে খ্যাতি লাভ করে।ভারতমাতা ছবিটির মধ্য দিয়ে বিমূর্ত অর্থাৎ অদৃশ্য জাতীয়তাবাদের ধারনা মূর্ত অর্থাৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো। ছবিটির মধ্য দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের “আত্মনির্ভরশীলতার ভাবধারা” এবং “সনাতন ভারতের ঐতিহ্যের রূপটিকে” একত্রিত করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। স্বদেশী আন্দোলনে ছবিটি জাতীয়তাবাদের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো।

৩। নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রশ্নের মান-৪)

(ক)মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনােভাব কীরকম ছিল?

ভুমিকাঃ- 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে সেই সময়ের শিক্ষিত বাঙালি সমাজ সমর্থন করেনি; উপরন্তু তারা বিদ্রোহী সিপাহিদের ও বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত নেতানেত্রীদের ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছিল। শিক্ষিত বাঙালি সমাজ এই বিদ্রোহে বিদ্রোহীদের পরাজয় ও ব্রিটিশদের জয় কামনা করেছিল।

শিক্ষিত বাঙালি সমাজের বিরোধিতার কারণ :- শিক্ষিত বাঙালি সমাজ বিভিন্ন কারনে 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল। মধ্যযুগীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভয়ে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ মনে করেছিল বিদ্রোহীরা জয়লাভ করলে ভারতে আবার মধ্যযুগীয় মুঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। তারা মধ্যযুগীয় মুঘল শাসনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।  শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ছিল আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কারের সমর্থক। তারা মনে করেছিল বিদ্রোহীরা জয়ী হলে তাদের সামন্ততান্ত্রিক শাসনে আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কারের অবসান ঘটবে। আধুনিকতার অবসানের ভয়েও তারা সমর্থন করেননি।

বিরোধীতা;-

  1. সভা করে বিরোধিতা করা:- বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজা রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা হয়। সভায় বিদ্রোহীদের নিন্দা করা হয়।
  2. মেট্রোপলিটন কলেজের সভা:-রাজা রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে বিদ্রোহবিরোধী আরও একটি সভা হয় মেট্রোপলিটন কলেজে(26শে মে, 1857 খ্রি.)। এই সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, কমলকৃষ্ণ বাহাদুর, হরচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। তারা সরকারকে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সভায় প্রস্তাব পাস করেন এবং সরকারের কাছে তা পেশ করেন।
  3. পত্রপত্রিকায় বিরোধিতা:-সংবাদ ভাস্কর, সংবাদ প্রভাকর প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজ বিদ্রোহীদের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন যে, ‘হে বিঘ্ন হর….. ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের জয়পতাকা চিরকাল সমভাবে উড্ডীয়মান কর। অত্যাচারি অপকারি বিদ্রোহকারি দুর্জনদিগকে সমুচিত প্রতিফল প্রদান কর।” এছাড়াও বিভিন্ন গ্রন্থ সমূহেও বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নানাভাবে বিরোধিতা করেছিল।

যাইহোক খুব শীঘ্রই বাঙালি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভুল ভেঙে যায়, তাদের সামনে ব্রিটিশ সরকারের নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয়। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকারের দমন মূলক কার্যকলাপ লক্ষ্য করে শিক্ষিত বাঙ্গালীদের ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মোহ ভঙ্গ হয়েছিল এবং তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী হয়েছিলেন।

খ)মহাবিদ্রোহকে কী ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা যায়?

ভূমিকাঃ- 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ, মহাবিদ্রোহ, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ যুক্তি সহকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকার তার Indian War of Independence গ্রন্থের সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করেছেন।

পক্ষে যুক্তিঃ-

  1. ইংরেজ কোম্পানির দীর্ঘকালের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ছিল ভারতবর্ষের বুকে জনগণের জ্বলন্ত প্রতিবাদ।
  2. বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাতে চেয়েছিল।
  3. 1857-সালের বিদ্রোহ সমগ্র ভারতে না হলেও এমনকি এর কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য না থাকলেও অধিকাংশ ভারতীয়ই মনেপ্রাণে ইংরেজদের বিতাড়ন চেয়ে বিভিন্ন  সম্প্রদায়ের লোক এক সঙ্গে লড়েছিল এবং দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট করেছিল।
  4. ইংরেজ-বিরোধী এত ব্যাপক আন্দোলন ভারতে আর হয়নি। তাই গতানুগতিক বিচার না করে এই অভূখানকে স্বাধীনতার সংগ্রাম বলাই যুক্তিযুক্ত।

উপসংহারঃএই বিদ্রোহকে নিছক সিপাহি বিদ্রোহ,সামন্ত বিদ্রোহ বা সনাতনপন্থীদের বিদ্রোহ কিংবা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করা ঠিক হবে না, আবার কেবল ধর্মীয় কারণ বা এনফিল্ড রাইফেলের টোটার জন্যই এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়নি। এই বিদ্রোহ হল মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ মানুষ। বাহাদুর শাহ,নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ নেতৃবৃন্দকে তারা বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য করে। নানা ত্রুটি, নানা গোলযোগ, নানা বিদ্বেষ সত্ত্বেও এই বিদ্রোহের গণ-চরিত্রকে কখনই অস্বীকার করা যায় না বা একে স্বাধীনতা সংগ্রাম বললেও অত্যুক্তি হয় না। যাইহোক এই বিদ্রোহকে কোনো বিশেষ একটি  মত দিয়ে বিশ্লেষণ করলে এর সঠিক চরিত্র বোঝা যাবে না,তাই কোনো একটি বিশেষ মত যেমন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আবার ভিত্তিহীনও নয়। প্রত্যেক মতামতের পেছনে  কিছু না কিছু সত্য লুকিয়ে আছে।

(গ)ভারতসভা জাতীয় আন্দোলনেকী অবদান রেখেছিল?

ভুমিকাঃসুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নেতা উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের বৃহত্তর জনগণের সংযোগে গণতান্ত্রিকভাবে সমিতি গঠন না করলে সরকার সেই সমিতির দাবিকে মূল্য দেবেন না প্রকৃতপক্ষে, আগেকার রাজনৈতিক সমিতিগুলি ছিল রক্ষণশীল ও তাদের আচরণ ছিল অভিজাতসুলভ। তা ছাড়া, সর্বভারতীয় স্তরে সমিতি গঠন ও আন্দোলন পরিচালনা না করলে সরকার আঞ্চলিক কোন সমিতির দাবিকে গুরুত্ব দেবে না। একথা বুঝতে পেরে 1876 খ্রিস্টাব্দের 26শে জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে সুরেন্দ্রনাথ ও আরও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে স্থাপিত হয় ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন

  ভারতসভা’-র চারটি ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল,

(১) জনমত গঠন,

(২) ভারতের সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপন,

(৩) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপন এবং

(৪) রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের জনসংযোগ ঘটানো।

ভারত সভার কার্যাবলি:

ভারতের জাতীয়তাবোধ বিকাশে ভারত সভা একাধিক আন্দোলন পরিচালনা করে।

  1. ব্রিটিশ সরকার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়সসীমা 21থেকে কমিয়ে 19 করার ফলে ভারতীয় ছাত্ররা প্রতিযোগীগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে। ভারত সভা এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আইনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য সুরেন্দ্রনাথ দেশব্যাপী ভ্রমণ করেন।
  2. 1876 খ্রিস্টাব্দে লর্ড নর্থব্রুক নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করলে ভারত সভা এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
  3. 1878 খ্রিস্টাব্দে লর্ড লিটন দেশীয় সংবাদপত্র এবং অস্ত্র আইন জারি করলে ভারত সভা দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে।
  4. 1883 খ্রিস্টাব্দে বিচারব্যবস্থার ত্রুটি দূর করার নামে বৈষম্যমূলক ইলবার্ট বিল পাস করলে ভারত সভা প্রতিবাদ জানায় এবং আন্দোলন শুরু করে।

উপরিউক্ত ভারতসভা কর্তৃক দাবিদাওয়া গুলি পুরোপুরি সফল না হলেও এই সভা ভারতের রাজনৈতিক জাগরন অথা জাতীয়তাবাদের বিকাশে প্রভুত অবদান রেখে ছিল এবং জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথ প্রদর্শকের কাজ করেছিল।

 

(ঘ)জাতীয়তাবাদের বিকাশে ‘আনন্দমঠ উপন্যাসের অবদান কী ছিল?

ভূমিকা:- পৃথিবীর যেকোন দেশে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সঙ্গে সেই দেশের দেশাত্মবোধক ও জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশাত্মবোধক সাহিত্যের বিকাশ ভারত ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে সমস্ত মনীষীরা তাদের লেখার মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তার লেখা দেশাত্মবোধক উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’

আনন্দমঠ উপন্যাসের রচনা ও প্রকাশ: 

রচনাঃ- ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের রচয়িতা হলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

প্রকাশঃ- ‘আনন্দমঠ’ প্রথম প্রকাশিত হয় 1882 খ্রিস্টাব্দের 15 ডিসেম্বর।

আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমিঃ- আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমি হল অষ্টাদশ শতকের সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। আনন্দমঠে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মর্মস্পর্শী বর্ণনা আছে। এই উপন্যাসের মূল সুর হল দেশাত্মবোধ এবং পরাধীন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য সন্তানদের প্রবল প্রচেষ্টা।

সন্তান দল:- বাংলায় মুসলিম রাজশক্তির পতন ও ইংরেজ রাজত্বের প্রতিষ্ঠা এক নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে। এই সংকটকালে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশমাতার মুক্তির জন্য সন্তান দলের আবির্ভাব ঘটে। ‘আনন্দমঠ’উপন্যাসের মূল চরিত্রই সন্তান দল। তাদের আদর্শ অনুসরণ করে দেশের যুবসমাজকে দেশমাতার পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বঙ্কিমচন্দ্র।

আনন্দমঠের মূল বিষয়:- আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একদল আত্মত্যাগী সন্ন্যাসীর কার্যাবলির বিবরণ আছে। এই উপন্যাসে সত্যানন্দের আহ্বানের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধ জাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র পরাধীন দেশমাতার লাঞ্ছিত রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি এই দেশমাতার উদ্ধারের জন্য আত্মবলিদানে প্রস্তুত একদল মাতৃভক্ত সন্তানের কথা বলে যুবসম্প্রদায়কে দেশপ্রেম ও সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। আনন্দমঠের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতের চরমপন্থী ও বিপ্লবীরা দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার কাজে ব্রতী হন।

বন্দেমাতরমঃ- বন্দেমাতরম গান ও স্লোগানটি আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত। ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রসারে বন্দেমাতরম-এর অবদান অপরিসীম। 1896 খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দেমাতরম গানটি গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন।

মূল্যায়নঃ- ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও তার বন্দেমাতরম গানটির অবদান অপরিসীম। অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আনন্দমঠের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ‘প্রকৃত জনক’ বলে অভিহিত করেছেন (The real father of Indian Nationalism)।

(ঙ)’ভারতমাতা’ চিত্রটি জাতীয়তাবাদের বিকাশ কীভাবে ঘটিয়েছিল?

ভূমিকাঃ ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে চিত্রশিল্পীগণ চিত্রের মাধ্যমেও ভারতীয় জাতীয়তাবোধ ফুটিয়ে তোলlর চেষ্টা করেছিলেন। ভারতীয় জাতীয়তা বোধ সৃষ্টিকারী চিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত ভারতমাতাচিত্রটি। জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতা চিত্রটির মাধ্যমে বিশ শতকে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটান। তার অঙ্কিত চিত্রে ‘ভারতমাতা’ হলেন ভারতবর্ষের প্রতীক।

ভারতমাতার চিত্রকরঃ‘ভারতমাতা’ চিত্রের চিত্রকর হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভারতমাতা চিত্রের অঙ্কন কালঃ 1902 খ্রিস্টাব্দে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গমাতা’ চিত্র অঙ্কন করেন। পরে ভারতের স্বদেশি আন্দোলনের আবহে 1905 খ্রিষ্টাব্দে তা ভারতমাতা রুপে খ্যাতি লাভ করে।

ভারতমাতার চিত্রের বর্ণনাঃ ভারতমাতা হলেন গৈরিক বস্ত্র পরিহিতা এক দেবী। ভারতমাতার চারটি হাত। তিনি চারটি হাতে ধরে আছেন ধানের গোছা, সাদা কাপড়, বেদ ও জপমালা। তিনি সবুজ পৃথিবীর উপর দাঁড়িয়ে আছেন, তার পায়ের কাছে চারটি পদ্মফুল এবং পিছনে নীল আকাশ।।

ভারতমাতা ভারতবর্ষের প্রতীক। তিনি তার সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও দীক্ষা প্রদান করেন। ভারতমাতা চিত্রটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকালে জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি জনসাধারণের মধ্যে জাতীয়তাবোধের সঞ্চার করে।

ভগিনী নিবেদিতা ‘ভারতমাতা’-র ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন যে, এই চিত্রটির মাধ্যমে বিমূর্ত জাতীয়তাবাদকে মূর্ত করে তোলা হয়েছে।

৪. নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রশ্নের মান -৮)

ক)মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র বিশ্লেষণ করাে।

ভূমিকাঃ 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ  মহাবিদ্রোহ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ যুক্তি সহকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতামত বিশ্লেষণ করলে যে দৃষ্টিকোণগুলি সামনে আসে সেগুলি নীম্নে আলোচনা করা হল-

সিপাহি বিদ্রোহ:- বেশকিছু ঐতিহাসিক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ মনে করেন যে 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ছিল নিছক‘সিপাহিদের বিদ্রোহ’ রবার্টস, জন কে, জনসিলি এবং দাদাভাই নওরোজি, রাজনারায়ণবসু, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দআহমেদ খান প্রমুখ এই মতের সমর্থক। ড. রমেশচন্দ্রমজুমদার‘History of Freedom Movement in India” গ্রন্থে অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। কিশোরীচাদ মিত্র বলেছেন“এই বিদ্রোহ ছিল একান্তভাবেই সিপাহিদের অভুখান। এতে গণ আন্দোলনের কোনো উপাদান ছিলনা।”

1857  সালের বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলার যুক্তি গুলি হল
  1. 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ সিপাহিদের জন্য এবং সিপাহিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল।
  2. দেশীয় রাজশক্তির অধিকাংশই হয় এই বিদ্রোহে নিরপেক্ষ ছিল নতুবা সিপাহিদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল।
  3. আবার শিক্ষিত ও সাধারণ মানুষ এই বিদ্রোহ থেকে দূরেছিল।

সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলার/ সিপাহি বিদ্রোহ না বলার পিছনে যুক্তিগুলি হল- এই বিদ্রোহকে নিছক সিপাহী বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করা যুক্তি সঙ্গত নয়। অনেকেই সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলতে অধিক পছন্দ করেন। ঐতিহাসিক হোমস, ডাফ, ম্যালেসন, জে.বি, নর্টন, আউট্রাম এবং ডিসরেলি এই বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন। সমাজতন্ত্রবাদের জনক কার্লমার্কসও একে‘জাতীয়বিদ্রোহ’বলে উল্লেখ করেছেন।

  1. এই বিদ্রোহ সিপাহিরা শুরু করলেও অচিরেই বিভিন্ন স্থানের অসামরিক ব্যক্তিবর্গ এতে যোগ দিয়েছিল।
  2. বিদ্রোহীরা সিংহাসনচ্যুত শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে বিদ্রোহে ঝাপিয়ে পড়েছিল।
  3. জাতীয়তাবোধের সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মিশে জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়। সেদিক থেকে সিপাহি বিদ্রোহে প্রায় সমগ্র ভারতবাসী ব্রিটিশ শোষণ থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য যোগ দিয়েছিল। তাই একে জাতীয় বিদ্রোহ বলাই যুক্তি যুক্ত/তাই একে সিপাহি বিদ্রোহ না বলাই শ্রেয়

1857 সালের বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ না বলার যুক্তিঃ- 1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলা যায়না, কারণ—

  1. বিদ্রোহীদের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিকল্পনা বা সংগঠন ছিলনা।
  2. ঐক্য বা বোঝাপড়া কেবলমাত্র সিপাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
  3. সিপাহিদের সঙ্গে বিদ্রোহীনেতাদের তেমন যোগাযোগ ছিলনা।
  4. বিদ্রোহের বিভিন্ন গোষ্ঠীও নেতাদের মধ্যে লক্ষ্য ও আদর্শের ফারাক ছিল। জাতীয় স্বার্থে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়নি।

1857 সালের সালের বিদ্রোহকে কেন সামন্তশ্রেণীর বিদ্রোহ বলা হয়-

পক্ষেঃসামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া : বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিছু ঐতিহাসিক বলেছেন, 1857 খ্রিস্টাব্দের ঘটনা ছিল সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া বা সনাতনপন্থীদের বিদ্রোহ। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন, রজনীপাম দত্ত প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এবিষয়ে একমত। লর্ডডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে ঝাসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, পেশোয়া বালাজি বাজিরাও-এর দত্তকপুত্র নানাসাহেব তাঁদের রাজ্য হারান সাতারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়, কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা রাজ্য ইংরেজরা দখলকরে। নতুন ভূমিব্যবস্থায় এখানকার তালুকদাররা জমি হারায়। ফলে রাজ্য হারা রাজা-রানি, জমিহারা কৃষক, জমিদার তালুকদাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তারা 1857-র মহাবিদ্রোহে অংশ নেয়। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর মতে, এই বিদ্রোহ ছিল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাততন্ত্র ও মৃতপ্রায় সামন্তদের ‘মৃত্যুকালীনআর্তনাদ।

বিপক্ষে যুক্তিঃ অপরপক্ষে অধ্যাপক সুশোভন সরকার বলেন যে, নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, হজরৎমহল, কুনওয়ার সিং প্রমুখ সামন্ত-জমিদার ও তালুকদারদের হাতে বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল বলে এই বিদ্রোহকে কখনই সামন্ত বিদ্রোহ আখ্যা দেওয়া যায়না। 1857 খ্রিস্টাব্দে ভারতে এরাই ছিলেন সমাজের ‘স্বাভাবিক নেতা। এই কারণে এই অভ্যুত্থান সামন্ত-প্রভাবিত হওয়ায় স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন যে, সামন্ত ব্যবস্থার স্তম্ভস্বরূপ রাজন্যবর্গের একজনও বিদ্রোহে যোগদেননি এবং অযোধ্যার বাইরে জমিদারদের অধিকাংশই ছিলেন ইংরেজদের পক্ষে। বিদ্রোহে যোগদান করা দুরে থাক—প্রকৃত সামন্ত নেতৃবৃন্দ বিদ্রোহ বানচাল করতেই ব্যস্ত ছিলেন। সুতরাং এই বিদ্রোহকে কখনই সামন্ত বিদ্রোহ বলা যায় না।

যাইহোক ঐতিহাসিক পি. সি. যোশী নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে রুশ-সামন্ত, ইতালির ঐক্য আন্দোলনে মাৎসিনী, গ্যারিবল্ডি, ক্যাভুর ও ভিক্টর ইম্যানুয়েলের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে সামন্তদের গৌরবজনক ভূমিকা থাকলেও ভারত ইতিহাসেও তাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায়না। তার মতে, সামন্ত-নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও 1857-র বিদ্রোহ প্রকৃত পক্ষে জাতীয়সংগ্রাম।

1857 সালের বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলার কারনঃ

বিনায়ক দামোদর সাভারকার তার‘’Indian War of Independence’’ গ্রন্থে সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের প্রথমস্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখকরেছেন।

পক্ষেযুক্তিঃ

  1. ইংরেজ কোম্পানির দীর্ঘকালের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ছিল ভারতবর্ষের বুকে জনগণের জ্বলন্ত প্রতিবাদ বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাতে চেয়েছিল।
  2. 1857-সালের বিদ্রোহ সমগ্র ভারতে না হলেও এমনকি এর কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য না থাকলেও অধিকাংশ ভারতীয়ই মনেপ্রাণে ইংরেজদের বিতাড়ন চেয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক একসঙ্গে লড়েছিল এবং দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট ঘোষনা করেছিল।
  3. ইংরেজ বিরোধী এত ব্যাপক আন্দোলন ভারতে আর হয়নি। তাই গতানুগতিক বিচার না করে এই অভূখানকে স্বাধীনতার সংগ্রাম বলাই যুক্তি যুক্ত।

বিপক্ষেযুক্তিঃ– ডা. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ 1857 সালের বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেননি,কারণ-

  1. তাদের মতে, ভারতের কিছু অঞ্চলে এই বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ছিল; কাজেই এই সংগ্রামকে সারা ভারতের সংগ্রাম বলা যায়না।
  2. এই বিদ্রোহ ছিল সিপাহিদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, যা জাতীয় বিদ্রোহের পর্যায়ে পড়েনা।
  3. অধিকাংশ সামন্তরাজ ও জমিদার ইংরেজ কোম্পানির প্রতি অনুগত ছিল এবং বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল। বিদ্রোহীরা সকলের স্বাধীনতা লাভের জন্য নয়, বরং পৃথক পৃথক উদ্দেশ্য সিদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্রোহ করেছিল।
  4. শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজও সমসাময়িক বাংলার পত্রপত্রিকা গুলিও বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল। তখন বিদ্রোহীদের মধ্যে জাতীয়তা বাদের চেতনা ছিলনা অর্থাৎ সেই সময় জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়নি।

উপসংহারঃএই বিদ্রোহকে নিছক সিপাহিবিদ্রোহ, সামন্তবিদ্রোহ বা সনাতনপন্থীদের বিদ্রোহ বলে অভিহিত করা ঠিক হবেনা। কেবলধর্মীয় কারণ বা এনফিল্ড রাইফেলের টোটার জন্যই এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়নি। এই বিদ্রোহ হল মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ মানুষ। বাহাদুর শাহ নানাসাহেব লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ নেতৃবৃন্দকে তারা বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য করে। নানাত্রুটি, নানা গোলযোগ, নানা বিদ্বেষ সত্ত্বেও এই বিদ্রোহের গণ-চরিত্রকে কখনই অস্বীকার করা যায়না বা একে স্বাধীনতা সংগ্রাম বললেও অত্যুক্তি হয়না। যাইহোক এই বিদ্রোহকে কোনো বিশেষ একটি মত দিয়ে বিশ্লেষণ করলে এর সঠিক চরিত্র বোঝা যাবেনা, তাই কোনো একটি বিশেষ মত যেমন পুরোপুরি গ্রহণ যোগ্য নয়, তেমনি আবার ভিত্তিহীনও নয়। প্রত্যেক মতামতের পেছনে কিছুনা কিছু সত্য লুকিয়ে আছে।

খ) লেখায় ও রেখায় কীভাবে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছিল তা আলােচনা করাে।

Leave a Comment