পলাশী থেকে বক্সার ও দেওয়ানী (১৭৫৭-৬৫):

পলাশী থেকে বক্সার ও দেওয়ানী (১৭৫৭-৬৫): 

পলাশী থেকে বক্সার ও দেওয়ানী (১৭৫৭-৬৫):

১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে আলীবর্দীর মত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সুত্রপাত হয়। পরবর্তী নবাব সিরাজউদ্দৌলার মাত্র ১৫ মাস রাজত্বকালের মধ্যে বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে। ক্লাইভের সহায়তায় মীরজাফর তাঁকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলার মসনদ দখল করেন। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যের সুচনা হয়।

১৭৬৫ সালে সম্রাট শাহ আলম ব্রিটিশ ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে বাংলা, বিহার ওউড়িষ্যার দেওয়ানীর অধিকার দান করার পর বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য পুরােপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং ১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত বাংলার ইতিহাসকে এক যুগ পরিবর্তনের অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই পর্বের ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তু হলাে বাংলার নবাবী শাসনের অবসান ও ব্রিটিশ শাসনের অভ্যুত্থান। বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের পথে ইংরেজদের দুটি প্রবল বাধা অতিক্রম করতে হয়। প্রথমতঃ তাঁদের বাংলার নবাবকে ক্ষমতাহীন করে তাঁকে পুরােপুরি নিজেদের কতৃত্বাধীনে নিতে আসতে হয়। কাজটি সহজসাধ্য ছিল এবং ধাপে ধাপে ইংরেজরা বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেন। এই কাজ সম্পণ হয় তিনটি রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটানাের পর। প্রথমটি হলাে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ। সিরাজকে সরিয়ে ইংরেজরা মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসালেন শিখণ্ডীরপে। কিন্তু নানা কারণে তাঁর উপর বিরক্ত ও হতাশ হয়ে ইংরেজরা তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে বাংলার মসনদে বসালেন তাঁরই জামাতা মীরকাশিমকে।

১৭৬০ সালের এই দ্বিতীয় রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটলাে বিনা যুদ্ধে ও বিনা রক্তপাতে এবং নিঃশব্দে। কিন্তু যখন তাঁরা বুঝলেন যে, মীরকাশিমকে দিয়ে তাঁদের স্বার্থ সিদ্ধ হচ্ছে না, তখন তাঁরা মীরকাশিমের বিরুদ্ধে পর পর কয়েকটি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে অবশেষে তাঁর, অযােধ্যার নবাব সুজা ও মুঘল সম্রাট শাহ আলমের মিলিত বাহিনীকে চড়ান্তভাবে পরাজিত করলেন ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে। তার আগেই ১৭৬৩ সালে তাঁরা মীরকাশিমকে সরিয়ে আবার মীরজাফরকেই বাংলার নবাবী পদে বসিয়েছিলেন। তৃতীয় এই রাজনৈতিক বিপ্লবের ফলশ্রতি ব্রিটিশ ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ানী লাভ, যা শুধু নামে বা কার্যতঃ নয়, আইনের দিক দিয়েও ইংরেজদের বাংলা অধিকারের কাজ সম্পণ করে। সুতরাং ১৭৫৭ সালে পলাশীতে যার সুত্রপাত, ১৭৬৫ সালে তার পরিসমাপ্তি। দ্বিতীয় যে প্রতিবন্ধকতা ইংরেজদের অতিক্রম করতে হয়, তা হলাে প্রতিবেশী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বণিক সংস্থার প্রবল প্রতিরােধ। পলাশীর যুদ্ধের কিছু আগেই ফরাসী চন্দননগরের পতনের ফলে ফরাসীদের বাংলায় উপনিবেশ স্থাপনের স্বপ্ন বিফলতায় পর্যবসিত হয়।

পলাশী থেকে বক্সার ও দেওয়ানী (১৭৫৭-৬৫): 

১৭৫১ সালে বিদারার যুদ্ধে ওলন্দাজদের পরাজয়ের ফলে ইংরেজরা বাংলায় নিষ্কণ্টক হয়। এইভাবে ভারতের সবচেয়ে সমদ্ধশালী প্রদেশ দখল করে ইংরেজরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাংলার এই দুভাগ্যের জন্য যেমন মীরজাফরের মত ভীর ও স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যক্তি দায়ী ছিলেন, তেমনি ইংরেজদের তৎপরতা, সুযােগসন্ধানী মনােভাব ও সামরিক দক্ষতা, যা পলাশীর যুদ্ধে প্রমাণিত না হলেও বক্সারের যুদ্ধে হয়েছিল, তাদের সাফল্য এনে দিয়েছিল। অবশ্য বাংলার ইতিহাসে মীরজাফর খুব ঘণিত ও নিন্দিত ব্যক্তি হলেও এবং পলাশীর যুদ্ধের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতা অনেকাংশে দায়ী হলেও কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি বিশেষকেই বাংলার পরাধীনতার জন্য দায়ী করা বােধ হয় কিছুটা অসঙ্গত। আসলে অষ্টাদশ শতকের দষিত ও কলষিত রাজনৈতিক পরিবেশে মীরজাফরের মত ঘণিত ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্খা আমাদের অবাক করে । অন্যায় পথে পরের সাহায্য নিয়ে সিংহাসন দখলের ঘটনা অষ্টাদশ শতকে বিরল নয়। তবে মীরজাফরের ভাগ্য তিনি বিদেশী বণিকদের সহায়তা নিয়ে কেবল সিরাজেরই সর্বনাশ করেন নি, নিজের সর্বনাশের পথও খুলে দিয়েছিলেন। ইংরেজদের সাহায্যের এই করুণ পরিণতির কথা তিনি বােধ হয় কল্পনাও করতে পারেন নি। নয়ত আলীবদী যে অপরাধে অপরাধী, তাঁর অপরাধ তার থেকে কিছু বেশী নয়। কিন্তু আলীবদী আর মীরজাফর এক ধাতুতে গড়া নয় তফাৎ এইখানেই।

আলীবদীর চরিত্র ও কৃতিত্ব: 

ষড়যন্ত্রের সাহায্যে বাংলার মসনদ দখল করলেও আলীবদী অপদার্থ ও অযােগ্য ছিলেন না। বরং এক হিসাবে দুর্বল সরফরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে তিনি বাংলার স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হন। দুর্বল সরফরাজের পক্ষে মারাঠা আক্রমণের মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। তেমনি বিদেশী বণিকদের কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। এই দিক দিয়ে বিচার করলে তাঁর অকৃতজ্ঞ আচরণও আমাদের কাছে ক্ষমার যোগ্য বলে মনে হতে পারে। যাই হােক মারাঠা আক্রমণ ছাড়া তাঁর রাজত্বকালে শান্তি ও শঙখলা বজায় ছিল। বস্তুত তাঁর ১৬ বছরের রাজত্বকালে বাংলা ভারতের অন্যান্য প্রদেশের চেয়ে সুশাসিত ও সমৃদ্ধশালী ছিল। মারাঠা আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত বাংলার সুশাসন ও কল্যাণের জন্য তিনি কয়েকজন দক্ষ কর্মচারী নিয়ােগ করেছিলেন। গুপ্তচর বিভাগে রাজা রাজসিংহ, মেদিনীপুরে করম আলি, রামনারায়ণ প্রভৃতি ব্যক্তি ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মত তিনিও যোগ্যতার ভিত্তিতে ও গণ অনুসারে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করতেন।

বিদ্যোৎসাহী হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তাঁর দরবারে বহ, জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির সমাবেশ হয়েছিল। তবে শঠতা ও বিশবাসঘাতকতা তাঁর চরিত্রকে কিছুটা কলঙ্কিত করেছিল। যাই হােক সব মিলিয়ে তাঁর রাজত্বকাল বাংলার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক গৌরবময় অধ্যায় বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন:

Leave a Comment