মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাতদের দলাদলি ( মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ )

মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাতদের দলাদলি ( মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ )

ঔরঙ্গজেবের পরিবর্তে “ মঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাতদের দলাদলি ও মুঘল সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক দুর্বলতা সত্ত্বেও প্রায় দুশাে বছর যাবৎ যে তার সগৌরব অস্তিত্ব অক্ষম ছিল, তার কারণ মুঘল সম্রাটদের ব্যক্তিত্ব, যােগ্যতা ও দক্ষতা। বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত সমস্ত মুঘল সম্রাট ছিলেন অনন্যসাধারণ নানা গুণের অধিকারী। ফলে তাঁদের আমলে মুঘল সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু তাঁদের পর যাঁরা দিল্লীর সিংহাসনে আরােহণ করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন অপদার্থ ও অযােগ্য। তারা শক্ত হাতে সাম্রাজ্যের রাশ ধরে রাখতে পারেন নি। এই অবস্থায় মঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। তবে পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের অপদার্থতা ও অযােগ্যতার কথা স্বীকার করে নিয়েও আমরা এ কথা বলতে বাধ্য যে, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষ দিকেই মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্দিন ঘনিয়ে এসেছিল। ঔরঙ্গজেবের অনুদার ও সংকীর্ণ ধর্মনীতি ভ্রান্ত রাজপুত ও দাক্ষিণাত্য নীতি এবং সর্বোপরি দিকে দিকে কৃষক বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত বল করে দিয়েছিল। সুতরাং তাঁর উত্তরাধিকারীরা যে কঠিন ও দুরহ সমস্যার সম্মুখীন হন, তা মােকাবিলা করতে হলে অসাধারণ কিছু গুণ ও প্রতিভার প্রয়ােজন ছিল। এই ধরণের বিরল প্রতিভার সাক্ষাৎ ইতিহাসে সব সময়ে মেলে না। ১৭০৭ সালের পর ভাগ্যলক্ষী মঘলদের চিরদিনের মত ত্যাগ করে গিয়েছিলেন।

পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের মধ্যে কেউই এই ধরণের প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না। এমন কি সিংহাসনে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে যেটুকু যােগ্যতার প্রয়ােজন হয়, সেটুকুও তাঁদের ছিল না। ফলে মুঘল সম্রাট হয়ে দাঁড়ান পুতুলের মত নিষ্প্রাণ এবং দক্ষ বাজীকরের মত মঘল অভিজাতশ্রেণী সম্রাটদের নিয়ে পুতুল খেলা শুরু করেন। এক একটি করে প্রদেশ মুঘল সম্রাটদের হাতছাড়া হয়ে যায় ও নাদির শাহ ও আহম্মদ শাহ-আবদালীর ভারত আক্রমণের পথ প্রশস্ত হয়।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরই তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে গহযুদ্ধ শরহয়ে যায়। এই ধরণের পরিণতির কথা আশঙ্কা করে ঔরঙ্গজেব তাঁর জীবদ্দশায় একটি উইল করে সাম্রাজ্য তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে ভাগ করার ব্যবস্থা করে যান। কিন্তু তাঁর উইল ছেড়া কাগজে পরিণত হয়। তবে এই গহযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। কাবলের শাসক ঔরঙ্গজেবের প্রথম পত্র মােঞ্জমের হাতে গুজরাটের শাসনকতা তাঁর দ্বিতীয় পত্র আজম আগ্রার সন্নিকটে জাজউ-এর প্রান্তরে পরাজিত ও নিহত হন (১৭০৭)। এরপর হায়দ্রাবাদের নিকট এক যুদ্ধে অপর পুত্র কামবক্স পরাজিত হন ও পরে মারা যান। মুয়াজ্জম বাহাদুর শাহ উপাধি ধারণ করে দিল্লীর সিংহাসন অধিকার করেন। কিন্তু তাঁর মত সজ্জন, কিন্তু দুর্বলচেতা, ব্যক্তির পক্ষে বদ্ধ বয়সে সিংহাসনে আরােহণ করে কোন কিছু করার ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর (১৭১২) আবার তার চার পুত্রের মধ্যে উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুর হয়ে যায়। তিন ভাইকে হত্যা করে জাহান্দার শাহ দিল্লীর সিংহাসন দখল করলেন। কিন্তু তাঁর সময় থেকেই মঘল অভিজাত শ্রেণীর নানা দল ও উপদল সিংহাসনে নিজ নিজ মনোনীত প্রার্থীকে বসাবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। এর ফলে শর, হলো নোংরা দলাদলি ও রেষারেষি, যা অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের ইতিহাসকে করেছে মসীলিপ্ত ও কলঙ্কিত।

মুঘল অভিজাত শ্রেণী প্রধানতঃ দুটি দলে বিভক্ত ছিল। প্রথম দলটিকে বলা হতাে হিন্দুস্থানী বা ইন্দো মুসলমান দল। এই দলের মধ্যে পড়ে আফগান, বারহার সৈয়দরা ও খান-ই-দৌরান, যাঁর পিতৃভূমি ছিল বাদাকশান। এদের জন্ম হয়েছিল ভারতে, অথবা দীর্ঘদিন ধরেই এরা ভারতে বসবাস করছিলেন। এই সব ভারতীয় মুসলমানরা তাঁদের সমগােত্রীর হিন্দ, অভিজাতদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিদেশী বংশজাত অভিজাতদের মুঘল বলে অভিহিত করা হলেও এরা জন্মগত ভিত্তিতে দুটি ভাগে বিভক্ত ছিলেন। ট্রান্সক্সিয়ানা এবং মধ্য এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত এবং প্রধানতঃ সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত অভিজাতরা ছিলেন তুরানী গােষ্ঠীভুক্ত। এদের মধ্যে মহম্মদ আমিন খাঁ ও চিন কুলিচ খাঁ (নিজাম-উল মুলক) ছিলেন খুব প্রভাবশালী। অন্যদিকে পারস্য থেকে আগত ও শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানরা ছিলেন ইরানী গােষ্ঠীভুক্ত। এদের নেতা ছিলেন আসাদ খাঁ ও জুলফিকার খাঁ।

বাহাদুর শাহ ও জাহান্দার শাহের সময় জুলফিকার-খাঁর নেতৃত্বে ইরানী দল অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে পড়ে। আসাদ খাঁর পুত্র জুলফিকার বাহাদুর শাহের দ্বিতীয় পত্র আজিম-উস-শানের বিরদ্ধে চক্রান্ত করে তাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন। এর পর জাহান্দার শাহ জুলফিকারের সাহায্য নিয়ে রফি-উস-শান ও জাহান শাহকে পরাজিত ও নিহত করে সিংহাসন নিষ্কণ্টক করেন। জুলফিকার খাঁ ওয়াজির নিযুক্ত হন। দাক্ষিণাত্যের শাসনভারও তাঁর হাতেই থাকে। জাহান্দার শাহ সিংহাসন লাভ করলেও জুলফিকারের হাতেই ছিল সব ক্ষমতা এবং জাহান্দার তাঁর উপদেশ অনুসারেই চলতেন। জুলফিকারের অনুচরেরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অধিকার করেন। কিন্তু এর পরেই জাহান্দারের সঙ্গে জুলফিকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। জাহান্দার অবশ্য সরাসরি জলফিকারের বিরােধিতা করতে সাহস পেলেন না। তবে তাঁকে অপসত করার জন্য চক্রান্ত চলতে থাকলাে। এই পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থায় যথেষ্ট শৈথিল্য দেখা গেল।

জাহান্দার শাহ অবশ্য বেশী দিন রাজত্ব করতে পারলেন না। আজিম-উস, শানের দ্বিতীয় পত্র ফারকশিয়ার সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়, পাটনার ডেপুটি গভর্ণর হসেন আলি ও এলাহাবাদের শাসনকর্তা আবদাল্লার সাহায্য নিয়ে সিংহাসন দখলের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। যুদ্ধে জাহান্দার শাহের পরাজয় ঘটে এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়। জুলফিকার খাঁকেও হত্যা করা হয়। ১৭১৩ সালে ফারকশিয়ার দিল্লীর সিংহাসন দখল করলেন। আবদাল্লাকে নতুন ওয়াজির নিযুক্ত করা হলাে ও হসেন আলি পেলেন মীর বকসীর পদ। এদিকে জুলফিকারের হত্যার আদেশ দিয়ে ফারকশিয়ার মারাত্মক ভুল করেন, কারণ এর ফলে সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের পথ নিষ্কণ্টক হয়। ফলে চিন কুলি খাঁ, আবদুস সামাদ খাঁ ও আমিন খাঁ ছাড়া তাঁদের বাধা দেবার আর কেউ রইলাে । সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় এদের হাতে রাখতে সচেষ্ট হলেন। যাই হােক সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের উত্থানের ফলে হিন্দুস্থানী দলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলাে। ফারকশিয়ার শধ অপদার্থই ছিলেন না, তাঁর কোন কৃতজ্ঞতা বোধও ছিল না। সিংহাসন লাভ করার পর থেকেই তিনি সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরােধিতা শুরু করেন। তাঁর অত্যন্ত বিশবাসভাজন মীর জুমলার সাহায্য নিয়ে তিনি একের পর চক্রান্ত শর; করেন সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সৈয়দর। মীর জুমলাকে হাত করেন। এমনকি তাঁরা মারাঠাদেরও কৃতজ্ঞতা অর্জন করেন। ফারশিয়ারকে প্রথমে অন্ধ করা হয় ও পরে তাকে হত্যা করা হয় (১৭১৯)। এর পর সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় রফি-উন-শানের দুই পুত্রকে পর পর দিল্লীর সিংহাসনে বসান। এর পর তাঁরা বাহাদুর শাহের চতুর্থ পত্র জাহান শাহের পত্র আঠারাে বছরের যুবক রোশন-আখতারকে সমাট পদে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মুহম্মদ শাহ নাম গ্রহণ করে দিল্লীর সিংহাসনে আরােহণ করেন। এই ভাবে একের পর এক নিজেদের মনােনীত প্রার্থীকে দিল্লীর সিংহাসনে বসিয়ে ও নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করে তাঁরা king maker বা রাজা তৈরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

মহম্মদ শাহ (১৭১৯-৪৮) অবশ্য সৈয়দ-ভ্রাতৃদ্বয়ের অনুগত হয়ে থাকতে চাইলেন । তিনি সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের শত্রর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁদের ধংস করতে চাইলেন। নিজাম-উল মুলক ছিলেন সৈয়দদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। নিজামের চক্রান্তে হসেন আলি আততায়ীর হাতে নিহত হন। আবদাল্লা নিজের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য আর একজন পুতুল সম্রাটকে দিল্লীর সিংহাসনে বসাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনিও পরাজিত ও নিহত হন। এইভাবে সৈয়দদের পতন হলাে। এরপর নিজামের ক্ষমতা ও প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৭২২ সালে তিনি ওয়াজির নিযুক্ত হন। কিন্তু দিল্লীর দূষিত পরিবেশ নিজামের মনঃপুত ছিল না। তাছাড়া তাঁর উচ্চাকাঙ্খও ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি হায়দ্রাবাদে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাজে মন দেন। সৈয়দদের পতন ও নিজামের প্রত্যাবর্তন সত্বেও কিন্তু মহম্মদ শাহ মুঘল সাম্রাজ্যের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। একের পর এক প্রদেশ সম্রাটের হাতছাড়া হয় এবং নাদির শাহ দিল্লী আক্রমণ করে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেন।

পরবতী সম্রাট মহম্মদ শাহের পুত্র আহমদ শাহের আমলে (১৭৪৮-৫৪) মুঘল সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ওয়াজির গাজি উদদীন ইমাদ-উল-মুলক ( নিজামের প্রপৌত্র) তাঁকে অন্ধ করে সিংহাসনচ্যুত করেন এবং জাহান্দার শাহের পত্র আজিজ-উদ দীনকে দিল্লীর সিংহাসনে বসান। তিনি দ্বিতীয় আলমগীর উপাধি ধারণ করেন। কিন্তু তিনিও ওয়াজিরের হাত থেকে স্বাধীন হবার চেষ্টা করলে ওয়াজিরের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় শাহ আলম দিল্লী ত্যাগ করতে বাধ্য হন। শেপর্যন্ত তিনি ইংরেজদের সহায়তায় নিজ সিংহাসন পনেরধিকার করেন। তিনি ১৮০৬ পর্যন্ত জীবিত থাকলেও মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব তাঁর সময়ে কেবলমাত্র কাগজ কলমে ছিল।

এবার আসা যাক মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও অবলুপ্তির জন্য পরবর্তী মুঘল সম্রাট ও অভিজাতদের পারস্পরিক দায়িত্বের প্রশ্নে। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, মারাঠা, রাজপুত, জাঠ প্রভৃতি বিদ্রোহ দমনে ঔরঙ্গজেবের ব্যর্থতার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরব ও প্রতিপত্তি বিশেষভাবে ক্ষুন্ন হয়েছিল। অধ্যাপক সতীশচন্দ্রের মতে দরবারে বিভিন্ন দলের উদ্ভবের পটভূমি ছিল এই সব বিদ্রোহ দমনে ঔরঙ্গজেবের ব্যর্থতা। ঔরঙ্গজেবের মত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দিল্লীর সিংহাসন নিয়ে যে কলহ ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তার ফলে মুঘল সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিকে জায়গিরদারী সমস্যা জটিল আকার ধারণ করায় এবং ভাল ভাল জায়গায় জায়গির পাবার জন্য অভিজাতদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যাওয়ায় দলাদলি চরম আকার ধারণ করে। প্রত্যেক দল বা গােষ্ঠী চাইতাে সম্রাটকে সম্পূর্ণরপে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসে এবং ওয়াজির ও মীর বক্সীসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। এটা করতে গেলে অবশ্যই অন্য দল বা গােষ্ঠী যাতে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে, তার দিকে নজর রাখতে হতাে। ফলে চক্রান্ত, হত্যা প্রভৃতি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। উজিরাত দখলের লড়াইকে রাজতন্ত্র বনাম অভিজাততন্ত্রের সংঘর্ষ বলে মনে করা ভুল

মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাতদের দলাদলি ( মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ )

হবে। আসলে অভিজাতদের মধ্যে কোন ঐক্য ছিল না এবং মুঘল সম্রাটকে হঠিয়ে নতুন কোন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা কোন গােষ্ঠীরই ছিল না। সে ঝকি নেবার সাহসও তাদের ছিল না। সুতরাং প্রত্যেক গােষ্ঠীই চেয়েছিল মুঘল সম্রাটকে শিখণ্ডী রূপে সিংহাসনে রেখে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করতে। এই অবস্থায় দলাদলি বন্ধ করতে পারতেন একজন শক্তিশালী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সম্রাট। কিন্ত ঔরঙ্গজেবের মত্যুর পর যাঁরা সম্রাট হয়েছিলেন, তাঁদের সে যােগ্যতা ছিল না। তাছাড়া । আর একটি পথ খােলা ছিল। তা হলো ওয়াজিররা যদি সম্রাটের আস্থাভাজন হতেন, তাহলে তাঁরা হয়তাে এমন নীতি বা পন্থা অনুসরণ করতে পারতেন, যাতে মুঘল সাম্রাজ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটে। কিন্তু ওয়াজিরের বিরুদ্ধে সম্রাটের মন বিষয়ে তোলার জন্য অন্য গােষ্ঠী সব সময়েই সক্রিয় ও তৎপর ছিল। ফলে সম্রাটরাও অনেক সময় ওয়াজিরের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে ইতস্ততঃ করতেন না। কৃতজ্ঞতা বলে কোন কথা তাঁদের অভিধানে ছিল না। কিন্তু ওয়াজিরকে কিছুটা স্বাধীনতা না দিলে যে মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠবে, সে সম্পর্কে সম্রাটেরা সচেতন ছিলেন না। ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙ্গন এড়ানাে সম্ভব হয় নি।

সৈয়দদের ক্ষমতাচ্যুত করার পর নিজাম-উল-মুলক দেখলেন, বিরােধী গােষ্ঠীও যেমন তাঁর বিরুদ্ধে, সম্রাটও তেমনি তাঁকে পুরােপুরি সমর্থন বা বিশ্বাস করছেন না। এই অবস্থায় বিরক্ত হয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকলেন। তাঁর দেখাদেখি অন্যান্য অভিজাতরাও সম্রাটকে মৌখিক আনুগত্য জানিয়ে নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে শুরু করলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে অভিজাতরাও যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারতাে, তাহলে হয়ত সম্রাটের দুর্বলতা সত্ত্বেও মুঘল সাম্রাজ্য আরও কিছুকাল টিকে থাকতে পারতাে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ঐক্যের অভাব মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথ প্রশস্ত করে। অতএব মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য যেমন পরবতী মঘল সম্রাটদের অপদার্থতা ও অযােগ্যতা দায়ী ছিল, তেমনি অভিজাতদের স্বার্থপরতা ও দলাদলিও যথেষ্ট দায়ী ছিল। তবে এ কথা ঠিক যে, পরবর্তী মুঘল সম্রাটের যদি প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতেন, তাহলে অভিজাতদের দলাদলি এতটা কুৎসিত আকার ধারণ করতে পারতাে না। মনে রাখতে হবে মুঘল অভিজাত সম্প্রদায় আগাগােড়াই নানা দল ও উপদলে বিভক্ত ছিল। কিন্তু যতদিন সম্রাটেরা শক্তিশালী ছিলেন, ততদিন অভিজাত সম্প্রদায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি।

অনেকের ধারণা অষ্টাদশ শতকে মুঘল অভিজাত শ্রেণীর অধঃপতন ও অবক্ষয় মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য অনেকাংশে দায়ী। এই অধঃপতনের জন্য অভিজাত শ্রেণীর বিলাসবহুল জীবন, ভারতের জলবায়, ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি প্রভৃতিকে দায়ী করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই ধরণের বক্তব্য অনেকাংশে ভিত্তিহীন। অষ্টাদশ শতকে যে সমস্ত অভিজাত ব্যক্তি আবির্ভূত হয়েছিলেন—সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়, জুলফিকার খাঁ, নিজাম উল মুলক, আবদুস সামাদ খাঁ প্রভৃতি—তাঁরা কেউই অপদার্থ বা অযােগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তাঁদের অনসত নীতিও যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে। জুলফিকার খাঁ ও পরে সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় মারাঠা, জাঠ ও রাজপুতদের প্রতি বােঝাপড়ার নীতি অনুসরণ করে ও হিন্দু, মুসলিম ঐক্যের উপর গুরুত্ব আরােপ করে যথেষ্ট প্রগতিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুঘল অভিজাত সম্প্রদায় রাষ্ট্রের

বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা না করে নিজেদের গােষ্ঠী বাথের কথাই কেবল চিন্তা করেছে। এই কারণেই তাদের পক্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন রােধ করা সভব হয় নি। আবার অনেকে মনে করেন যে, অষ্টাদশ শতকে অভিজাত শ্রেণীর গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছিল ধর্ম ও জাতির ভিত্তিতে এবং তার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আজ এই ধারণা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। মুঘল অভিজাতদের দলাদলি গড়ে উঠেছিল গােষ্ঠীগত অথবা পারিবারিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের উপরে। তাই দেখা গেছে জুলফিকার খাঁ জন্মসূত্রে ইরানী হলেও, আবদুস সামাদ খাঁর মত তুরানী অভিজাত বা দাউদ খাঁ পন্নির মত আফগান অভিজাত ও এমন কি রাও রাম সিং হারা এবং দলপত বন্দেলার মত হিন্দও তাঁকে সমর্থন করেছেন। নিজাম উল মুলক অবশ্য জাতি ধর্মের জিগির তুলেছিলেন। কিন্তু এই ধরণের আওয়াজের পিছনেও ব্যক্তিস্বার্থ ও সুবিধাবাদী নীতির তাগিদ ছিল। সুতরাং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য অভিজাত শ্রেণীর অধঃপতন অথবা অভিজাত শ্রেণীর জাতি, ধর্ম ও গােষ্ঠীগত গড়ন দায়ী ছিল বলা সমীচীন হবে না। আসলে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে অনৈক্য ও স্বার্থপরতা মঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

জায়গিরদারী সংকট, কৃষক বিদ্রোহ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষদিকে এবং অষ্টাদশ শতকের গােড়ায় মুঘল সাম্রাজ্য এক চরম অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। সেই সঙ্কট হলো জায়গিরদারী সমস্যা, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে। জায়গিরদারী সমস্যার মূল কথা হলাে এই যে, যেটুকু উদ্বও জমি থেকে পাওয়া যেত, তা দিয়ে প্রশাসনিক ব্যয়, যুদ্ধের খরচ এবং রাজপুরুষদের জীবনযাত্রার প্রত্যাশিত বা উপযুক্ত মান বজায় রাখা সম্ভব ছিল না। একদিকে টাকার মূল্য হ্রাস পায়, অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যায়। শাসকশ্রেণীর জীবনযাত্রার মানও উদ্ধগামী হয়। মুঘল সম্রাটরা নিজেরাই জাঁকজমকপূর্ণ রাজসভা ও বিলাসবহুল জীবন যাপন করে এর একটা উদাহরণ স্থাপন করেন। এই অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে যা প্রয়ােজন ছিল, তা হলাে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি। মুঘল সম্রাটরা যে কৃষির উন্নতির জন্য কিছুই করেন নি, তা নয়। কিন্তু প্রয়ােজন অনুপাতে উৎপাদন বাড়ে নি। এদিকে জমা বা নির্ধারিত রাজস্ব যা ছিল, হাসিল বা আদায়ীকৃত রাজস্বের পরিমাণ তাঁর থেকে যথেষ্ট কম হতাে। আবার মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে গেলেও জায়গিরের সংখ্যা সমানুপাতিক হারে বাড়ানাে সম্ভব ছিল না। ফলে উৎকৃষ্ট জায়গিরের জন্য মনসবদারদের মধ্যে প্রতিযােগিতা শুরু হয়ে যায়। এই ধরণের অবস্থা থেকেই জায়গিরদারী সঙ্কটের সূত্রপাত।

ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে জায়গিরদারী সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করলেও জাহাঙ্গীরের রাজত্বের শেষ দিক থেকেই এই সঙ্কটের লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। শাহজাহান এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সঙ্কটের মূলে আঘাত করতে পারেন নি। অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান ব্যয়বধি ও সম্পদের মধ্যে সমতা রক্ষা একটি অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরঙ্গজেব খরচ কমিয়ে, নতুন কর ধার্য করে ও মনসবদারদের কৃষির উন্নতির জন্য নির্দেশ জারী করেও এই অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে সাংগঠনিক দুর্বলতা সম্পর্কে পড়ার জন্য নিচে ক্লিক করুন

 

Class 10 Model Activity Task

Compilation New October

নীচের বিষয় গুলিতে Click করে নতুন মডেল অ্যাক্টিভিটি টাস্ক গুলি লিখে নিতে পারবে

বাংলা

প্রথম ভাষা

অংক

ইংরেজী

2nd Language

জীবন  বিজ্ঞান

ভৌত বিজ্ঞান

ইতিহাস

ভূগোল

Leave a Comment