The Importance of 18th Century in Indian History II ভারতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের গুরুত্ব

The Importance of 18th Century in Indian History II ভারতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের গুরুত্ব

ভারতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের গুরুত্ব অসাধারণ। এই শতকের মধ্যেই দশাে বছরের সমহান ঐতিহ্যের অধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে ও ভারতের রাজনৈতিক অনৈক্য ও শাসনতান্ত্রিক নৈরাজ্যের সুত্রপাত হয় অন্যদিকে এই শতকে , ইংরেজ বণিকের মানদণ্ড ধীরে ধীরে রাজদণ্ডে পরিণত হয়। সুতরাং অষ্টাদশ শতক এক যুগ পরিবর্তন ও রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী। রাজনৈতিক পালাবদল আগেও ঘটেছে। কিন্তু অষ্টাদশ শতকে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, তা ভারত ইতিহাসের গতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে ও ভারত ইতিহাসের মােড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এর ফলে সূচনা হয়েছিল এক নবযুগের, যা ভারতের চিরাচরিত জীবন প্রবাহে তুলেছিল এক নতুন তরঙ্গ। পশ্চিমী সভ্যতার সংস্পর্শে এসে ভারতের মধ্যযুগীয় তন্দ্রার বিনাশ ঘটে। ভারত পা বাড়ায় আধুনিকতার পথে। কিন্তু এই নব চেতনা ও উত্তরণের পদধ-নমাত্র শোনা গিয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। উনবিংশ শতকেই এর পরিপণ বিকাশ ঘটছিল। বতুতঃ অষ্টাদশ শতককে এক যুগ সন্ধিকাল বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

অষ্টাদশ শতকের ভারতের প্রধান বৈশিষ্ট্য

অষ্টাদশ শতক ছিল ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের যুগ

অষ্টাদশ শতকের ভারতের প্রধান বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক অনৈক্য ও অস্থিতিশীলতা। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ফলেই এই অনৈক্য ও বিশখার সূত্রপাত হয়। ঔরঙ্গজেবের মত্যুর (১৭০৭) পরই সুবিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের পতন সূচিত হয় এবং মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবসূর্য অস্তমিত হয়। এরপর মুঘল সাম্রাজ্য নামে মাত্র তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৭৪০ সালের পর থেকে । মুঘল সাম্রাজ্যের সীমারেখা দিল্লী ও আগ্রার সন্নিহিত এলাকার সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে সঙ্কুচিত হয়ে যায়। অবশ্য ক্ষমতা না থাকলেও মুঘল সম্রাট ছিলেন আইনতঃ ভারতের অধীশ্বর। অষ্টাদশ শতকেও সম্রাট পদের ঐতিহ্য ও সম্মান ছিল অম্লান। তাই দরবতী এলাকাগুলিতে তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, স্থানীয় রাষ্ট্রনায়কেরা তাঁকে মান্য করে চলতেন, অন্ততঃ মৌখিক আনুগত্য প্রদর্শন তাঁরা করতেন। এমন কি মারাঠারা, যাঁদের পদভরে ভারত প্রকম্পিত হতাে, মুঘল সম্রাটকে নিজেদের কর্তৃত্বাধীনে আনলেও তাঁর মর্যাদাটুকু দিতে কার্পণ্য করতেন না, বা তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতা অস্বীকার করতেন না। তেমনি ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা যখন বাংলায় দেওয়ানী লাভ করে, তখন তাঁরা মঘল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকেই তা গ্রহণ করেন। এর অর্থ ছিল প্রকারান্তরে মুঘল সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতার স্বীকৃতি। মুঘল সম্রাট অবশ্য এই মৌখিক আনুগত্যটুকুতেই সন্তুষ্ট ছিলেন বা থাকতে বাধ্য হতেন, কারণ ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁদের পক্ষে দীর্ঘ দিন সিংহাসনে টিকে থাকাই ছিল এক কঠিন সমস্যা। তাঁরা ছিলেন অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতের পুতুল। ফলে ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে মাঘল সম্রাটের পক্ষে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করা ছিল আকাশ কুসম কল্পনা।

অষ্টাদশ শতক ছিল জোর যার মূলক তা্রের যুগ

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ফলে যে বিরাট রাজনৈতিক শুন্যতার সষ্টি হয়েছিল, তা ভরাট করার মত কোন শক্তি তখন ভারতে ছিল না। ফলে কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোেগে আঞ্চলিক শক্তিগুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। শুধু ভারতেই নয়, পথিবীর অন্যত্রও, অষ্টাদশ শতক কলঙ্কিত হয়ে আছে নীতিহীনতা ও অসৎ তথা আইনবিরােধী রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য। এই শতক ছিল জোর যার মূলকের যুগ। ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও ঐতিহ্যের কোন মূল্যই ছিল না এই যুগে। উচ্চাকাঙ্খ ও যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা দখল করাই ছিল এই সময়ের রাজনৈতিক মন্ত্র। ভাগ্যান্বেষী ও সুযােগসন্ধানী ব্যক্তিরাই তাই অষ্টাদশ শতকের রাজনীতির শিরোনামায় নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন। মঘল সাম্রাজ্যের পতন তাই সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দিল.সেই শ্রেণীর মানুষের কাছে, যাঁদের বুকে ছিল বল আর দুর্জয় সাহস ; যাঁরা একদিকে চতুর ও অন্যদিকে বিচক্ষণ, তৎপর এবং অসাধারণ নেতৃত্বের অধিকারী। সর্বোপরি এদের ছিল আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙখা। অষ্টাদশ শতকের ইতিহাস তাই গড়ে উঠেছে এই ধরণের মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে। মুঘল সাম্রাজ্যের ধংসস্তুপের উপর তাই গড়ে উঠল কার্যতঃ স্বাধীন কয়েকটি রিয়াশত বা প্রাদেশিক শাসন। এই সব রিয়াশতের মধ্যে বাংলা, অযােধ্যা ও হায়দ্রাবাদ ছিল প্রধান। বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ ও আলীবদী সামান্য অবস্থা থেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। অযােধ্যায় সাদাত খাঁ ও সফদর জঙ্গ একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হায়দ্রাবাদে নিজাম উল মুলক কার্যতঃ স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। এরা অবশ্য কেউই সরাসরিভাবে মুঘল সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতা অস্বীকার করতেন না। এই সব শাসনকতা নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতা লাভ করেই সন্তুষ্ট ছিলেন। নিজের গণ্ডীর বাইরের ব্যাপারে এরা খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। নিজাম উল মুলক হায়দ্রাবাদে নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দিল্লীর রাজনীতি থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে, মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙন যখন প্রায় সম্পর্ণ, মহীশরে আর একজন ভাগ্যান্বেষী নায়ক হায়দর আলি তখন ক্ষমতাসীন হিন্দ, মন্ত্রী নঞ্জরাজকে হঠিয়ে সমস্ত ক্ষমতা দখল করেন ও স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন। তবে তিনিও তাঁর বেআইনী ক্ষমতা দখল যাতে প্রথাসিদ্ধ হয় ও মুঘল সম্রাটের অনুমােদন লাভ করে তার জন্য মুঘল দরবারে ভেট পাঠিয়েছিলেন।

কয়েকটি অঞ্চলে মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণার ফলে স্বাধীন শক্তির অভ্যুত্থান ঘটে। এই সব বিদ্রোহ অবশ্য ঔরঙ্গজেবের জীবদ্দশাতেই ঘটেছিল মূলতঃ তাঁর সংকীর্ণ ও অনুদার নীতির ফলে। তাঁর মত্যুর পর এই সব এলাকা সম্পূর্ণভাবে মুঘল সম্রাটদের হাতছাড়া হয়ে যায়। জাঠ, শিখ, রাজপুত ও মারাঠারা এইভাবে মুঘল অধীনতা অস্বীকার করে। এর মধ্যে অবশ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে জাঠদের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষদিকে জাঠেরা রাজারাম, ভঞ্জা ওচূড়ামণের নেতৃত্বে মাঝে মাঝে দিল্লী ও আগ্রার সন্নিহিত এলাকায় হানা দিয়ে ত্রাসের সঞ্চার করতাে। কিন্তু একমাত্র স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করা ছাড়া এইসব আক্রমণের খুব একটা গুরত্ব ছিল না। পরে অবশ্য চডুমিণের ভ্রাতুপত্র বদন সিং-এর নেতৃত্বে জাঠরা কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছিল। আগ্রা ও মাত্রা জেলায় তিনি তাঁর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর উত্তরাধিকারী ও দত্তক পত্র সরজমল ভরতপুর অঞ্চলে জাঠদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর জাঠদের পতন ঘটে। শিখ ও রাজপুতেরা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযােগে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। 

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে শিখরা কিছুটা দুর্বল ছিল। কিন্তু প্রথমে নাদির শাহ ও পরে আহমদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণের সুযােগ নিয়ে শিখরা দ্রুতগতিতে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর নেতৃত্বে শিখরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী শিখরাষ্ট্র স্থাপনে সফল হয়। অন্যদিকে ঔরঙ্গজেবের আমল থেকেই রাজপুতরা মুঘলদের বিরুদ্ধাচরণ করলেও তারা মুঘলদের অধীনতা সরাসরিভাবে অস্বীকার করে নি। তবে মুঘল সম্রাটরাও রাজপুতানার উপর তাঁদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন নি। কিন রাজপুতদের অভ্যুত্থান ছিল একটি সাময়িক ঘটনা। তাদের দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে মারাঠারা ক্রমশঃ এই এলাকায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তারে তৎপর হয়। সুতরাং অষ্টাদশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক উত্থান পতনের বহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে রাজপুতদের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। এই সব বিদ্রোহী শক্তির মধ্যে মারাঠারাই ছিল সবাপেক্ষা ক্ষমতাসম্পন্ন ও প্রভাবশালী।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই পেশবাদের নেতৃত্বে মারাঠারা যেভাবে দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তার করতে শুরু করেছিল যে, একমাত্র তাদের পক্ষেই মুঘল সাম্রাজ্যের শন্যহান পণ করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৭৬১ সালে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালীর হাতে তাদের চড়ান্ত পরাজয় ঘটায় মারাঠা শক্তি নির্জীব হয়ে পড়ে। সারা ভারত জুড়ে মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন এর ফলে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মারাঠা শক্তি হয়ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি। কিন্তু, মারাঠাদের পক্ষে এই ধাক্কা পুরােপুরি সামলে ওঠা কোনদিনই সম্ভব হয় নি। মারাঠাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপত্রে পথে এই বাধা অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক অনৈক্য ও অনিশ্চয়তার প্রশ্নটিকে নিঃসন্দেহে জটিলতর করে তুলেছিল।

মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরেই রাজনৈতিক অনৈক্য ও জটিলতার সৃষ্টি করে নি। মুঘল সম্রাটের দুবলতা বৈদেশিক আক্রমণের ইন্ধনও জুগিয়েছিল। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ এক প্রকার বিনা বাধায় ভারত আক্রমণ করে দিল্লী নগরী লণ্ঠন করেন ও নির্বিচারে নরহত্যা চালান। দিল্লী শহরকে নরকে পরিণত করে নাদির শাহ দেশে ফিরে যান। মঘল সম্রাট মামদ শাহ নিজ সিংহাসন ফিরে পান। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গেছে। কোহিনুর ও শাহজাহানের ময়র সিংহাসনসহ বহ, অমূল্য রত্নরাজি ও বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে নিয়ে গিয়ে নাদির শাহ মুঘল সাম্রাজ্যের ভিতে বিরাট ফাটলের সৃষ্টি করেন। নাদির শাহের ব্যক্তিগত সচিবের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, নাদির শাহ নগদে ১৫ কোটি টাকা দিল্লী থেকে আত্মস্মাৎ করেন। তা ছাড়া যে বিপুল পরিমাণ মণিমুক্তা ও অন্যান্য বহুমল্য দ্রব্যসামগ্রী তিনি দেশে নিয়ে যান, তার কোন হিসাবেই ছিল না। নাদির শাহের

আক্রমণ মুঘল অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। অন্যদিকে এই আক্রমণের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্মান ও মর্যাদা পুরােপুরি বিনষ্ট হয়। সর্বসমক্ষে এর দৈন্যদশা দিবালােকের মত পষ্ট হয়ে ওঠে। নাদির শাহ কিন্তু ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের কোন পরিকই গ্রহণ করেন নি। যেমন অকস্মাৎ তাঁর আক্রমণ, তেমনি দুত তাঁর পশ্চাৎ অপসারণ। ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের হলাভিষিক্ত হলো না নাদির ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সাম্রাজ্য। কিন্তু নাদিরের অভিযান অষ্টাদশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা আরাে এক ধাপ এগিয়ে দিয়ে গেল। মুঘল সাম্রাজ্যের উপর চরম আঘাত হেনে মুঘল পনরভ্যুত্থানের সম্ভাবনা চিরতরে বিলুপ্ত করে দিল ; খুলে দিল ভবিষ্যৎ বৈদেশিক আক্রমণের দয়ার ।

১৭৪৭ সালে নাদির শাহের মৃত্যুর পর তাঁর একজন অনুচর আহমদ শাহ আবদালী আফগানিস্থানে নিজ ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করে দর-ই-দরান উপাধি গ্রহণ করেন। নাদির শাহ যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন আবদালী মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ও চতুর্দিকের নৈরাজ্য স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে যান। ফলে ১৭৪৮ সাল থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি বারংবার ভারত আক্রমণ করে মুঘল সম্রাটদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন। তাঁর এই বারংবার আক্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অন্ততঃ ভারতের একটি অংশে আফগান প্রাধান্য পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা। আবদালীর আক্রমণের ফলে পাঞ্জাবে এক চরম নৈরাজ্য ও বিশঙ্খলা দেখা দেয়। দুবল মুঘল সম্রাটের পক্ষে তাঁর অভিযান প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। কিন্ত আবদালীও পাঞ্জাবের উপর তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি। তাঁর ভারত ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্জাবে এক বিশঙখল ও অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব হতাে। এই অবস্থায় মারাঠারা পাঞ্জাবের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শর করায় জটিলতা আরও বদ্ধি পায়।

আসলে মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযােগে আবদালী যেমন উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিজ প্রাধান্য বিস্তারে সক্রিয় ছিলেন, মারাঠারাও তেমনি এই অরাজকতার সুযোগে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাধান্য হাপনে উদগ্রীব ছিল। পাঞ্জাব এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকার হয়। ফলে উভয় শক্তির মধ্যে এক চরম সংঘর্ষ অস্বাভাবিক ছিল না। ১৭৬১ সালে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা ও আবদালীর মধ্যে যে চড়ান্ত শক্তি পরীক্ষা হয়, তাতে মারাঠাদের চরম পরাজয় ঘটে। এর ফলে মারাঠাদের বিজয় রথের অগ্রগমন থমকে দাঁড়াল। কিন্তু আবদালীও এই জয় থেকে কোন রাজনৈতিক ফসল তুলতে পারলেন না। ১৭৬২ সালের শেষ দিকে তিনি ভারত ছেড়ে চলে গেলেন। যাবার সময় তিনি ভারতীয়, আমীর ওমরাহদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন দ্বিতীয় শাহ আলমকে মুঘল সম্রাট হিসাবে স্বীকৃতি দিতে। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পরেও কিন্তু পাঞ্জাবের অরাজক পরিস্থিতির অবসান হলাে না। তবে শিখর এই চরম নৈরাজ্যের পর্ণ সদ্ব্যবহার করে দ্রুত গতিতে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। আবদালী তাঁর সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ ও আভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকার ফলে পাঞ্জাবের দিকে পুরােপুরি মনােনিবেশ করতে পারছিলেন না। তিনি পাঞ্জাব ত্যাগ করে গেলেই দুধর্ষ শিখরা তাঁর প্রতিনিধিকে হঠিয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর হতাে। আবদালীর পক্ষে শিখদের দমিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তিনি পেশোয়ার ও আটকের পশ্চিম অঞ্চলে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও লাহাের সহ মধ্য পাঞ্জাবে শিখদের অগ্রগতি রুখতে পারেন নি।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্রায় দীর্ঘ কুড়ি বছর যাবৎ বারংবার ভারত আক্রমণ করেও আবদালী ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন নি। কিন্তু বারবার ভারত আক্রমণ করে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেন। অন্যদিকে তাঁর আক্রমণের ফলে মারাঠাদের সামাজ্য স্থাপনের স্বপ্নও চিরতরে বিফল হয়ে গেল। অর্থাৎ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে যে রাজনৈতিক শুন্যতার সষ্টি হয়েছিল, তা মারাঠা বা আবদালী কারাে পক্ষেই ভরাট করা সম্ভব হলাে না। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যকে আরাে দুর্বল করে দিয়ে ও তার অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং পাঞ্জাব অঞ্চলে এক চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, আবদালী অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক জটিলতা ও আঞ্চলিক বিছিন্নতার ইন্ধন জুগিয়ে গেলেন। তাঁর আক্রমণের ফলেই শিখ জাতীয়তাবাদ শক্তি সঞ্চয় করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তােলার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত হয়।

অষ্টাদশ শতকের ভারতের ইতিহাস ব্যাপক অর্থে পথিবীর ইতিহাসের এক অথাৎ অণ্টাদশ শতকের ভারতবর্ষে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, চতুর্দিকের অরাজকতা ও বিশঙখলার ফলে যে রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল, তার সমাধান চিরাচরিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় সম্ভব ন্য হ’লেও বিদেশী বণিকদের কাছে তা অকস্মাৎ এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েমুঘল আমল থেকেই বহ, বিদেশী বণিক ভারতে এসেছিল ব্যবসা বাণিজ্য করতে। বাণিজ্য নিয়ে তাদের মধ্যে রেষারেষি থাকলেও ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন তাদের কাছে খন ছিল আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। অষ্টাদশ শতকের নৈরাজ্য তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের পথে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সষ্টি করে। দেশের এক এক জায়গায় এক এক রকম স্থানীয় শাসনের উদ্ভবের ফলে তাদের পক্ষে নির্বিঘ্নে ব্যবসা বাণিজ্য করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আবার এই নৈরাজ্য ও অরাজকতার সুযােগে কোন কোন ইউরােপীয় বণিক সংস্থা নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য আরও বিস্তার করতে তৎপর হয়। এক কথায় অষ্টাদশ শতকে এমনই এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যা বুদ্ধিমান, তৎপর ও সুযোগ সন্ধানী বণিকদের প্ররােচিত করেছিল নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে।

এই সময়ে ভারতে যে সমস্ত বাণিজ্যিক সংস্থা সক্রিয় ছিল, তাদের মধ্যে ব্রিটিশ ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী, ফরাসী ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ও ডাচ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ছিল প্রধান। এদের মধ্যে আবার ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ছিল সবচেয়ে তৎপর। তারা মুঘল সম্রাট ফারকশিয়ারকে হাত করে ১৭১৭ সালে যে ফরমান আদায় করে, তার ফলে তারা বাংলায় মাত্র ৩০০০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিনা শকে বাণিজ্য করার অধিকার পায়। এই ধরণের সুযােগ সুবিধা আদায়ের ব্যাপারে অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সংস্থাগুলি ইংরেজদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। যাই হােক ১৭১৭ সালের ফরমানের সাহায্যে ইংরেজ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্য হ, হ, করে বাড়তে থাকে। অন্যান্য ইউরােপীয় কোম্পানীগুলি ইংরেজদের তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে থাকলেও, তারাও কিন্ত, ব্যবসা করে যথেষ্ট লাভ করতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক ডামাডােলের মধ্যেও ইউরোপীয় বণিকদের ব্যবসার প্রসার লক্ষ্য করার বিষয়। ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু দেশীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার কথা নয় বা এর জন্য দেশে কোন রাজনৈতিক সংকটের সটিও হবার কথা নয়। অথচ অষ্টাদশ শতকের চতুর্থ দশকে এই ধরণের একটা আপাতঃ অসম্ভব ঘটনাই ঘটে গেল। 

The Importance of 18th Century in Indian History II ভারতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের গুরুত্ব

এই ঘটনার জন্য অবশ্য দেশের আভ্যন্তরীণ কোন সঙ্কট বা সমস্যা গােড়ায় দায়ী ছিল না। বরং সাগরপারের রাজনৈতিক সংকট ও জটিলতাই এই ধরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। ১৭৪০ সালে ইউরােপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের সূত্রপাত হয় এবং এই যুদ্ধে ইংরেজ ও ফরাসীরা পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। এই যুদ্ধ ১৭৪৮ সালে শেষ হলেও ১৭৫৬ সালে ইউরােপে আবার সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধেও ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স আবার মুখােমখি হয়। ১৭৬৩ সালে সন্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান হলে ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যেও শান্তি স্থাপিত হয়। ইউরােপের এই যুদ্ধের প্রভাবে ভারতেও ইংরেজ ও ফরাসীদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যাই হােক দাক্ষিণাত্যে কণটিকে যখন এইভাবে ইংরেজ ও ফরাসীরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত ছিল, তখন কর্ণাটকের নবাব উভয় পক্ষকে সংযত করতে গিয়ে নিজেই ফরাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এই যুদ্ধে মুষ্টিমেয় ফরাসী সৈন্যের হাতে নবাবের বিপলে বাহিনীর পরাজয় ভারতের ইতিহাসে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে আনে। এই পরাজয়ের ফলে দেশীয় শক্তির অন্তঃসারশূন্যতা ও ভারতীয় রাজনীতির দৈন্যদশা ইউরােপীয়দের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ঘটনা ইউরােপীয় বণিকদের উচ্চাকাঙখী করে তােলে। তারা বুঝতে পারে যে, নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই ভারতের রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা প্রয়োজন। ইউরােপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহত্তর রপ নিল রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে। এই প্রতিযোগিতা প্রধানতঃ সীমাবদ্ধ ছিল ইংরেজ ও ফরাসীদের মধ্যে, যদিও ওলন্দাজরাও, অন্ততঃ বাংলাদেশে কিছুটা সচেষ্ট হয়েছিল নিজেদের ক্ষমতা বিস্তারে।

ভারতীয় শাসকশ্রেণীর অবক্ষয় ও নৈতিক অধঃপতন তখন এমন একটা লজ্জাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা নিজেদের মধ্যে কলহ ও সংঘর্ষে বিদেশী শবির সাহায্য প্রার্থনা করতে এতটুকু ইতস্ততঃ বােধ করতো না। দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদের মত মহৎ আদর্শ তাদের কাছে আশা করা অষ্টাদশ শতকের পরিস্থিতিতে স্বপ্নবিলাস ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। যাই হােক এই ভাবে দেশীয় শাসকগােষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহে অংশ গ্রহণ করে এবং এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে সমর্থন করে বিদেশীরা তাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপন করতে থাকে। রাজনৈতিক ক্ষমতা দক্ষলের এই লড়াইয়ে ফরাসীরা ক্রমশঃ পিছু হঠতে থাকে। ইংরেজরা বাংলা ও কণটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৭৫৬ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের সূত্রপাত করে। ভারতীয় শাসকগােষ্ঠী যখন অন্তদ্বন্দ্ব ও কলহে লিপ্ত, তখন মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার কারা অর্জন করবে তার একটা ইঙ্গিত বহন করে আনলাে পলাশীর যুদ্ধ। এই দিক দিয়ে বিচার করলে পলাশীর যুদ্ধকে একটা যুগান্তকারী ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পলাশীর যুদ্ধের পরেই অবশ্য রাতারাতি ইংরেজরা ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা বা শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তবে এই যুদ্ধের ফলেই যে ইংরেজর ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চাবিকাঠিটি নিজেদের করায়ত্ত করেছিল, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। 

১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানীর দায়িত্ব গ্রহণ করে ইংরেজরা তাদের ক্ষমতা দখলের দৌড়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়, কারণ দেওয়ানীর অথ ছিল বাংলার শাসনে আইনসঙ্গত হস্তক্ষেপের অধিকার। অষ্টাদশ শতক ও ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তন ১৭০৭ সালের ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ১৭৬৫ সালের কোম্পানীর দেওয়ানী লাভের মধ্যেকার অধ্যাযের ইতিহাসের মল বিষয়বস্তু যদি হয় মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলির উদ্ভব এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সচনাপর্ব, তাহ’লে ১৭৬৫ সালের পর থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের মল বিষয়বস্তু হলাে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও ব্রিটিশ শাসন কাঠামাের উভব। এই পর্যায়ে মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল কেবলমাত্র কাগজে কলমে। মুঘল সাম্রাজ্যের পনেরভ্যুত্থান যে একটা অলীক কল্পনামাত্র, তা ১৭৬৫ মধ্যেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে মঘল সম্রাট পুরোপুরি মারাঠাদের কতৃত্বাধীনে চলে আসেন। তাঁর কোন স্বাধীন সত্ত্বাই ছিল না।

বস্তুতঃ অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে মারাঠারা এবং হায়দর আলি ও টিপ, সলতানের মহীশরই ছিল সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ভারতীয় রাষ্ট্র। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা শক্তি হীনবল হলেও নিশ্চিহ্ন হয় নি। মারাঠারা এই বিপর্যয় কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লােভ মারাঠাশক্তিকে কিছুটা দুর্বল করেছিল, তথাপি তারা মাহাদজী সিন্ধিয়া, নানা ফড়নবীশ, অহল্যাবাঈ প্রভৃতির নেতৃত্বে দুত শক্তি সঞ্চয় করে ভারতের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। অণ্টাদশ শতকে মারাঠাদের সঙ্গে ইংরেজদের চড়ান্ত শক্তিপরীক্ষা হয় নি। প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে ইঙ্গ-মারাঠা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন নিষ্পত্তি হয় নি। এই যুদ্ধের পরে মারাঠাদের সঙ্গে ইংরেজদের প্রায় ২০ বছর শান্তিপর্ণে সম্পর্ক ছিল।

অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল হায়দর ও টিপুর মহীশর। মহীশরের অভূত্থানকে ইংরেজ, মারাঠা বা নিজাম কেউই সনজরে দেখেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও হায়দর ও টিপ, অনলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যান ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের রথের রশি টেনে ধরতে। তাঁদের এই সংগ্রামে যদি মারাঠারা ও নিজাম কাঁধে কাঁধ মেলাতেন, তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি পালটে যেতাে। কিন্তু মারাঠারা মহীশরকে শত্রতার চোখে দেখতে এবং তাকে ধবংস করার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে যৌথভাবে আক্রমণ করতেও প্রস্তত ছিল। অন্যদিকে নিজাম ছিলেন চঞ্চল-মস্তিষ্ক ও তাঁর মিত্রতা ছিল অনিশ্চিত। মারাঠাদের ভয়ে মাঝে মাঝে তিনি মহীশরের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেও বিপদের দিনে অন্যের প্ররােচনায় মিত্র রাষ্ট্রকে পরিত্যাগ করতেও তিনি ইতস্ততঃ করতেন না। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হায়দর ও টিপ ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েও শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অগ্রগতি রুখতে পারেন নি।

অবশ্য ইংরেজরাও সহজে মহীশর দখল করতে পারে নি। হায়দর আলির সঙ্গে তাঁরা এটে উঠতে পারেন নি। টিপ, অবশ্য ইংরেজদের হাতে পরাজিত হন ও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করেন। মারাঠা ও মহীশর ছাড়া অন্যান্য প্রধান দেশীয় শক্তির মধ্যে নিজাম ও অযোধ্যা ছিল শক্তিহীন ও অপদাথ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা ও মানসিকতা কোনটাই তাদের ছিল না। তবুও ইংরেজরা তাদের সঙ্গে কোন সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয় নি বা তাদের রাজ্য সরাসরি দখল করে নেয় নি। বরং তাদের সঙ্গে ইংরেজরা মিত্রতার সম্পর্কই রাখতাে।

অযােধ্যা দখল করে তারা মারাঠাদের বিরাগভাজন হতে চায় নি। বাংলা ও মারাঠা সাম্রাজ্যের মাঝে তারা অযােধ্যাকে একটি মধ্যবতী রাজ্য রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের প্রশ্নে মারাঠা-মহীশর-ব্রিটিশ ত্রি-শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইংরেজরা নিজামকে চটাতে চায় নি। সুতরাং কুটনৈতিক প্রযােজনেই ইংরেজরা নিজাম ও অযোধ্যার সঙ্গে সম্ভব রাখার পক্ষপাতী ছিল। তবে জাত সাম্রাজ্যবাদী ওয়েলেসলী এই ধরণের মিত্ৰতানীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি নিজামকে অধীনতামূলক মিত্ৰতা সূত্রে আবদ্ধ করে কার্যতঃ তাঁকে ইংরেজদের অধীন করে তুললেন। অন্যদিকে তিনি অযােধ্যার নবাব সাদাৎ আলীর বিরদ্ধে কুশাসনের অভিযােগ এনে গােরক্ষপুর ও রােহিলাড সহ গঙ্গা-যমুনার দোয়াব দখল করে নেন। এর ফলে অযােধ্যাও পুরােপুরি শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া তাঞ্জোর, সুরাট ও কণটিকও তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। দেশীয় শক্তিগুলির মধ্যে একমাত্র শিখরাই এই সময় রঞ্জিত সিং এর নেতৃত্বে দুত শক্তি সঞ্চয় করছিল এবং অষ্টাদশ শতকে ইংরেজদের সঙ্গে তাদের কোন সংঘর্ষ ঘটেনি।

সুতরাং দেখা যাচেছ ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল, অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানতঃ ওয়ারেন হেষ্টিংস, কণওয়ালিস ও ওয়েলেসলীর তৎপরতায় তা যথেষ্ট পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। অবশ্য তখনও মারাঠা ও শিখ শক্তির সঙ্গে ইংরেজদের চড়ান্ত কোন বােঝাপড়া হয় নি এবং ভারতের বিরাট এলাকায় তখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তা সত্ত্বেও কিন্তু এটা পরিকার বোঝা গিয়েছিল যে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে ভারতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা গিয়েছিল, তা পণ করা ইংরেজ ছাড়া অন্য কোন শক্তির পক্ষেই সম্ভব নয়।

অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ গড়ে উঠেছিল, তখন রাজ্য জয়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসনের দায়িত্বও ইংরেজদের গ্রহণ করতে হয় । যেহেতু বাংলা দেশেই প্রথম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়, ব্রিটিশ শাসন কাঠামাের গোড়াপত্তন বাংলাদেশেই দেখা গেল। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ফলে যে নৈরাজ্যের সটি হয়েছিল, তাতে মুঘল শাসনের কার্যকারিতা অনেকাংশে ক্ষম হয়েছিল ও বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। একথা বিশেষভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রযােজ্য। এখানে মুর্শিদকুলি খাঁ ও আলীবদী খাঁ একটি সদঢ় শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা যখন বাংলার দেওয়ানীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন থেকেই বাংলায় ইংরেজদের আইনসঙ্গত শাসন শর হলো। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও ভারতীয় শাসন সম্পকে জ্ঞানের অভাবে ইংরেজদের পক্ষে প্রথমে এই গর দায়িত্ব দুর্বহ হয়ে ওঠে। ফলে একের পর এক নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে। অটাদশ শতক শেষ হবার আগেই বাংলায় ইংরেজরা তাদের নিজস্ব ভূমিব্যবস্থা ও বিচার বিভাগীয় শাসন গড়ে তােলে। পবতন মুসলিম শাসন ব্যবস্থার জায়গায় আধুনিক পশ্চিমী শাসনের আদর্শে নয় ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন ভারতের ইতিহাসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপর্ণ ঘটনা। এর ফলে ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ কায়েম হয়।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার যে কাঠামাে গড়ে উঠতে থা? এবং এখানে ইংরেজরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, পরবর্তীকালে তা তার। ভারতের অন্যত্র প্রয়ােগ করতে সচেষ্ট হয়। সাধারণভাবে অষ্টাদশ শতককে অবক্ষয় ও অরাজকতার যুগ হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও এবং কেবলমাত্র এই যুক্তিতেই কেউ কেউ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের একটা নৈতিক যথাথতি খুজে দেখার চেষ্টা করলেও, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির বহত্তর প্রেক্ষাপটের নিরিখে কিন্তু এই শতককে সপ্তদশ শতক থেকে সম্পূর্ণরূপে পথক করে দেখা অযৌক্তিক হবে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘনিয়ে এলেও, মুঘল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামাে মােটামুটি ভাবে সর্বত্র প্রচলিত ছিল। তাছাড়া মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ জুড়ে একটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবনমন বা অধঃপতন দেখা দিয়েছিল, এ কথা সবাংশে সত্য নয়। এ কথা অবশ্য ঠিক যে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সশস্ত্র সংঘাত দেশের কোন কোন অঞ্চলের অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। কিন্তু এর প্রভাব দেশের সর্বত্র সমানভাবে অনুভূত হয় নি। আগ্রার মত শহরও, যা নানা রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাতের সাক্ষী, ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত একটি বর্ধিষ্ণু অঞ্চল হিসাবে মর্যাদার অধিকারী ছিল। এই এলাকার শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের রমরমা অবশ্য কিছুটা পুবদিকে সরে গিয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল, তার জন্য কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন মুর্শিদকুলি খাঁ ও তাঁর উত্তরাধিকারীরা।

ইউরােপীয় বণিকদের কার্যকলাপ বাংলার অর্থনীতিকে এক শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। বাংলা ভারতের সবচেয়ে সমদ্ধশালী প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে। মারাঠাদের বারংবার আক্রমণ সত্ত্বেও পলাশীর যুদ্ধের আগে পর্যন্ত বাংলার অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। ১৭৪০-এর দশকে মারাঠা আক্রমণে কাশিমবাজারের রেশম শিল্প বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও, ১৭৫০-এর দশকেই তা আংশিকভাবে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। বাংলার সতীব শিপও নাFT বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। একই ভাবে বাংলার চিনি শিল্পেও কোন অবনতি দেখা যায় নি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও দেশের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ব্যাহত হয় নি। পশ্চিম ভারতে সরটি ও ব্রোচের বন্দর সব সময়েই কর্মব্যস্ত ছিল। অযােধ্যা, হায়দ্রাবাদ ও বেনারস এই সময়ে কৃষিতে যথেষ্ট অগ্রসর ছিল। এক কথায় বলা যেতে পারে সারা দেশ জুড়ে কোন অর্থনৈতিক বিপর্যয় এই শতকে দেখা দেয় নি।

আগেকার মত কৃষিই ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। বিগত শতকের যুদ্ধ বিগ্রহ ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় নি। ভূমিরাজত্ব থেকে প্রান্ত আয়ের পরিমাণও কমে নি। বরং অনেক জায়গায়, যেমন বাংলায়, আমরা বিপরীত চিত্রটিই দেখতে পাই। অষ্টাদশ শতকে ভারতের কুটির শিপও যথেষ্ট উন্নত ছিল। মুঘল অভিজাত সম্প্রদায়ের অবক্ষয় ও পতনের ফলে বিলাস দ্রব্যের চাহিদায় কোন বড় ধরণের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল বলে মনে করার কোন কারণ নেই। বরং বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক শক্তির অভূত্থানের ফলে নানা ধরণের বহ, মূল্য দ্রব্যসামগ্ৰীয় চাহিদা বেড়েছিল এবং এর ফলে কুটির শিলেপ উন্নতির লক্ষণ-ই দেখা গিয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অবশ্য আঞ্চলিক বৈষম্য ছিল। উত্তরপশ্চিম ভারত ও গজরাটে অবস্থার অবনতি ঘটেছিল। মারাঠাদের আক্রমণের ফলে ও পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেওয়ায়, ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৭৩০ সালের পর সরাটের পতন ঘটে। সুরাটের স্থান দখল করে কালিকট ও পলিকট। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শেষে এই দুটি বন্দরেরও পতন ঘটে। এই দুই বন্দরের বৈদেশিক বাণিজ্যে ভাগ বসায় কর্ণাটক ও মাদ্রাজ । বাংলায় অবশ্য ব্যবসা বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল।

১৭৬০-৭০ এর দশকেও বাংলার বহিবাণিজ্য যথেষ্ট তেজী ছিল। অষ্টাদশ শতকের গােড়ায় কোম্পানীর বহিবাণিজ্যের পরিমাণ ২ লক্ষ পাউণ্ড। ১৭৩০ থেকে ৫০-এর দশকে এর পরিমাণ ছিল ৪ লক্ষ পাউণ্ড। পলাশীর যুদ্ধের পর এর পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে। ৭০-এর দশকে এর অংক গিয়ে দাঁড়ায় ১০ লক্ষ পাউণ্ডে। ১৭৯০-এর দশকে বহিবাণিজ্যের বাৎসরিক গড় ছিল ২৫ লক্ষ পাউণ্ড। বাংলায় সমুদ্র পথে এশিয়া বাণিজোরও খুব রমরমা দেখা গিয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষে কলকাতা থেকে বছরে গড়ে ১৩০ থেকে ২০০টি বাণিজ্য পােত এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে চলাচল করতাে। বাংলার দেশীয় বণিক, দালাল ও শরাফরাও যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করতাে। কোম্পানীর রাজত্বের প্রথম দিকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা জমিদারীতে টাকা লগ্নী করার চেয়ে ব্যবসার দিকেই বেশী নজর দিতো। পরের দিকে অবশ্য জমিদারীতে টাকা লগ্নী সম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অষ্টাদশ শতকের অর্থনীতিকে আমরা পিছিয়ে পড়া বা গতিহীন এই ধরণের বিশেষণে চিহ্নিত করতে না পারলেও এই সময়ে ইউরােপীয় অর্থনীতিতে আমরা যে বৈপ্লবিক গতিময়তা প্রত্যক্ষ করি, ভারতের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণরপে অনুপস্থিত ছিল। কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই কারিগরী ও প্রযুক্তিবিদ্যায় বহ, শতাব্দী ধরে কোন উন্নতি ঘটে নি। পশ্চিমী দুনিয়ায় যেমন কৃষি ও শিল্প বিপ্লব অর্থনীতিতে একটা নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তা হয় নি।

অষ্টাদশ শতকের সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আমরা সেই একই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করি। এই শতকের সমাজ ও সংস্কৃতিতে রক্ষণশীলতা ও অবক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য পরিবর্তনের আভাসও পাওয়া যায়। মধ্য যুগের মত অষ্টাদশ শতকেও ভারতীয় গ্রামসমাজ রিয়াশতী, অর্থাৎ সুবিধাবাদী ও রাওয়তী বা অন্যান্যরা এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। প্রথমােক্ত শ্রেণীতে পড়ে সমাজের উচ্চ সম্প্রদায়ভুক্ত ভূম্যধিকারী ও গ্রামীণ শাসকশ্রেণী। অষ্টাদশ শতকে এই শ্রেণীর গুরত্ব যথেষ্ট বুদ্ধি পায়।

বস্তুতঃ অষ্টাদশ শতকের পরিস্থিতিতে এই শ্রেণীর সামাজিক গতিময়তা (social mobility) আগের থেকে অনেক বেশী পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে রামমােহন রায় ও অন্যান্য নেতার আবির্ভাব ঘটে এই শ্রেণী থেকেই। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সামগ্রিক চিত্রটি ছিল নৈরাশ্যজনক! মধ্যযুগে সংস্কৃতির বিকাশ অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল শাসকশ্রেণীর পঠপােষকতার উপর। কিন্তু দিল্লীর শাসকশ্রেণী আত্মকলহ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে মুঘল শিল্পকলা ও স্থাপত্য ভাস্কর্যের অবনতি ঘটে। তবে হায়দ্রাবাদ, লক্ষৌ, পাটনা প্রভৃতি শহরগুলিতে শিল্পীরা ভীড় জমাতে থাকলে এই সব শহরে শিল্পকলার চর্চা বেড়ে যায়। অষ্টাদশ শতকে ভারতীয় শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল দিক ছিল বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অনগ্রসরতা। এই ব্যাপারে ভারত ইউরোপের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। এর ফলে ভারতীয়দের পক্ষে ইউরােপীয়দের সঙ্গে এটে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করতে হবে যে, ভারতীয় শাসক সম্প্রদায় ক্রমশঃ পশ্চিমী বিজ্ঞানী ও কারিগরি শিক্ষার যৌক্তিকতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। এই প্রসঙ্গে হায়দার আলি ও টিপ, সুলতানের কথা সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। তাছাড়া মাহাদজী সিন্ধিয়া ও বাংলার নবাব মীর কাসিমও এ ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে ভারতীয় শাসক সম্প্রদায় সামরিক ক্ষেত্রে যতটা পশ্চিমী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন, অন্য বিষয়ে তা ছিলেন না।

অষ্টাদশ শতকের ইতিহাস যে অত্যন্ত জটিল ও নানা সমস্যা কণ্টকিত এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা অষ্টাদশ শতককে যতটা অবক্ষয়, নৈরাজ্য ও অরাজকতার যুগ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, তার মধ্যে অতিশয়ােক্তি আছে। আধুনিক গবেষণালব্ধ মত এই যে, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এমন কি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে অষ্টাদশ শতককে সপ্তদশ শতকের অনুসারী বা পরিপুরক বলা উচিত। অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের মূল কাঠামো এই শতকেও মােটামুটি অপরিবতিত ছিল। তা ছাড়া রাজনৈতিক অনৈক্য ও অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও অষ্টাদশ শতকে কতকগুলি নতুন প্রবণতা ও পরিবর্তনও চোখে পড়ে। বস্তুতঃ এই শতক ইঙ্গিত বহন করে এনে ছিল এমন কিছু নতুন ধারা ও পরিবর্তনের, যা কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল সপ্তদশ শতকে।

এ যুগ অস্থির হলেও এবং কিছুটা যেন আপন খেয়ালে নিজের পথ ধরে চললেও এটা বােঝা যাচ্ছিল যে, পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে চলেছে এবং নতুন যে কাঠামাে গড়ে উঠতে চলেছে, তা ভারত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। পলাশী বা বক্সারের যুদ্ধ হয়ত রাতারাতি বাংলা তথা ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে বদলে দিতে পারে নি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের গোড়া পত্তন করে ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল এই দুটি যুদ্ধ। ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার পরিপূর্ণ বিকাশ হয়ত অষ্টাদশ শতকের অনিশ্চিত পরিবেশে কল্পনার অতীত ছিল। কিন্তু বাংলা অধিকার করার পর ইংরেজরা যে সােনার খনির সন্ধান পেয়েছিল, তাতে তাদের পক্ষে আরও উচ্চাকাঙখী হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। যাই হােক ইংরেজদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের অর্থ ছিল সমগ্র ভারত জুড়ে একই ধরণের ব্যবস্থা গড়ে ওঠা। অথাৎ অষ্টাদশ শতকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে আঞ্চলিক ধাঁচে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল—যার মধ্যে একটা অসম ও স্থানীয় চরিত্র উন্মোচিত হয়েছিল—তার অবসান অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সব সম্ভাবনা সন্তু হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর পরিণতির বীজ লুকিয়েছিল এই শতকের ইতিহাসের গুরত্ব এখানেই।

Leave a Comment