দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব: প্রায় ২০ বছর ধরে দাক্ষিণাত্যে যে ইঙ্গ-ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছিল, তা শুধ, বিচ্ছিন্নভাবে ভারতের ইতিহাসের একটি অধ্যায় বলে দেখলে ভুল করা হবে । আসলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক ও বাণিজ্যিক প্রাধান্য বিস্তারের বহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি খণ্ডাংশ মাত্র, যদিও গরদের বিচারে ভারতের স্থান ছিল সবার উপরে। আসলে অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ এবং ফরাসী উভয় জাতিই ভারতবষ ও আমেরিকায় নিজ নিজ বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিযােগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ফরাসী সরকারের অপদার্থতা ও ফরাসী অভিজাত সম্প্রদাযের এই ব্যাপারে অবহেলা, অনীহা ও আগ্রহের অভাবের ফলে ফরাসীরা ক্রমশ পিছ, হঠতে থাকে।

ফরাসীরা অবশ্য ভারত্নে চেয়ে আমেরিকায় তাদের স্বার্থ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতাে। ফলে ভারতের দিকে যতটা নজর দেয়া উচিত ছিল, তা তার দেয় নি। তাছাড়া ফরাসী কর্তৃপক্ষ ইউরােপীয় সমস্যার সঙ্গে অত্যধিক জড়িত হওয়ার ফলে তাদের পক্ষে ইউরোপ ও বহিবিশ্ব উভয় অঞ্চলেই একসঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ ইউরােপে ফ্রান্সের এইভাবে জড়িয়ে পড়ার কোন যুক্তি ছিল না, কারণ সেখানে ফ্রান্সের স্বার্থে কোনভাবে আঘাত পড়ে নি। ইংল্যান্ড এই ধরণের কোন ভুল করে নি। ইংল্যাণ্ড ইউরোপে নিজের সর্বশক্তি নিয়ােগ না করে ভাত ও আমেরিকায় করেছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকা উভয় অঞ্চল থেকেই ফ্রান্স বিতাড়িত হয় এবং ভারতে ফরাসীদের পরিবর্তে ইংরেজদের সাম্রাজ্য স্থাপনের সম্ভাবনা উজ্জল হয়ে ওঠে। কণটিকের যুদ্ধ ও বাংলায় চন্দননগরের পতন এইভাবে যেমন ফরাসীদের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেয়, তেমন একইভাবে ভারতের ভবিষ্যৎও এর ফলে ঠিক হয়ে যায়।

১৭৬৩ সালের পরেও ভারতে ফরাসী কেন্দ্রগুলির অস্তিত্ব বজায় রইলাে বা ফরাসীরা ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে পুরােপরি হঠে যায় নি। হায়দর আলি ও টিপ, সুলতানকে সক্রিয় সাহায্য দান করে ফরাসীরা ইংরেজদের কাছে আবার চ্যালেঞ্জ ছড়ে দিয়েছিল। তাছাড়া নেপােলিয়নের মিশর অভিযান ইংরেজদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল, যদিও এই ভীতি হয়ত অনেকাংশেই ছিল অমলক। লর্ড ওয়েলসলি নেপােলিয়নের সম্ভাব্য আক্রমণের প্রশ্নটিকে লঘু করে দেখেন নি। তাছাড়া নিজাম ও মারাঠাদের মধ্যেও ফরাসীদের প্রভাব ইংরেজদের আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৭৬৩ সালের পরেই মােটামুটি বােঝা গিয়েছিল যে, ফরাসীরা নয়, ইংরেজরাই ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম। এই দিক বিচার করলে দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারতের ইতিহাসে এক নব যুগের সূত্রপাত করেছিল বললে বােধহয় কোন অত্যুক্তি হয় না। তবে কণটিক যুদ্ধের ফলেই যে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, তা নয়। কেননা তখনও ভারতের বহৎ শক্তিগুলির সঙ্গে, বিশেষতঃ মারাঠাদের সঙ্গে, ইংরেজদের শক্তি পরীক্ষা হয় নি। কণটিকের নবাব বা হায়দ্রাবাদের নিজামের সঙ্গে মারাঠা শক্তি বা হায়দর টিপর মহীশূরের কোন তুলনাই হয় না। তাছাড়া ইংরেজদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পেলেও, সরাসরি শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করার মত ক্ষমতা বা লােকবল তখন ইংরেজদের ছিল । সুতরাং কর্ণাটকের যুদ্ধের গরসকে অতিরিক্ত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখার কোন যুক্তি নেই। আসলে কণটিকের যুদ্ধে ভারতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যেতে পারে, তার একটা ইঙ্গিত বহন করে এনেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভবিষ্যৎ তৈরী হয়ে যায় নি।

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব:

ভারতের ইতিহাসে কর্ণাটকের যুদ্ধ খুবই গুরত্বপূর্ণ আরাে এই কারণে যে, এই যুদ্ধই প্রথম বিদেশী বণিকদের মনে ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের উচ্চাকাঙ্খা জাগিয়ে তুলে ছিল। ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তির দুর্বলতা, দেশীয় শাসকদের অন্তদ্বন্দ্ব ও দলাদলি এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অযােগ্যতা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু এই সুযােগ গ্রহণ করার মত সাহস ও আত্মবিশ্বাস বিদেশী বণিকদের ছিল। ও ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে তারাই যে প্রধান চালিকাশক্তি, তা অচিরেই প্রমাণিত

হয়েছিল। যে ভাবে দুটি বণিক সংস্থা ভারতীয় শাসকগােষ্ঠীকে পরস্পর পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে শিখণ্ডী খাড়া করে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের জন্য যুদ্ধ চালিয়েছিল, তা ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামাের দৈন্যদশা সর্বসমক্ষে উঘাটিত করে দেয়। এই অনায়াস সাফল্যই ইউরােপীয়দের মনে প্রেরণা ও উৎসাহের সঞ্চার করেছিল। ভারতীয় শাসকদের এই স্বার্থপরতা, দলাদলি, অনৈক্য ও এদের অনেকের বিদেশী শক্তির উপর অসহায় নির্ভরশীলতাকে পাথেয় করেই ভবিষ্যতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু এ সব কিছুরই সূচনা হয়েছিল কণটিকের যুদ্ধ থেকে। কর্ণাটকের যুদ্ধের মধ্যেই ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বীজ নিহিত ছিল। সুতরাং এই যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ফলের চেয়ে, এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়াই অধিকতর গুরত্ব দাবী করে।

কর্নাটকের তৃতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন

Leave a Comment