কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭১৯-৫৪) ও ডুপ্লের ব্যর্থতা :

কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭১৯-৫৪) ও ডুপ্লের ব্যর্থতা :

কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭১৯-৫৪) ও ডুপ্লের ব্যর্থতা : ১৭S8 সালে এই-লা-স্যাপেল চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর প্রায় ৮ বছর (১৭৪৮-৫৬) ইউরোপে শান্তি বিরাজিত ছিল। অবশ্য যে সব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ইউরােপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ হয়েছিল, তার কোনটারই একটা সন্তোষজনক মীমাংসা হয় নি। সুতরাং ৮ বছরের এই শান্তি ছিল বাইরের রপ মাত্র। ভিতরে ভিতরে আরও একটি বহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল সমস্যাগুলির চড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য। ফলে ১৭৫৬ সালে ইউরােপে আবার যুদ্ধ বাঁধে ও অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের মত এই যুদ্ধেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সাত বছর এই যুদ্ধ চলেছিল বলে এই যুদ্ধকে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়। ১৭৬৩ সালে প্যারিসের চকিতে ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধের অবসান হয়।

অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি ইউরােপীয় যুদ্ধের অশুভ ছায়া ভাররে উপর পড়েছিল। ১৭৫৬ সালে যখন সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, তখনও ভারতে সেই যুদ্ধের প্রভাবে ইঙ্গ-ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু ১৭৪৮ থেকে ১৭৫৬ পর্যন্ত ইউরােপে শান্তি বিরাজ করলেও ভারতের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গিয়েছিল। ভারতে কণটিকে এই সময়ে ইংরেজ এবং ফরাসীদের মধ্যে এক তীব্র সংঘর্ষ ও বিরােধ দানা পাকিয়ে ওঠে। দাক্ষিণাত্যে রাজনৈতিক । প্রাধান্য স্থাপনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মূলতঃ দায়ী ছিল ফরাসী গভর্ণর ডপ্লের উচ্চাকাঙ্খা, সযােগ্য নেতৃত্ব ও দরদষ্টি।

দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা অবশ্য তাঁর উচ্চাকাঙখা চরিতার্থ করার সুযােগ এনে দিয়েছিল। তাঁর এই মন্তব্য যথার্থ। কিন্তু পরিস্থিতি যে সবটাই ডপ্লের অনুকুল ছিল, এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই । ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রধান চাবিকাঠি ছিল একটি শক্তিশালী নৌ-বহর, যা ফরাসীদের ছিল না, কিন্তু ইংরেজদের ছিল। তা ছাড়া বদনের সঙ্গে মতবিরােধের ফলে ফরাসী নৌ-বহরের শক্তি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। অন্যদিকে ফরাসীদের যা কিছু, শক্তি, তা প্রধানত সীমাবদ্ধ ছিল করমণ্ডল উপকূলে। কিন্তু ইংরেজদের প্রধান ঘাঁটি ছিল বাংলা ও বােশ্বই-এ তাছাড়া ডপ্লে জানতেন ফরাসী সরকার তাঁকে উপযুক্ত সমর্থন জানাবেন কিনা সন্দেহ। সুতরাং ঘরে বাইরে কোন দিক থেকেই সাহায্য পাবার আশা ছিল না। কিন্তু এই সব প্রতিকুলতা সত্ত্বেও ডপ্লে দমে যান নি। বরং প্রতিকুলতা তাঁকে দিয়েছিল এক ধরণের দঢ়তা, সংগ্রামী মনােভাব ও লক্ষ্যে অবিচলতা। আসলে ডপ্লে ব্যবসা যতটা বুঝতেন, তার চেয়েও বেশী বুঝতেন কূটনীতি ও চক্রান্ত। তিনি জানতেন ব্যবসায় ইংরেজদের সঙ্গে এটে ওঠা কঠিন। সুতরাং তিনি চেয়েছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতাপ্রত্যক্ষভাবে না হলেও অন্ততঃ পরােক্ষভাবে এবং এও তিনি জানতেন যে, শান্তিপণ পথে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা যায় না। সেই কারণেই তিনি এই-লা-স্যাপেলের চুক্তির পরও শান্তি বজায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন না।

ডপ্লের সব চেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক দরদষ্টি। হাওয়া কোনদিকে বইছে বা বইতে পারে তা তিনি হওয়া বইবার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারতেন, যা অনেকেই পারতেন না। ভবিষ্যৎ কি তা তিনি বর্তমানের মাটিতে দাঁড়িয়েই বুঝতে পারতেন। তাঁর এই ধরণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল বলেই তিনি দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর আর একটি গুণ ছিল তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন খুব তাড়াতাড়ি। সেই সঙ্গে তাঁর ধৈৰ্য্যও ছিল অসাধারণ তাঁর সচিব আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন যে, পরিকল্পনাগুলি দ্রুত কার্যকরী করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ডপ্লের । তবে তাঁর চরিত্রের যে দিকটি খুবই নিন্দনীয় ছিল, তা হলাে তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরশীলতা। তিনি যে নীতি অনুসরণ করেছেন, অন্যেও যে সেই একই নীতি অনুসরণ করতে পারে, তা তিনি বুঝতেন না। তাঁর একগয়ে ও স্বেচ্ছাচারী মনােবত্তি তাঁকে জনপ্রিয় করতে পারেনি তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে। ফলে সহকর্মীদের অকুণ্ঠ সাহায্য ও সহানুভূতি তিনি লাভ করতে পারেন নি। অথচ সহকর্মীদের সহায়তা ভিন্ন সাফল্য আশা করা যায় না।

দাক্ষিণাত্যের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ডুপ্লে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতের রাজনীতিতে উচ্চাকাংখা ও যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা লাভ করাই হলো রাজনীতিবিদদের একমাত্র লক্ষ্য। বৈধ অধিকার বা দেশপ্রেমের কোন মূল্যই এখানে নেই এবং ক্ষমতা দখল করার জন্য যে কোন হীন চক্রান্তে লিপ্ত হতেও কারও কোন দ্বিধা বা সকোচ নেই। এমন কি এর জন্য কোন বিদেশী শক্তির সাহায্য গ্রহণ করতেও এরা কুণ্ঠিত নন। ভারতীয় রাজনীতির এই দেউলিয়া ও ছন্নছাড়া অবস্থা উপ্লেকে প্রলব্ধ করেছিল । তাঁর নীতি ছিল ভারতীয় শাসকগােষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের এই লড়াইয়ে যে কোন একটি পক্ষকে অন্যের বিরুদ্ধে সমর্থন করে ফরাসী প্রাধান্য বিস্তার করা ও ইংরেজদের ভারত থেকে বহিষ্কারের পথ পরিষ্কার করা। সেন্ট টোনের যুদ্ধে নঠিনেয় ফরাসী সৈন্যের হাতে নবাবের বিপলে সেনাবাহিনীর পরাজয় এই নীতির সাফল্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর চোখ খুলে দিয়েছিল। ডপ্লের এই নীতি যে পুরোপুরি অভিৰ তা কিন্তু নয়। তাঁর আগে ইংরেজরাও কোলন নদীমখে একটি বন্দর ছেড়ে দেবার শতে তাঞ্জোরের সিংহাসনে একজন দাবীদারকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নীতি আরও ব্যাপক ও দুঃসাহসিকতার সঙ্গে

প্রয়োগ করার পণ কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন ডপ্লে। আগেই বলেছি ডপ্লের কাছে সুযােগ এসেছিল অযাচিতভাবে। ১৭৪৮ সালে বদ্ধ বয়সে নিজামের মত্যু হয়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র নাসির জঙ্গ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু তাঁর পৌত্র মজফফর জঙ্গ নিজাম পদ দাবী করেন। ফলে হায়দ্রাবাদে এক গহযদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। অন্যদিকে কণটিকে আনওয়ারউদ্দীন তাঁর সিংহাসন সম্পকে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। এখানে দোস্ত আলির জামাতা চাঁদ সাহেবও মারাঠাদের হাত থেকে ছাড়া পাবার পর কণটিকের সিংহাসন দখল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এই অবস্থায় ডপ্লে মুজফফর জস ও চাঁদ সাহেবকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। এই সঙ্গে শুর হলাে ডপ্লের দাক্ষিণাত্যে প্রাধান্য বিস্তারের রাজনৈতিক খেলা।

কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭১৯-৫৪) ও ডুপ্লের ব্যর্থতা :

১৭৪৯ সালে ভেলােরের কাছে অশ্বরের যুদ্ধে আনওয়ারউদ্দীন পরাজিত ও নিহত হলেন ও তাঁর পুত্র মহম্মদ আলি ত্রিচিনপল্লীতে পালিয়ে গেলেন। এবার ইংরেজদের টনক পুদুলো। তারা নাসির জলকে সাহায্য করতে মনস্থ করলাে ও মহম্মদ আলিকে । এচনাপল্লীতে সাহায্য পাঠালো। কিন্তু ডপ্লের মত প্রেরণা, তৎপরতা ও মানসিক শক্তি ইংরেজদের ছিল না। ফলে তারা কোন কিছু করে ওঠার আগেই নাসির জঙ্গ নিহত হন ( ডিসেম্বর ১৭৫০) এবং মজফফর জঙ্গকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার বলে ঘােষণা করা হয়। কৃতজ্ঞ মুজফফর ডপ্লেকে কৃষ্ণানদীর দক্ষিণে অবস্থিত সমগ্র ভূখণ্ডের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য বসীর নেতৃত্বে এক ফরাসী সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদে পাঠানাে হয়। কিছু পরে অবশ্য মুজফ ফরের মত্যু হয় আততায়ীর হাতে। কিন্তু তৎপর বসী সলাবৎ জঙ্গকে নিজাম পদে অভিষিক্ত করে হায়দ্রাবাদে ফরাসী প্রাধান্য বজায় রাখেন। মাত্র দু বছরের মধ্যে ডপ্লে যেভাবে একের পর এক সাফল্য অর্জন করলেন, তাতে সকলেই চমকে যান।

কটিক ও হ্যায়:বাদ উভয় অঞ্চলেই ডপ্লের মনোনীত প্রার্থীরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় ডপ্লের খ্যাতি ও মর্যাদা চরম শিখরে আরোহণ করে। কিন্তু এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। ইংরেজরা যখন তাঁকে আটকাবার জন্য সব শক্তি প্রয়ােগ করলো, তখন থেকেই ডপ্লের ভাগ্য বিপর্যয় শুরু হলাে। তাছাড়া উপ্লে এই সময় একটা রাজনৈতিক চালে ভুল করেন। তাঁর উচিত ছিল মহম্মদ আলির সঙ্গে একটা দুত বােঝাপড়ায় আসা। তাঁর এই ভুলের পণ সুযােগ গ্রহণ করে ইংরেজরা। ফরাসী বাহিনী ত্রিচিনপল্লী দখল না করে অহেতুক তাঞ্জোর অধিকার করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় সময় ব্যয় করতে থাকে । এই সুযােগে ইংরেজরা দ্বিধা

পণ শক্তি নিয়ে মহম্মদ আলির পাশে এসে দাঁড়ায়। চতুর ক্লাইভ ফরাসী শক্তি বিভক্ত করার জন্য কণটিকের রাজধানী আকট অবরােধ করেন। ইতিমধ্যে ইংরেজরা মহীশর, তাঞ্জোর ও মারাঠা নেতা মরারী র্যওকে নিজেদের দলে টানলেন। আকট অবরােধের সাফল্য ইংরেজদের খ্যাতি ও মযদি বদ্ধি করলো। কিন্তু ত্রিচিনাপল্লীর ভারাপ্ত ফরাসী সেনানায়ক ল ( us.w ) এর ফলে ভীত হয়ে শ্রীরঙ্গমের দগে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। শেষ পর্যন্ত ল আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন ও চাঁদ সাহেবও নিহত হন। এই ভাবে ডপ্লের স্বপ্ন সম্পূর্ণভাবে ব্যথ হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু এই চরম বিপর্যয়ের মুখেও ডপ্লের মনোবল অটুট ছিল। তিনি ভেঙ্গে পড়ার পাত্র ছিলেন না। বরং সঙ্কটের সময়েই তাঁর দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি আবার ত্রিচিনাপল্লী আক্রমণ করলেন। মারাঠা নায়ক মুরারী রাও ও মহীশরের রাজাকে তিনি ইংরেজদের থেকে ভাঙ্গিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আনলেন। তাঞ্জোরের

রাজাও নিরপেক্ষ থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ১৭৫৩ সালে সারা বছর ধরেই উভয় পক্ষে ছােট খাটো সংঘর্ষ লেগে ছিল। কিন্তু কোন পক্ষের চড়ান্ত ভাবে জয় পরাজয়ের মীমাংসা হলাে না। ডপ্লে শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়েন নি। কিন্তু ফরাসী কতৃপক্ষ ডপ্লের উপর আস্থা রাখতে পারলেন না। ডপ্লের কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে তারা তাঁকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেন। ইতিমধ্যে তাঁরা গডেহকে ভারতে পাঠালেন পুরাে ব্যাপারটি চড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার জন্য। ১৭৫৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি ভারতে এসে ডপ্লের পরিকল্পনা বাতিল করে ইংরেজদের সঙ্গে একটা চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। স্থির হ’লে উভয় পক্ষই দেশীয় রাজাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাবেন না এবং চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় যার অধীনে যা ছিল, তার যা কোন অন্যথা হবে না। এইভাবে ডপ্লের স্বপ্ন বিফল হলাে। ফরাসী নেতা বসীর তৎপরতায় নানা প্রতিকুলতা সত্ত্বেও ফরাসীরা তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সক্ষম হলাে।

দাক্ষিণাত্যের ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার এবং কর্নাটকের প্রথম যুদ্ধ এর ভূমিকা জানতে চাইলে তোমরা এখানে ক্লিক করো

 

Class 8 Model Activity Task

Compilation October New

নীচের বিষয় গুলিতে Click করে নতুন মডেল অ্যাক্টিভিটি টাস্ক গুলি লিখে নিতে পারবে

বাংলা

অংক

ইংরেজী

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

স্বাস্থ্য ও শরীর শিক্ষা

ইতিহাস

ভূগোল


Leave a Comment