অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সংস্থা ও মুর্শিদকুলি খাঁ:

অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সংস্থা ও মুর্শিদকুলি খাঁ:

অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সংস্থা ও মুর্শিদকুলি খাঁ: ইংরেজ ছাড়ো সময় ওলন্দাজ, ফরাসী, দিনেমার ও অসটেণ্ড (জামান) বণিকেরা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য করতাে। অষ্টাদশ শতকে পতুগীজ বণিকদের কোন গুরত্ব ছিল না। তাঁর এই সময়ে মঘল সরকার বা অন্যান্য ইউরােপীয় বণিকদের অধীনে চাকরি করে জীবন যাপন করতাে। অষ্টাদশ শতকে ওলন্দাজ বণিকেরা ইংরেজদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৬২৭ সাল থেকেই তারা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে লিপ্ত থাকলেও ১৬৫৩ সালে চুচুড়ায় কুঠি নির্মাণ করার পর থেকে ওলন্দাজ বণিকদের ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। চুচুড়া ছাড়া সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজদের প্রধান ঘাঁটি ছিল কাশিমবাজার, ঢাকা, পাটনা, মালদা এবং বালেশ্বরে। ১৭০০ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন, তখন ওলন্দাজ বণিকদের ব্যবসায় যথেষ্ট রমরমা ছিল। তবে ইংরেজরা যেমন ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশে বিনা শকে বাণিজ্য করতে পারতো, ওলন্দাজদের সেই সুযােগ ছিল না। তারা সমস্ত জিনিসের উপর ২% হারে শক দিত। ইংরেজদের মত তারাও কিছ; সুযােগ সুবিধা আদায়ের জন্য তৎপর ছিল। সম্রাট জাহান্দার শাহের আমলে তারা একটা ফরমান লাভ করে। এই ফরমানের শর্ত অনুসারে স্থির হয়

(১) তারা কেবলমাত্র হগলী বন্দরে ২% হারে শক প্রদান করবে।

(২) কোন কর্মচারী পালিয়ে গেলে সরকারী সহায়তার তাকে ধরার ব্যবস্থা করা হবে।

(৩) সরকারী টাঁকশালে তারা তাদের মদ্রা তৈরী করতে পারবে। জাহান্দার শাহের এই ফরমান পরে সম্রাট ফারুকশিয়ারও মেনে নেন। মুর্শিদকুলি খাঁ ফরমানের এই সব শর্ত মেনে নিলেও বিনা পয়সায় সরকারী টাঁকশালের ব্যবহার করার অনুমতি দেন নি।

সপ্তদশ শতকের শেষভাগে ফরাসী ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলায় তাদের ব্যবসা বাণিজ্য শরে, করে। ১৬৭৩ সালে তারা চন্দননগর অধিকার করে। সপ্তদশ শতকে কাশিমবাজার, ঢাকা, বালেশ্বর ও পাটনাতেও তাদের বাণিজ্য কুঠি ছিল। ১৬১২-১৩ সালে তারা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য করার অধিকার অর্জন করে। কিন্তু ফরাসী কর্তৃপক্ষের অবহেলায় তাদের ব্যবসা বাণিজ্য খুব একটা প্রসার লাভ করতে পারে নি। ইংরেজ বা ওলন্দাজদের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে ছিল। ১৭১৮ সালের কয়েক বছর আগে থেকে কোন ফরাসী জাহাজ বাংলায় পাঠানাে হতাে না। ১৭১৮ সাল থেকে অবশ্য অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। ঐ বছর তারা সম্রাট ফারকেশিয়ারের কাছ থেকে একটা ফরমান আদায় করতে সক্ষম হয়। ঐ ফরমানের শর্ত অনুযায়ী তাঁরা ২২% হারে শক দিতে স্বীকৃত হয়। ফরাসীদের মত সিনেমার বণিকরাও সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য করতে থাকে। তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল হুগলী ও বালেশ্বরে।

অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের খুব একটা প্রসার ঘটেছিল বলে মনে হয় না। ১৭১৪ সালে তাদের সঙ্গে স্থানীয় কিছ, কর্মচারীর বিরােধ বাঁধায় তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। মুর্শিদকুলি খাঁ তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য ইংরেজদের মধ্যস্থতা করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতেও কোন ফল হয় না। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে তারা আর বাংলাদেশে ফিরে আসে নি। মর্শিদকুলি খাঁ যে তাদের বাংলায় ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই ঘটনা প্রমাণ করে তিনি ইউরােপীয় বণিকদের ব্যবসার প্রসারে কতখানি আগ্রহী ও উৎসক ছিলেন।

অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক সংস্থা ও মুর্শিদকুলি খাঁ:

অসটেণ্ড কোম্পানীর প্রথম জাহাজ নােঙর ফেলে বালেশ্বর শহরে ১৭১৯ সালে অর্থাৎ অন্যান্য ইউরােপীয় বণিকদের অনেক পরে। এই কোম্পানীর মালিক ছিল জার্মানরা। তাদের জাহাজ কিন্তু ভিড়েছিল ফরাসী নিশান উড়িয়ে। যাই হোক তাদের আগমন অন্যান্য ইউরােপীয় বণিকেরা মােটের সুনজরে দেখে নি। ওলন্দাজ ও ইংরেজ বণিকেরা হগলীর ফৌজদারকে ঘুষ খাইয়ে অসটেড কোম্পানীর বিরোধিতা শুরু করে। তারা মুর্শিদকুলি খাঁকেও নানা ভাবে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে। নবাব কিন্তু তাদের কথায় কর্ণপাত করেন নি। তিনি অসটেড কোম্পানীকে বাংলার ব্যবসা ব্রার অনুমতি দেন। ১৭২৫ সাল থেকে তারা বাংলায় কেনাকাটা শুরু করে। ইংরেজ ও ওলন্দাজেরা নানা ভাবে নবাবের মন অসটেণ্ডদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নবাব তাদের জন্য সম্রাটের কাছ থেকে একটা ফরমান জোগাড় রে দিতে সম্মত হন। কিন্তু তা করার আগেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন।

ইংরেজ ও অন্যান্য বিদেশী বণিকদের ব্যবসা বাণিজ্যের ফলে দেশের আর্থিক উন্নতি ও শ্রীবদ্ধি ঘটে। বাংলাদেশ থেকে মােট রপ্তানীর পরিমাণ ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। এর পূর্ণ কৃতিত্ব মশিদকলি খাঁর। বাংলাদেশ থেকে যে সব জিনিস বিদেশে রপ্তানী হতাে তার মধ্যে রেশম, কাঁচা সিক ও সতীর বই ছিল প্রধান। তাছাড়া শশারা (Saltpetre ), লাক্ষা, গোলমরিচ, হলুদ প্রভৃতিও রপ্তানী হতে। বাংলায় ইউরােপীয় দ্রব্যসামগ্রীর কোন চাহিদা ছিল না। ফলে বিদেশীরা বিভিন্ন ধাত্ব দ্রব্য ও পশম আমদানী করতাে। বলা বাহুল্য বাণিজ্যিক ভারসাম্য (balance of trade) ছিল বাংলার পক্ষে। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে শুধু যে ইংরেজদের বাণিজ্যিক বদ্ধি ঘটেছিল তাই নয়, ওলন্দাজদের ব্যবসাও এই সময় যথেষ্ট প্রসার (ভ করেছিল। অন্যান্য বিদেশী বণিকরা অবশ্য অনেক পিছিয়ে ছিল।

১৭১৭ সালের ফরমানকে দায়ী করেছেন। আবদুল করিমের মতে ইংরেজরা এই ফরমানের পুরাে সুযােগ গ্রহণ করতে পারে নি। সুতরাং তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হয়েছিল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য। দেশে শান্তি ও শঙ্খলা বজায় থাকার জন্যই অবশ্য এই উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। আসলে ইংরেজদের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৭১৭ সালের পর থেকেই বাড়ে নি ; তার আগে থেকেই বাড়ছিল। ১৭০৪-৫ সালে ইংরেজদের রপ্তানীর পরিমাণ ছিল ৫১২,৪৫০ টাকা। ১৭১৭-১৮ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১,৫৬৯,২০৫ টাকায়। ১৭২৬-২৭ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৩So,৪৮১ টাকায়। সুতরাং তিনি ডঃ ভট্টাচার্যের অভিমত গ্রহণযােগ্য বলে মনে করেন না। তাছাড়া ওলন্দাজদের রপ্তানীর পরিমাণও এই সময় অনেক বাড়ে, যদিও তারা ইংরেজদের মত কোন বিশেষ সুবিধা ভােগ করতাে না। এটা সম্ভব হয়েছিল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যই।

মুর্শিদকুলি খাঁ ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment