ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক :

ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক :

ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক : মশিদকুলি খাঁর মত আলীবদীও ইউরােপীয় বণিকদের ব্যবসার প্রসারে উৎসাহ দিতেন, কারণ তিনি জানতেন যে ইউরােপীয় বণিকদের শ্রীবৃদ্ধির উপর বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। জাঁ ল নামে জনৈক ফরাসী কর্মচারী মন্তব্য করেছেন যে, আলীবদী সরকারের স্বার্থেই বিদেশী বণিকদের পছন্দ করতেন এবং তারা তাঁর কাছে কোন অভিযােগ করলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার প্রতিকার ও সুবিচার করতেন। স্ক্রাফটন নামে একজন ইংরেজ বিশেী বণিকদের প্রতি আলীবদীর মনােভাব প্রসঙ্গে লিখেছেন যে, তিনি নাকি ইউরােপীয় বণিকদের মৌচাকের সঙ্গে তুলনা করতেন। অর্থাৎ যথাযথভাবে পালন করলে মৌচাকের মধু পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনভাবে যদি মৌমাছিদের উপদ্রব করা হয়, তাহলে তারা হল ফুটিয়ে দেবে। এই কথাটির মধ্যে ইউরােপীয় বণিকদের প্রতি আলীবদীর নীতি ও দণ্টিভঙ্গী সন্দরভাবে উন্মােচিত হয়েছে। হলওয়েল অভিযােগ করেছেন আলীবদী নাকি মত্যুশয্যায় সিরাজকে ইংরেজদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করার উপদেশ দিয়ে যান। তাঁর এই অভিযােগ ভিত্তিহীন কারণ মধুর লোভেই তিনি চাইতেন ইউরােপীয় বণিকেরা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য করকে।

ক্লাইভ, ম্যাথ, কোলেট, রিচার্ড বেচার, ওয়াটস, প্রভৃতি সমসাময়িক ইংরেজ হলওয়েলের বক্তব্য বিশ্বাসযােগ্য বলে মনে করেন না। আসলে বিদেশী বণিকদের বিতাড়িত করার কোন পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। আফগান নেতা মুস্তাফার প্ররােচনায় কেউ কেউ তাঁকে নাকি বিদেশী বণিকদের উৎখাত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি এই প্রস্তাবের বিরােধিতা করে বলেছিলেন যে, ইংরেজরা কোন অপরাধ করেনি। স্বার্থান্বেষী মুস্তাফা নিজের লাভের জন্য এই প্ররােচনা দিয়েছিলেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। কেউ তাঁকে লােভ দেখিয়েছিলেন যে ইংরেজদের হঠালে তাঁর হাতে প্রচুর টাকা আসবে। এসব প্রস্তাবে তিনি কান দেন নি। অন্য একটি সুত্রে জানা যায় আলীবদী নাকি সিরাজকে ইংরেজদের সঙ্গে কলহ করতে নিষেধ করে যান। সমসাময়িক জনৈক ফরাসী লেখকের মতে আলীবদী বিদেশীদের প্রতি যথেষ্ট অনুরক্ত ছিলেন। বিদেশীদের সব সময় ভয় হতাে তিনি মারা গেলে তাদের দুদিন শুর হবে। বিদেশী বণিকদের যে তিনি পছন্দ করতেন তার একটি প্রমাণ তিনি ১৭৫৫ সালে দিনেমার বণিকদের শ্রীরামপুরে কুঠি নিমার্ণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। মারাঠা আক্রমণের সময়ে বা অবস্থার চাপে পড়ে তিনি বিদেশীদের কাছে টাকার জন্য চাপ দিতেন একথা ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি বিদেশীদের সুনজরে দেখতেন না, বা তাদের বিতাড়িত করার জন্য তৎপর ছিলেন।

ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক :

বিদেশী বণিকদের পছন্দ করলেও আলীবদী কিন্তু নিজের সাবভৌম ক্ষমতা সম্পকে সব সময়েই সচেতন ছিলেন। জাঁ ল তাঁর এই ব্যক্তিত্ব ও দঢ়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর কাছে কেউ ফরমান বা কোন বিশেষ সুযােগ সুবিধার কথা বললে তিনি রেগে যেতেন। বিদেশী বণিকদের সব সময়ই তিনি নিজ নিয়ন্ত্রণাধীনে রাখতেন। বিদেশী বণিকেরা যাতে কোন অজুহাতে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করতে না পারে, সেদিকে তাঁর কড়া নজর ছিল। এই কঠোরতার জন্যই অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের ছায়া কর্ণাটকে পড়লেও বাংলায় তা পড়েনি। তিনি ইংরেজ ও ফরাসী উভয়কেই দগ নির্মাণ করতে নিষেধ করে বলেছিলেন-“তোমরা বাণিজ্য করতে এসেছ। তােমাদে দগের কি প্রয়ােজন ? তােমরা আমার রাজ্যে আছ। তােমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে যেমন তিনি সচেতন ছিলেন, তেমনি তাঁর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও আলীবর্দী ওয়াকিবহাল ছিলেন। একজন আমীর যখন তাঁকে ইংরেজ বিতাড়নের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তখন তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন—“স্থলে আগুন লাগলে তা নিবানাে যায়, কিন্তু জলে আগুন লাগলে তা নিবানাে কি সম্ভব ?” অর্থাৎ তিনি এ কথা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইংরেজদের নৌশক্তি প্রতিহত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

বিদেশীদের চটানাের পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। তাঁর নীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ডঃ কালিকিঙ্কর দত্ত 1671650 -“Alivardi’s behaviour towards the Europeans was indeed strict, but it was not unnecessarily harsh.” fofa facant porpcus afo কঠোর ছিলেন, কিন্তু অহেতুক অভদ্র আচরণ তাদের সঙ্গে করতেন না। তাঁর এই নীতি অবশ্যই উচ্চ প্রশংসা দাবী করে। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে তিনি বিদেশীদের কড়া নজরে রাখতেন। কিন্তু তাঁর মাত্রাজ্ঞান ছিল অসাধারণ। এখানেই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি। মারাঠা আক্রমণের সময়ে আমরা আলীবদীর কঠোরতার পরিচয় পাই। মারাঠা আক্রমণের মােকাবিলায় তাঁর প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন হয় এবং রাষ্ট্রের প্রয়ােজনেই তিনি বিদেশী বণিকদের কাছে অর্থ সাহায্য চান। তিনি ইংরেজদের কাছে ৩০ লক্ষ টাকা দাবী করেন। ইংরেজরা টাকা দেবার ব্যাপারে গড়িমসি করলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে রেহাই পায়। ১৭৪৮ সালে ইংরেজরা কয়েকটি আমেনীয় জাহাজ দখল করলে তারা নবাবের সাহায্য প্রার্থনা করে। আলীবদী খাঁ ইংরেজদের নির্দেশ দেন আর্মেনীয় জাহাজ ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ইংরেজরা তাঁর কথা অমান্য করায় তাদের বিরুদ্ধে তিনি দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজদের সুস্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেয় যে, আর্মেনীয় বণিকদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে তিনিও ইংরেজদের উপর সন্তুষ্ট হবেন না। ইংরেজরা আর্মেনীয় বণিকদের সন্তুষ্ট করতে বাধ্য হয়। নবাবও তাঁর কথা রাখেন। নবাবকে পুরােপুরি সন্তুষ্ট করতে ইংরেজরা অবশ্য কিছু টাকাও ধার দিয়েছিল। এই দুটি ঘটনা প্রমাণিত করে নবাব কিভাবে কোন হঠকারিতা না করে বিদেশী বণিকদের প্রতি তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন।

মারাঠা আক্রমণের সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন:

Leave a Comment