মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ সাংগঠনিক দুর্বলতা // The downfall of the Mughal Empire was due to organizational weakness

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও সাংগঠনিক দুর্বলতা

ঔরঙ্গজেবের মত্যুর (৩রা মার্চ, ১৭০৭) সঙ্গে সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন সূচিত হয় এবং ৫০ বছরের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্যের বিপুল আয়তন দিল্লী ও আগ্রার নিকটবর্তী অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের এই দুত অবক্ষয় স্বাভাবিক ভাবেই ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং কেন এই দুত পতন তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ও মত-বিরােধের সটি করেছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার ও আরভিন ( Irvine) পরবতী মঘল সম্রাটদের দুর্বলতা এবং মুঘল অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমিক অবক্ষয় ও নৈতিক অধঃপতনের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের উৎস অনুসন্ধান করেছেন। পরবর্তী মুঘল সম্রাট ও অভিজাত সম্প্রদায়ের বিলাসবহুল জীবন্যাত্রা মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে দিয়েছিল বলে তাঁর মনে করেন। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রশ্ন উঠবে ষােড়শ ও সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট ও অভিজাত সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা কি কম বিলাস বহুল ছিল? যাই হােক স্যার যদনাথ ঔরঙ্গজেবের অনুদার হিন্দু, নীতিকেও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করেছেন। ঔরঙ্গজেবের সংকীর্ণ নীতির ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য নষ্ট হয় এবং এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ভিন্নতর ব্যাখ্যা করেছেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সতীশচন্দ্রের মতে মনসবদারী প্রথার ভাঙন ও জায়গীর সংকট মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর একজন অধ্যাপক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব মনে করেন যে, ব্যাপক জায়গীর হস্তান্তরের ফলে জমিদার ও কৃষকদের উপর অত্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এরই অনিবার্য পরিণতি ব্যাপক কৃষি অসন্তোষ এবং জমিদার কৃষক বিদ্রোহ যা মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয় । আলিগড়ের আর একজন ঐতিহাসিক অধ্যাপক আতাহার আলিও বিশ্বাস করেন যে, অষ্টাদশ শতকে মুঘল শাসকশ্রেণীর অধঃপতনই এই সাম্রাজ্যের ধংসের অন্যতম কারণ। আতাহার আলি অবশ্য মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে এই পতন অষ্টাদশ শতকের সমগ্র ঐশ্লামিক জগতের একটি সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা” বা cultural failure এর পরিণতি।

এই শতকে ইউরােপে যখন কারিগরী ও প্রযুক্তি বিদ্যার ক্ষেত্রে এক ধরণের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছিল, তখন সমগ্র ঐশ্লামিক জগৎ স্থবির হয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাই অর্থনীতি ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অগ্রসর ইউরােপের সঙ্গে পাল্লা দেবার ক্ষমতা মুঘলদের ছিল না। সাদা চোখে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কিছুটা অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর বলে মনে হয়। একটু তলিয়ে দেখলে অবশ্য মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত পতনের চেয়ে এর দীর্ঘ দিন টিকে থাকাটাই আমাদের অবাক করে। আসলে ১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে যখন মুঘল সাম্রাজ্যের গােড়াপত্তন হয়েছিল, তখন থেকেই এর ভিত্তি চোরাবালির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর সাংগঠনিক কাঠামাে ছিল খুবই দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ন। এর জীবনীশক্তি ছিল ক্ষীণ। পরবর্তীকালেও এই দুর্বলতা ও ত্রুটিগুল কাটিয়ে ওঠার কোন সযত্ন প্রয়াস বা পরিকলপনা দেখা যায় নি।

সাংগঠনিক দূর্বলতার উৎসঃ

মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এর স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্রকাঠামো। এর স্থায়ীত্ব ও অস্তিত্ব নির্ভর করতাে সম্রাটের ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতার উপর। তাঁর ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। তাঁর কথাই ছিল আইন। এক কথায় তিনিই ছিলেন সমস্ত ক্ষমতার উৎস। তাঁকে অবশ্য ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে হতাে। কিন্তু ইচ্ছা করলে তিনি তাও অগ্রাহ্য করতে পারতেন। আধুনিক অর্থে কোন মন্ত্রীসভা তখন ছিল না এবং সম্রাট ইচ্ছা করলে মন্ত্রীদের মতামত বা উপদেশ অগ্রাহ্য করতে পারতেন। বলা বাহুল্য এই ধরণের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দক্ষতা ও কার্যকারিতা পুরােপুরি নিভর করতাে সামরিক শক্তির উপর। প্রজাদের আনুগত্য বা সমথনের উপর মুঘল সাম্রাটের নিভর করতেন না। ভীতি প্রদর্শন করে তাঁরা প্রজাদের আনুগত্য আদায় করতেন। অবশ্য মুঘল সম্রাটের যে প্রজাদের স্বার্থের কথা চিন্তা করতেন না, তা নয়। তবে সরকারী কাজকর্মে প্রজাদের কোন সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। জাতীয়তাবােধ বা দেশাত্মবােধের আদর্শ ছিল অজ্ঞাত। তবে মুঘল স্বৈরতন্ত্রী শাসন কাঠামােতে দু একটা ফাঁকও ছিল এবং সবক্ষেত্রে সমাটের নির্দেশ কঠোরভাবে মানা হতো না। সম্রাটের নিদেশ রাজধানী ও সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চলে পালন করা হলেও সাম্রাজ্যের দুরবর্তী এলাকায় তা সব সময় কার্যকরী হতাে না। সমকালীন ব্রিটিশ সুত্র থেকে জানা যায় শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুবাদার, দেওয়ান ও অন্যান্য সরকারী কর্মচারী অনেক সময় সম্রাটের নির্দেশের বিপরীত আচরণ করতেন। অনেক সময় সিংহাসন লাভ করার পর সম্রাট আগেকার আদেশ মেনে চলার জন্য নতুন করে ফতােয়া জারী করতেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে রাজ আজ্ঞা সব সময় কঠোরভাবে পালন করা হতো না।

স্পষ্ট উত্তরাধিকার আইনের অভাব

মুঘল সাম্রাজ্যের দুবলতার আর একটি উৎস হলাে একটি স্পষ্ট উত্তরাধিকার আইনের অভাব। আসলে একজন সম্রাট মারা গেলে কে তাঁর শূন্য সিংহাসনের অধিকারী হবেন, তার কোন বিধিবদ্ধ নিয়ম বা আইনই ছিল না। ফলে সম্রাটের প্রত্যেক পুত্রই সিংহাসন দাবী করতে পারতেন। এই পরিস্থিতিতে সিংহাসন নিয়ে উত্তরাধিকার যুদ্ধ বা রক্তাক্ত ভ্রাতৃবিরােধ ছিল স্বতঃসিদ্ধ ঘটনা। পিতা পুত্রের সংঘর্ষও অস্বাভাবিক ছিল না। জাহাঙ্গীরের সময় থেকেই সিংহাসন নিয়ে এই ধরণের সংঘর্ষ মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। তবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক  ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে শাহজাহানের জীবনের শেষ দিকে, যখন তাঁর মৃত্যুর আগেই তাঁর চার পুত্রের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে প্রকাশ্য কলহ ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই ধরণের উত্তরাধিকার যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক ছিল। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট ও বৈদেশিক আক্রমণ দুই-ই জটিলতার সষ্টি করতে পারতাে। মুঘলদের সৌভাগ্য যে, ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার যুদ্ধের অবসানে একজন শক্তিশালী সাম্রাটের আবির্ভাব ঘটেছিল। ঔরঙ্গজেবের মত্যুর পর উত্তরাধিকারী সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছিল। মুঘল সাম্রাজ্য সম্রাটের স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতার উপর দাঁড়িয়েছিল বলে সামরিক শক্তি ও সংগঠনের উপর এর স্থায়িত্ব নির্ভরশীল ছিল।

মনসবদারী প্রথাঃ

মুঘল সামরিক সংগঠনের প্রধান ভিত্তি ছিল মনসবদারী প্রথা। মুঘল অভিজাত সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছিল এই মনসবদারী প্রথাকে কেন্দ্র করে। মনসবদাররা সামরিক দায়িত্বের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন এবং দরকার হলেই সরকারকে সামরিক সাহায্য দিতে বাধ্য ছিলেন। প্রত্যেক মনসবদার অবশ্য সরাসরি সম্রাটের অধীন ছিলেন। সম্রাটই তাঁদের নিযুক্ত করতেন ও ইচ্ছা করলে তাঁদের পদোন্নতি করতেন বা পদচ্যুত করতেন। প্রত্যেক মনসবদারই “জাত” ও “সওয়ার” এই দুই পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন। জাত বলতে বােঝাত মনসবদারের ব্যক্তিগত পদমর্যাদা যার ভিত্তিতে আঁর ব্যক্তিগত আয় বা বেতন নির্ধারিত হতাে। অন্যদিকে সওয়ার পদ বলতে বােঝাত কত সংখ্যক সৈন্য ও ঘােড়সওয়ার তাঁর অধীনে থাকবে। মনসবদারদের বেতন দেয়া হতো -ভাবে। প্রথমতঃ কেউ বেতন পেতেন নগদ টাকায়। এদের বলা হতাে “মনসবদার-ই-নগদি”। কিন্তু বেশীর ভাগকেই নগদ টাকায় বেতন না দিয়ে জায়গির দেয়া হতাে, যা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ছিল তাঁর বেতন ও সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যয়িত অর্থের সমতুল। জায়গির বলতে বােঝাত একটি নিদিটি এলাকা বা ভূমি খণ্ড যা মনসবদার বা অন্যান্য সরকারী কর্মচারীদের নগদ বেতনের বিনিময়ে দেয়া হতো। এই সব জায়গিরের দায়িত্ব যাকে দেয়া হতাে তাকে বলা হতো জায়গিরদার। জায়গিরদাররা অবশ্য জায়গিরের মালিকানা দাবী করতে পারতেন না। প্রায়ই মনসবদারদের এক জায়গির থেকে অন্য জায়গিরে বদলি করা হতাে। এই ধরণের জায়গিরকে বলা হতাে “তনখা জায়গির। আর এক ধরণের জায়গির ছিল যাকে বলা হতাে ওয়াতন জায়গির’। আসলে এগুলি ছিল হিন্দু, সামন্তদের রাজ্য। মুঘলদের উত্থানের আগে থেকেই এদের অস্তিত্ব ছিল। এদের রাজস্ব নির্ধারণে মুঘল সরকারের কোন হাত ছিল না। সামন্ত রাজা বা জমিদাররাই এই রাজস্ব নির্ধারণ করতেন। এই ধরণের জায়গির বংশানুক্রমে উপভােগ করা যেত। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বদলি চলতাে না।

মুঘল অভিজাত শ্রেণী বা মনসবদার তথা জায়গিরদাররা মুঘল রাষ্ট্রের ভিতকে একদিক দিয়ে যেমন শক্তিশালী করেছিল, অন্যদিকে তেমনি এই প্রথার সাংগঠনিক এটি মুঘল রাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কি ভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল, তা বুঝতে গেলে কোন শ্রেণী বা সমাজের কোন স্তর থেকে মনসবদারদের নিয়ােগ করা হতাে, সে সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা দরকার। সাধারণভাবে মনসবদারদের নিয়ােগ সম্রাটের মর্জির উপর নির্ভর করলেও জন্ম ও বংশের উপর যথেষ্ট জোর দেয়া হতাে। অবশ্য যোগ্যতা থাকলে বংশ কৌলীন্যহীন ব্যক্তিও মনসবদার হতে পারতেন। যাই হােক সাধারণভাবে মনসবদারের পুত্র বা উত্তরাধিকারীই মনসব পদের জন্য বিবেচিত হতেন। এদের বলা হতাে খানাদাজ। মুঘল আমলে বিভিন্ন জাতি ও গােষ্ঠী থেকে মনসব পদ ভর্তি করা হতাে। এই সব জাতি ও গােষ্ঠীর মধ্যে ইরানি (পারস্যদেশী মুসলমান ), তুরানি (মধ্য-এশিয়া থেকে আগত-মসলমান), আফগান ও ভারতীয় মুসলমানও যেমন ছিলেন, তেমনি রাজপুত, মারাঠা প্রভৃতি হিন্দুরাও ছিলেন। আসলে মুঘলরা যখনই দেখেছেন যে, কোন জাতি যা গােষ্ঠী যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে উঠেছে, তখনই তাদের দলপতিদের মনসব প্রদান করে মুঘল শাসনব্যবস্থার অঙ্গীভূত করতে চেষ্টা করেছেন। এইভাবে বিভিন্ন জাতি ও গােষ্ঠীর মধ্যে মনসব বণ্টনের একটা সুবিধা ছিল এই যে, এর ফলে একটি গােষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য গােষ্ঠীকে কাজে লাগানাে যেত। তা ছাড়া এর দ্বারা একটি পরিবার বা গােষ্ঠীর বংশানুক্রমিক আনুগত্য পাওয়া যেত। কিন্তু অন্যদিকে মুঘল রাষ্ট্রের এই পাঁচমিশেলী অভিজাত সম্প্রদায় তার দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন জাতি ও গােষ্ঠীতে বিভক্ত মুঘল অভিজাতদের মধ্যে কোন ঐক্য বােধ জেগে ওঠে নি, বরং গােষ্ঠীদ্বন্দ্ব লেগেই ছিল। বলা বাহুল্য মুঘল অভিজাত সম্প্রদায় বহ যােগ্য প্রশাসক ও রাজপুরষ উপহার দিয়েছিল। তবে অভিজাত সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালনা করা ও রাষ্ট্রের স্বার্থে যথাযথভাবে ব্যবহার করার দায়িত্ব ছিল সম্রাটের উপর। কিন্তু সম্রাট দুর্বল হয়ে পড়লে এ কাজ করা তাঁর পক্ষে দুরহ হয়ে উঠত এবং সে ক্ষেত্রে অভিজাত সম্প্রদায় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ও ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের স্বার্থ বিসর্জন দিতে ইতস্ততঃ করতাে না। (com)

মুঘল রাষ্ট্র কাঠামো ও সমাজে যে দুটি শ্রেণীর প্রাধান্য ছিল, তা হলাে জমিদার ও জায়গিরদার। দুটি শ্রেণীই কৃষকদের উদ্বত্তের উপর ভাগ বসিয়ে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিস্তার করেছিল। এই উদ্বও আদায়ের পদ্ধতি অবশ্য উভয়ের ক্ষেত্রে এক ধরণের ছিল না। জমিদাররা বংশানুক্রমিক স্বত্ব ভােগ করতে পারতো এবং এদের অস্তিত্ব ভারতে তুকী আক্রমণের আগে থেকেও ছিল। ভারতের মুসলিম শাসকেরা জমিদারদের বিশেষ অবস্থা মেনে নিয়েছিল। জমিদারের। কিন্তু সুযােগ পেলেই সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতেন। এদিকে মুঘল সম্রাটরাও বিভিন্নভাবে জমিদারদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করতেন। কখনাে কখনাে বড় জমিদারী ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা করা হতাে। কোন কোন ক্ষেত্রে অবাধ্য জমিদারকে সরিয়ে দেওয়া হতাে। আকবরের নীতি ছিল জমিদারদের মনসব পদে নিয়ােগ করে তাঁদের মুঘল শাসনের মধ্য অঙ্গীভূত করা। এ সব করেও কিন্তু জমিদারদের সব সময় দমন করা যেত না। ভারত, রাজপুতানা ও দাক্ষিণাত্যে জমিদার শ্রেণী যথেষ্ট প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। স্থানীয় আনুগত্য ও ভাষাগত ঐক্যকে মলধন করে জমিদার শ্রেণী স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে চেষ্টা করতাে ও আঞ্চলিক ভাবালুতার প্রশ্রয় দিত। আকবর এই ধরণের আঞ্চলিকতার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে অনেক সময় জমিদারদের অস্তিত্ব মঘল রাষ্ট্রের পক্ষে যথেষ্ট বিপজ্জনক ছিল। মুঘল সম্রাটের অনেক প্রশাসনিক সমস্যার জন্য জমিদাররাই দায়ী ছিলেন। অথচ ট্রাজেডি এইখানে যে, মুঘল শাসন অনেকাংশে জমিদারদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের একই সঙ্গে শক্তিবদ্ধ ও অবক্ষয়ে জমিদারদের ভূমিকা প্রসঙ্গে অধ্যাপক রেল হাসান মন্তব্য করেছেন…‘The Mughal empire achieved its great

জমিদারদের মত জায়গিরদাররাও মনে করতাে যে জমিই হচ্ছে সমস্ত সম্পদ ও শক্তির উৎস। তাঁরা কৃষকদের কাছ থেকে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ সরাসরি গ্রাম প্রধান বা জমিদার মারফৎ আদায় করতেন। আগেই বলেছি জায়গির প্রদান করা হতো প্রশাসকদের প্রাপ্য বেতনের বিনিময়ে এবং জায়গিরের মেয়াদ থাকতাে ততদিনই, যতদিন একজন কর্মচারী সরকারী কাজে থাকতেন। অর্থাৎ কোন জায়গির বংশানুক্রমে ভােগ করা যেত না, যদিও সম্রাট ইচ্ছা করলে একজন জায়গিরদারের পুত্রকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে পারতেন। এক্ষেত্রেও কিন্তু জায়গিরদারদের পুত্রকে যােগ্যতার পরিচয় দিতে হতাে। জায়গিরদারেরা যাতে দীর্ঘদিন এক জায়গায় থেকে ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারে, তার জন্য যে বদলির ব্যবস্থা ছিল, সে কথাও আগে বলেছি। যাই হােক মুঘল ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় জায়গিরদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কৃষির উন্নতির দিকে তাঁদের যথেষ্ট নজর ছিল। পতিত জমি উদ্ধার করার ব্যবস্থা করে, জলসেচের ব্যবহা করে, প্রয়োজনে কৃষি ঋণ (তকাবি) দিয়ে ও অন্যান্য নানা ভাবে তাঁর। কৃষির উন্নতির চেষ্টা করতেন। সুতরাং মুঘল রাষ্ট্র কাঠামোকে শক্তিশালী করতে তাঁদের যথেষ্ট অবদান ছিল ; তথাপি জায়গিরদারী প্রথাও মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার জন্য যথেষ্ট দায়ী ছিল। জায়গিরদারেরা অনেক সময়েই চেষ্টা করতেন জায়গিরের উপর তাদের দখলীসত্বকে চিরস্থায়ী বা বংশানুক্রমিক করতে। এটা করা অবশ্য সম্ভব ছিল তখনই, যখন মুঘল সম্রাট দুর্বল হয়ে পড়তেন। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সংহতি বিনষ্ট হবার আশঙ্কা ছিল। সতীশ চন্দ্র যথার্থই বলেছেন—“The nobility played a dual or a dialectical role, being a factor of integration at one time, and of disintergration at another.” (Satish chandra-“Parties and politics at the Mughal court” P—XXVI) এই কারণেই আকবর কর্মচারীদের জায়গিরের পরিবর্তে নগদ বেতন দানের পক্ষপাতী ছিলেন। সম্ভব হলেই তিনি জায়গির ভূমিকে খালিসা বা সরকারের খাস কিংবা নিজস্ব জমিতে রপান্তরিত করতেন। কিন্তু পরে খালিসা জমির পরিমাণ ক্রমশঃ কমতে থাকে। আকবরের রাজত্বের শেষদিকে অন্ততঃ তিনটি প্রদেশে এর পরিমাণ ছিল এক চতুর্থাংশ। জাহাঙ্গীরের আমলে তা কমে দাঁড়ায় কুড়ি ভাগের এক ভাগ। শাহজাহান অবশ্য এর পরিমাণ বাড়ান এক সপ্তমাংশ। ফলে জায়গিরদারের ক্ষমতা বেড়ে যেতে থাকে।

মুঘল সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণ হিসাবে অনেক সময় মুঘল অর্থ-নীতির কথা বলা হয়। মুঘল অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি এবং ভূমি-রাজস্বই ছিল মুঘল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন আকবর। তিনি বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর টোডরমলের সুপারিশে যে ভূমি বন্দোবস্ত চাল করেছিলেন, তাতে জমি জরিপ করে উৎপাদিকা শক্তির ভিত্তিতে দেয় রাজস্বের পরিমাণ স্থির করে কৃষকদের কাছ থেকে নগদে কর আদায় করা হতাে। এই ব্যবস্থাকে “জাবতী’ ব্যবস্থা বলা হতাে। উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশ ছিল সরকারের প্রাপ্য। আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থা সরকার ও প্রজা উভয়ের স্বার্থের কথা চিন্তা করে গড়ে তােলা হয়েছিল। কিন্তু আকবরের মত্যুর পর থেকে ক্রমশঃ এই ব্যবস্থায় ভাঙন ধরতে থাকে। জাহাঙ্গীরের আমল থেকে ইজারা প্রথা চাল হয় ও সপ্তদশ শতকে এই প্রথা আরও ব্যাপকভাকে ছড়িয়ে পড়ে। ইজারা প্রথায় সরকার বা জায়গিরদারেরা রাজস্ব আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতেন। অথাৎ সরকার বা জায়গিরদারদের হয়ে তাঁরা রাজস্ব আদায় করে দিতেন এবং একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তাঁদের হাতে তুলে নিয়ে বাকীটা তাঁরা তাঁদের পারিশ্রমিক হিসাবে নিজেদের কাছে রেখে দিতেন। ইজারাদারেরা কি পরিমাণ অর্থ নিজেদের কাছে রাখতেন সে সম্পকে অবশ্য সপষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। বলা বাহুল্য ইজারাদারদের জমির উপর কোন চিরস্থায়ী স্বত্ব বা অধিকার থাকতাে না। মুঘল আমলে এমনিতেই ভূমি রাজস্বের হার চড়া ছিল এবং সপ্তদশ শতকে কৃষকদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব টাকা আদায় করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই অবস্থায় ইজারাদারী ব্যবস্থায় প্রজাদের দুঃখ কষ্টের অবধি ছিল না। ইজারাদারী ব্যবস্থায় যেমন কৃষির অবনতি দেখা দেয়, তেমনি কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে। মুঘল সাম্রাজ্যে কৃষকদের যে সব সময়ে নিম মভাবে শোষণ করা হতাে, তা নয়। কৃষির উন্নতির দিকেও কিছুটা নজর রাখা হতাে, যদিও মুঘল প্রশাসনের মৌলিক দুর্বলতার জন্য অনেক সময় সরকারের নীতি ও প্রচেষ্টা সঠভাবে কার্যকরী করা যেত না। অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরীর মতে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগেও কৃষির অবস্থা আকবরের সময়ের চেয়ে খুব একটা খারাপ ছিল না। তাঁর ভাষায় “In the mid-eighteenth century, agriculture in most parts of India—with the probable exception of the regions devastated by the war with the Marathas-does not appear to have been in a worse state than in the days of Akbar.” (Cambridge economic history of India-vol I P,178) সুতরাং মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার উৎস হিসাবে এই বিষয়টিকে নিয়ে হয়ত বাড়াবাড়ি করা কিছুটা অযৌক্তিক। আসলে মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ভিত্তির জন্য এবং এর স্থায়িত্ব রক্ষার তাগিদে সব । সময়েই বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রয়ােজন হতাে এবং এই সম্পদ জোগাড় করতে বলপ্রয়ােগ ও জোরজবস্তি করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। “The Mughal state was an insatible Leviathan ; its impact on the economy was ; defined above all by its unlimited appetite for resources.” ( T. Ray Chaudhury Cam. Eco. hist vol I P; 173) কিন্তু সম্পদ বৃদ্ধির দিকে কোন সপরিকল্পিত প্রচেষ্টা ছিল না। এই আপাত বিরােধই ছিল মুঘল অর্থনীতির দুর্বলতার প্রধান উৎস। মুঘল সাম্রাজ্যের মাথাভারী প্রশাসন ব্যবস্থা ধরে রাখা সীমিত আর্থিক সম্পদের মধ্যে সম্ভবপর ছিল না।

পরিশেষে মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল হলেও তার দক্ষতাও সন্দেহাতীত ছিল না। প্রথমতঃ মুঘল সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল পাঁচমিশেলী জাতির সংমিশ্রণে। স্বাভাবিকভাবেই তাই মঘল সেনাবাহিনীর মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল। কোনক্রমেই মুঘল সেনাবাহিনীকে একটি জাতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদা দেওয়া যায় না। দ্বিতীয়তঃ সাধারণ একজন মঘল সৈনিকের সঙ্গে সম্রাটের কোন যােগাযোগ ছিল না। মনসবদারী প্রথায় একজন সৈনিক তার উর্ধতন মনসবদারের অনুগত ছিল এবং তাঁর স্বার্থ ও ভাগ্যের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ জড়িত ছিল বলে মনে করতাে। সুতরাং কোন অভিজাত ব্যক্তি সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করলে অথবা কোন দলাদলি দেখা দিলে, সে তার নিয়ােগকর্তাকেই সমর্থন করতে। সম্রাটের স্বার্থ সে দেখতাে না। তৃতীয়তঃ মুঘল সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করতে প্রধানতঃ ক্ষিপ্রগতি অশ্বারােহী সৈন্যের উপর। কিন্তু রাজস্থান বা মহারাষ্ট্রের মত পার্বত্য অঞ্চলে অশ্বারােহী বাহিনী অনেকটা অকেজো হয়ে যেত। সবশেষে মুঘল সেনাবাহিনীতে কোন শঙখলা বা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছিল না। সাধারণ সৈনিকের বেতনও ছিল অল্প। অন্যদিকে মুঘল সেনাবাহিনীতে অগণিত অসামরিক ব্যক্তির স্থান ও জাঁক-জমক তার দক্ষতা ও গতির পক্ষে ক্ষতিকারক হয়েছিল। মঘল সেনানিবাস ছিল একটি চলমান নগরী। সেখানে নাচ, গান, হারেম, বাজার সবকিছুই ব্যবস্থা থাকতাে। আকবর এই ত্রুটি সংশােধন করার কিছুটা চেষ্টা করলেও, অন্যান্য মুঘল সম্রাট এ বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষিপ্রগতি রাজপুত ও মারাঠা সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুঘল সেনাবাহিনী এটে উঠতে পারতাে না। অধ্যাপক আতাহার আলির মতে যোড়শ শতক থেকেই ইউরােপে যখন, গােলন্দাজ বাহিনীকে শক্তিশালী করে তােলার জন্য নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল তখন মঘল সম্রাটরা উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণ করার দিকে নজর না দিয়ে তাদের চিরাচরিত অবারােহী বাহিনীর উপর নির্ভর করতেন। স্বাভাবিক কারণেই তাই মঘল সেনাবাহিনী ইউরােপের অনুকরণে গড়ে তােলা নাদির শাহের শক্তিশালী গােলন্দাজ বাহিনীর সঙ্গে এটে উঠতে পারেনি।

মুঘল সম্রাটদের আর একটি ব্যর্থতা হলাে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষায় অবহেলা। অথচ উত্তর পশ্চিম সীমান্ত ছিল ভারত আক্রমণের সদর দরজা। • উত্তর পশ্চিম সীমান্ত রক্ষা করার জন্য কান্দাহার দখল ছিল অপরিহার্য। তা ছাড়া উত্তর পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন দুর্ধর্ষ উপজাতিদের দমন করাও ছিল খুবই জরুরী। আকবরের পরবতী মঘল সম্রাটের এই বিষয়ে তৎপরতা দেখাতে পারেন নি। জাহাঙ্গীরের আমলেই কান্দাহার মুঘলদের হাতছাড়া হয়ে যায়। শাহজাহান বারবার চেষ্টা করেও কান্দাহার পনরধিকার করতে পারেন নি। ঔরঙ্গজেব এ ব্যাপারে কোন চেষ্টাই করেন নি। উপজাতিদের দমন করার প্রশ্নেও মুঘলদের কৃতিত্ব উল্লেখযােগ্য নয়। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত রক্ষায় মুঘলদের এই ব্যর্থতা মুঘল সাম্রাজ্যকে বৈদেশিক আক্রমণের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

ওরঙ্গজেব এর পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতা ও অভিজাত দের দলাদলি

Mock Test Series

Leave a Comment