জায়গিরদারী সংকট, কৃষক বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন:

জায়গিরদারী সংকট, কৃষক বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন:

জায়গিরদারী সংকট, কৃষক বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষদিকে এবং অষ্টাদশ শতকের গােড়ায় মুঘল সাম্রাজ্য এক চরম অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। সেই সঙ্কট হলো জায়গিরদারী সমস্যা, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে। জায়গিরদারী সমস্যার মূল কথা হলাে এই যে, যেটুকু উদ্বৃত্ত জমি থেকে পাওয়া যেত, তা দিয়ে প্রশাসনিক ব্যয়, যুদ্ধের খরচ এবং রাজপরিষদের জীবনযাত্রার প্রত্যাশিত বা উপযুক্ত মান বজায় রাখা সম্ভব ছিল না। একদিকে টাকার মূল্য হ্রাস পায়, অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যায়। শাসকশ্রেণীর জীবনযাত্রার মানও উদ্ধগামী হয়। মুঘল সম্রাটরা নিজেরাই জাঁকজমকপণে রাজসভা ও বিলাসবহুল জীবন যাপন করে এর একটা উদাহরণ স্থাপন করেন। এই অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে যা প্রয়ােজন ছিল, তা হলাে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি। মুঘল সম্রাটরা যে কৃষির উন্নতির জন্য কিছুই করেন নি, তা নয়। কিন্তু প্রয়ােজন অনুপাতে উৎপাদন বাড়ে নি। এদিকে জমা বা নিধারিত রাজস্ব যা ছিল, হাসিল বা আদায়ীকৃত রাজস্বের পরিমাণ তাঁর থেকে যথেষ্ট কম হতাে। আবার মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে গেলেও জায়গিরের সংখ্যা সমানুপাতিক হারে বাড়ানাে সম্ভব ছিল না। ফলে উৎকৃষ্ট জায়গিরের জন্য মনসবদারদের মধ্যে প্রতিযােগিতা শুরু হয়ে যায়। এই ধরণের অবস্থা থেকেই জায়গিরদারী সঙ্কটের সুত্রপাত।

ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে জায়গিরদারী সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করলেও জাহাঙ্গীরের রাজত্বের শেষ দিক থেকেই এই সঙ্কটের লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। শাহজাহান এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সঙ্কটের মলে আঘাত করতে পারেন নি। অথাৎ ক্রমবর্ধমান ব্যয়বৃদ্ধি ও সম্পদের মধ্যে সমতা রক্ষা একটি অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরঙ্গজেব খরচ কমিয়ে, নতুন কর ধার্য করে ও মনসবদারদের কৃষির উন্নতির জন্য নির্দেশ জারী করেও এই অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। এদিকে ঔরঙ্গজেবের ভ্রান্ত দাক্ষিণাত্য নীতির ফলে অবস্থা আরও

জটিল হয়ে পড়ে। দক্ষিণী অভিজাতদের হাত করার জন্য দরাজ হাতে মনসব বিতরণ করার প্রয়ােজন দেখা দেয়। মনসবদারদের সংখ্যা অবশ্য শাহজাহানের আমল থেকেই বাড়ছিল। জাহাঙ্গীরের সিংহাসন আরােহণের সময় মনসবদারদের সংখ্যা ছিল ২০৬১ জন। শাহজাহানের আমলে ১৬৩৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮,০০০ এবং ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষার্ধে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১,৪৫৬ জন। কিন্তু মনসবদারের সংখ্যা বাড়লেও রাজস্বের এলাকার পরিমাণ সমানুপাতিক হারে বাড়ানাে সম্ভব ছিল না। এই ভাবেই জায়গীরদারী সংকটের সুত্রপাত হয়। যাই হােক উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের অরাজকতা ও মারাঠা আক্রমণের ফলে অবস্থা ঘােরালাে হয়ে ওঠে। দক্ষিণী অভিজাতরা নিম্ন পদের মনসব পাওয়ায় ঘোরতর অসন্তুষ্ট হয়। তাছাড়া মনসবদারদের সংখ্যা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এবং প্রায় প্রত্যেক মনসবদারই উত্তর ভারতে উৎকৃষ্ট জায়গির প্রার্থনা করায় এক জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়। জায়গির পেতে অনেক সময় লেগে যেত এবং অনেক চেষ্টার পর জায়গির পেলেও তা থেকে নির্ধারিত অর্থ আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অবস্থা দেখা যায় আগ্রার কাছে, রাজপুতানার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং দাক্ষিণাত্যের কোন কোন অংশে। এই সব এলাকায় কোনদিনই বেশী ফসল উৎপন্ন হতাে না। এই পরিস্থিতিতে শাসন ব্যবস্থারও অবনতি দেখা যায়। অনেক মনসবদারই উপযুক্ত সংখ্যক সৈনিক রাখতাে না। কেউ কেউ এমনকি মারাঠাদের সঙ্গে একটা বােঝাপড়াও করে নেয়। এক কথায় সমস্ত মনসবদারী প্রথা ভেঙ্গে পড়তে থাকে।

ঔরঙ্গজেবের মত্যুর পর জায়গীরদারী সঙ্কট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ঘটনা হলাে সরকারের খাস জমি বা খালিসাকে জায়গিরে রুপান্তরিত করা। মনসবদারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও জায়গিরের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এ ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা ছিল না। মহম্মদ শাহের রাজত্বের গােড়ার দিকে রাজ্যের অধিকাংশ খালিসা জমিই এইভাবে জায়গিরে পরিণত হয়েছিল। আসলে বাহাদুর শাহের আমল থেকেই দরাজ হাতে মনসব বিলানো হয়। জাহান্দার শাহের আমলেও একই অবস্থা ছিল। কিন্তু এত করেও অবস্থার কোন উন্নতি হয় নি। সরকার জরুরী পরিস্থিতিতে নগদ বেতন দিয়ে সৈনিকদের নিযুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে হয় জায়গিরদারদের উপর সম্রাট তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন, নয়তাে মনসবদারেরা এমন দুরবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন যে, তাদের পক্ষে সেনাবাহিনীর ভরণ-পোষণ করা বা রক্ষণাবেক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যাই হােক না কেন এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের সামরিক দক্ষতা হ্রাস পায় ও আয় কমে যায়, অন্যদিকে তেমনি মনসবদারদেরও অবস্থা সঙ্গীন হয়ে আসে। এর ফলে অভিজাতদের মধ্যে দলাদলি বেড়ে যায় এবং আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও মারাঠা আক্রমণও ঘটতে থাকে। জায়গিরদারি সঙ্কটের ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের দক্ষতা হ্রাস পায়। থানাদার, ফৌজদার ও সবেদারেরা ঘােরতর অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে তাদের পক্ষে যেমন সৈন্যবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তেমনি দক্ষতার সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে মুঘল শাসন কাঠামাে ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।

জায়গিরদারী সংকট, কৃষক বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন:

মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ও অবলুপ্তি জায়গিরদারী সঙ্কট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি প্রবণতা উত্তরােত্তর বদ্ধি পায়। জায়গিরদারেরা প্রায়ই তাঁদের জায়গির থেকে নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করতে পারতেন না বলে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তাঁরা সেই রাজস্ব আদায়ের ভার বার্ষিক একটা নিদিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এক শ্রেণীর লােকের হাতে তুলে দিতেন। এই শ্রেণীর লােককে বলা হতাে ইজারাদার ও এই ব্যবস্থাকে বলা হতাে ইজারা প্রথা। জাহাঙ্গীরের আমল থেকেই ধীরে ধীরে ইজারা প্রথার পুনরাবিভাব ঘটলেও বাহাদর শাহের মৃত্যুর পর থেকে এই প্রথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং ফারকগিয়ারের রাজত্বকালের আগেই তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইজারা প্রথার জন্য মলতঃ দায়ী ছিল জমার হার বৃদ্ধি ও অংশতঃ ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে প্রশাসনিক দুর্বলতা। বলা বাহুল্য তাঁরাই ইজারা পেতেন, যারা সবচেয়ে বেশী রাজস্ব আদায় করার প্রতিশ্রুতি দিতেন। এর ফলে জায়গিরদারেরা একটা নির্দিষ্ট আয় সম্পকে নিশ্চিত হতে পারতেন। জায়গিরদারী সঙ্কট ও ইজারা প্রথার ব্যাপক প্রচলনের ফল কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের পক্ষে মােটেই শভ হয় নি। কেন তা হয় নি, এবার সেই প্রশ্নে আসা যায়। ইজারা প্রথার ফলে জমার হার উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু কৃষির উৎপাদন বাড়লাে না। এদিকে এই বাড়তি বােঝার ভার কৃষকের ঘাড়ে এসেই পড়তাে। কৃষকদের উপর করের বােঝা আগে থেকেই দুর্বহ ছিল। ইরফান হাবিব বলেছেন রাজস্ব দাবির পরিমান ক্রমাগত বাড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা বরাবরই যত দিন যাচ্ছিল, ততই এই প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছিল। পেলটের বিবরণ থেকে জানা যায় জাহাঙ্গীরের আমলে কৃষকদের উপর এত নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হতাে যে, অনেক জমিতে চাষবাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তা জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। এই অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই কৃষকেরা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হতাে। বস্তুতঃ গােটা মঘল আমল জড়েই কৃষক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। তবে ঔরঙ্গজেবের আমলে এই কৃষক বিদ্রোহ সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ গ্রহণ করেছিল। যাই হােক ইজারা প্রথায় কৃষকদের উপর অত্যাচার তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ইজারাদারেরা বল প্রয়ােগ করে কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে শুরু করলাে। কিন্তু এই শােষণ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, তখন অনেক কৃষক জমি জমা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গেল। তখন অবশ্য জমির অভাব ছিল না বলেই এটা সম্ভব হতাে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হতাে এবং এক ঘােরতর কৃষিসঙ্কট দেখা দিল। এই সঙ্কট সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিল। অন্যদিকে ইজারাদারী প্রথার প্রসারের ফলে জমিদারেরাও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাদের পক্ষেও বাড়তি রাজস্ব মিটিয়ে দেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে ও তাদের আয় কমে যায়। অনেক প্রাচীন জমিদারী ধবংস হয়ে যায়। কিন্তু অনেক জমিদারেরই নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল এবং তাদের সঙ্গে কৃষকদের জাতি বা গােষ্ঠীগত ঐক্য ছিল। এই সব প্রভাবশালী জমিদার কৃষকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষকে মূলধন করে মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে। এই সব বিদ্রোহ দমন করা মঘল সরকারের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বিদ্রোহ দমন করতে আরও বেশী অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে করভারও বুদ্ধি পেল। এইভাবে একটা চক্রাকার আবর্তনের ফলে কৃষক বিদ্রোহের ব্যাপ্তি বহত্তর সঙ্কটের সন্টি করে। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়। ছিল।

উপসংহার: ও অষ্টাদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রত অবক্ষয়ের জন্য পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের অপদার্থতা ও অভিজাত সম্প্রদায়ের স্বার্থপরতা যে অনেকাংশ দায়ী ছিল, এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মতবিরােধ নেই। কিন্তু, আমরা সেই সঙ্গে এও লক্ষ্য করেছি যে, ঔরঙ্গজেবের ভ্রান্ত নীতির ফলে তাঁর মৃত্যুর সময়েই মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত আলগা হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের ব্যর্থতা এইখানেই যে, তাঁরা পতনােন্মুখে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষরক্ষা করতে পারেন নি। তাঁদের এই অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েও কিছু বলতে হয় যে, কাজটা যথার্থই খুব কঠিন ছিল, কেননা মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামাে ছিল আগাগােড়াই দুবেল। সুতরাং ব্যক্তির থেকে সাংগঠনিক দুর্বলতার উপরই আধুনিক ঐতিহাসিকেরা বেশী গুরুত্ব আরােপ করেছেন। সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্যই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ছিল অনিবার্য। ব্যক্তির ভূমিকা তাকে ত্বরান্বিত করেছে মাত্র। তবে আমরা এও লক্ষ্য করেছি যে, পরবতী মুঘল সম্রাটেরা দুবেল ও অক্ষম হলেও, জুলফিকার খা, সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়, নিজাম-উল-মুলক প্রমুখ অভিজাত শ্রেণীর মানুষ দুর্বল ও অপদাথ ছিলেন না। কিন্তু তারাও পতনকে ঠেকানাের বদলে পতনে ইন্ধন যুগিয়েছিলেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের যে কাঠামাে গড়ে উঠেছিল, তা প্রধানতঃ আকবরের তৈরী। তিনি যে কাঠামাে গড়ে তুলেছিলেন তার কার্যকারিতা ছিল না বললে সত্যের অপলাপ হবে। বরং তার কাঠামাের উপর ভিত্তি করেই মুঘল সাম্রাজ্য ঔরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত টিকেছিল। কিন্তু তার মত্যুর পর থেকেই তার তৈরী কাঠামাে আরও মজবুত করার বদলে, তাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছিলেন তাঁর উত্তরাধিকারীরা। মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্কটের একটা অন্যতম কারণই হলো পরিবর্তন বিমখত। আকবরের তৈরী কাঠামাে যে যুগ যুগ ধরে মুঘল সাম্রাজ্যকে জীবনী শক্তি যুগিয়ে যাবে, তা হতে পারে না এবং হয়ও নি। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক-কোন ক্ষেত্রেই মুঘল সম্রাটেরা কোন মৌলিক চিন্তাধারা ও পরিকল্পনার ছাপ রাখতে পারেন নি। যে কৃষি উদ্বত্তের উপর মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব নির্ভরশীল ছিল, সেই কৃষির উন্নতির দিকে বা কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে তেমন নজর দেয়া হয় নি। বস্তুতঃ কৃষির সম্প্রসারণ ও ব্যবসা বাণিজ্যের পণ্ঠপােষকতার মাধ্যমেই সাম্রাজ্যের সম্পদ বাড়ানাের সুযােগ ছিল। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্য বা শিপ কোন দিকেই সরকারী পষ্ঠপােষকতা দরাজ হতে পারে নি। এটা ঠিক যে, দেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল এবং শিল্প উৎপাদনও যথেষ্ট বদ্ধি পেয়েছিল। ভারতীয় শিল্পজাত। দ্রব্যের গুণগত মান ছিল যথেষ্ট অগ্রসর। কিন্তু উৎপাদন ব্যবস্থায় কোন কারিগরী কৌশলের প্রবর্তন বা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে কোন উন্নতি আমরা দেখতে পাই না। অথচ ইউরােপে এই সময় কারিগরী ও প্রযুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। উৎপাদন পদ্ধতিতে পরানাে ব্যবস্থাই বহাল ছিল। কিছ, কিছু, শিল্পশহরও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অধিকাংশ শহরই গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়ােজনে। অন্যদিকে পরিবহণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও স্বনিভর গ্রামীণ অর্থনীতির ফলে ব্যবসা বাণিজ্যেরও তেমন প্রসার ঘটে নি। মুঘল শাসক শ্রেণী ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য আগ্রহী ছিল না। কৃষকদের শােষণ |

মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ও অবলুপ্তি করে মঘল শাসক সম্প্রদায় যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন, তা হয় তাঁরা বিলাস ব্যসনে উড়িয়ে দিয়েছেন, নয় তা সিন্দুকবন্দী করে সঞ্চয় করেছেন। কিন্তু শিল্প বা বাণিজ্যে বিনিয়ােগ করে তাঁরা সম্পদ বৃদ্ধির জন্য কোন চেষ্টা করেন নি। ফলে এক ধরণের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা দেখা দেয়। এই অনগ্রসরতা মুঘলদের রাজনৈতিক ভাগ্যকেও প্রভাবিত করেছিল। সীমিত সম্পদের ভাগ নিয়ে শুরু হয় রেষারেষি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে ওঠে জটিল, কিন্তু এই চরম সঙ্কটের দিনে দুবল মঘল বণিকশ্রেণী মঘল সাম্রাজ্যের কোন কাজেই লাগলাে না।

পরিবর্তনবিমুখ মনােভাব ও গতানুগতিকতার শিকার হয়েছিল মুঘল সেনাবাহিনীও। যে সময় ইউরােপে অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণে নতুন নতুন প্রযুক্তিবিদ্যা প্রয়ােগ করে সামরিক বাহিনীর দক্ষতা বাড়াবার জন্য নিত্য নতুন পরীক্ষা চলছিল, তখন মুঘল শাসকগােষ্ঠী সে সম্পর্কে সম্পর্ণেরপে উদাসীন ছিলেন। মুঘলদের মধ্যে সামরিক প্রতিভার অভাব ছিল না। অভাব ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ও উন্নত রণকৌশলের। এগুলাে আয়ত্ত করার কোন সযত্ন প্রয়াস মুঘলদের মধ্যে দেখা যায় নি। মুঘল সেনাবাহিনীর দৈন্যদশা উন্মােচিত হয়েছিল নাদির শাহের ভারত আক্রমণের সময়। অষ্টাদশ শতকে ভারতীয়রা তাই প্রায়শঃই মুষ্ঠিমেয় ইউরােপীয় সৈন্যের কাছে অসহায় বােধ করতাে।

সামগ্রিকভাবে আমাদের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ নিহিত রয়েছে তার দুর্বল, এটিপণ ও পরিবর্তনবিমুখ অর্থনীতির মধ্যে। এই অর্থনৈতিক সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল জায়গিরদারী সংকটের মধ্য দিয়ে। জায়গিরদারী সংকটের পটভূমিতে রচিত হয়েছিল মুঘল অভিজাতশ্রেণীর দায়িত্বহীন দলাদলি, স্বার্থান্বেষী মনােবৃত্তি ও স্বাধীন রাজ্য গঠনের প্রচেষ্টা। চতুর্দিকের এই সংকটে পরবতী মুঘল সম্রাটেরা দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্রও ব্যক্তিবিশেষের এটি-বিচ্যুতি ও চারিত্রিক দুবলতার ভূমিকা অস্বীকার করেন নি। একদিকে মুঘল সমত্রাটদের অপদার্থতা এবং অন্য দিকে অভিজাত সম্প্রদায়ের স্বার্থপরতা ও দলাদলির ফলে দেশের প্রশাসনিক কাঠামাে ভেঙ্গে পড়ে ও সর্বত্র নৈরাজ্য দেখা দেয়। দিকে দিকে আঞ্চলিক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। বৈদেশিক আক্রমণ উত্তর পশ্চিম সীমান্ত আছড়ে পড়ে রাজনৈতিক অনেক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটের মানদণ্ড রাজ্যে পরিণত হয় মুঘল শাসনের স্থলাভিষিক্ত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ।

মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাত ওদের দলাদলি এবং মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ তোমার জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করো

 

Class 8 Model Activity Task

Compilation October New

নীচের বিষয় গুলিতে Click করে নতুন মডেল অ্যাক্টিভিটি টাস্ক গুলি লিখে নিতে পারবে

বাংলা

অংক

ইংরেজী

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

স্বাস্থ্য ও শরীর শিক্ষা

ইতিহাস

ভূগোল


Leave a Comment