পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরত্ব:

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরত্ব:

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরত্ব: পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব সম্পকে ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র মতবিরােধ আছে। বিশ্বনাথ Sardesai sapec 31 76616907–“….the disaster (of Panipat ) decided ভাষায় বলেছেন রাজওয়াড়ের সমর থেকে মারাঠা ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধের গুরত্বকে খাটো করে দেখতে চেয়েছেন। তাঁদের মতে কিছু মারাঠার সেনানায়কের প্রাণহানি ছাড়া এই যুদ্ধের কোন রাজনৈতিক গুরত্ব নেই। আহমদ শাহ আবদালী ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের কোন চেষ্টা করেন নি। বরং যুদ্ধের পরই আবদালী মারাঠাদের সঙ্গে হৃদ্য সম্পর্ক স্থাপনে তৎপর হয়েছিলেন। তাঁদের মতে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ফলে মারাঠা শক্তি ধংস হয় নি। এই পরাজয়কে তাঁরা এক সাময়িক দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, কারণ এই যুদ্ধের কিছু পরেই মারাঠারা নানা ফড়নবীশ ও মাহাদজী সিন্ধিয়ার নেতৃত্বে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে ভারতের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এমন কি মাহাদজী সিম্বিয়া ১৭৮৮ সালে দিল্লী অধিকার করে মুঘল সম্রাটকে তাঁর নিয়ন্ত্রনাধীনে নিয়ে এসে প্রমাণ করেছিলেন যে, মারাঠা শক্তির ক্ষয় হয় নি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক G.s. nothing”. এক কথায় পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ফলে ভারত জুড়ে মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন মায়া মরীচিকার মত মিলিয়ে গিয়েছিল বলে মারাঠার ঐতিহাসিকের মনে করেন না।

গুরত্বপূর্ণ ঘটনা এবং এই যুদ্ধে যদি মারাঠাদের হাতে আবদালীর পরাজয় হতাে, তাহলে ভারত ইতিহাসের গতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতাে। মারাঠারা অপরিসীম। ক্ষমতার অধিকারী হতো এবং তাদের সবার অগ্রগতি প্রতিহত করা কারাে পক্ষেই সম্ভব হতাে না। হয়ত তারাই হ’তে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ স্যার যদুনাথ সরকার এই যুদ্ধের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। যে দুত গতিতে মারাঠা শক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করছিল, তা যদি পানিপথের যুদ্ধে বাধা না পেত, তাহলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কি হতে পারতো, তাই তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখাতে চেয়েছেন এবং এই দিক দিয়ে বিচার করেই তিনি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের রাজনৈতিক গুরত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতার সমালােচনা

নিরপেক্ষ বিচারে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরত্ব অগ্রাহ্য করা সমীচীন নয়। এই যুদ্ধে মারাঠারা জয়ী হলে তার সম্ভাব্য ফল কি হতো, তা নিয়ে স্যার যদুনাথ যা বলেছেন, তা হয়তাে অনেকে মানবেন আবার হয়ত অনেকে তা মানবেন না। এ বিতকে প্রবেশ বােধ হয় না করাই বাঞ্ছনীয়। যা, হয় নি, কিন্তু হতে পারতো, তা, নিয়ে আলোচনা নিষ্ফল মনে হতে পারে। কিন্তু স্যার যদুনাথের মূল বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত হবার অবকাশ নেই। অর্থাৎ মারাঠা ঐতিহাসিকেরা যে ভাবে এই যুদ্ধের গুরত্বকে নস্যাৎ করতে চেয়েছেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। হয়তো মারাঠা জাত্যাভিমান তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গী আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল এবং তার ফলে তাঁরা নিরপেক্ষ হতে পারেন নি। কিন্তু ঐতিহাসিকের দায়িত্ববোধ ও সত্যের প্রতি নিষ্ঠা যে এই ধরণের সঙ্কীর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গীকেও ছাপিয়ে যেতে পারে, মারাঠা ঐতিহাসিক সরদেশাই তার প্রমাণ। তাই যে সরদেশই এক জায়গায় বলছেন “the disaster (of Panipat) decided nothing”, সেই সরদেশাই অন্যত্র বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এই যুদ্ধের ফলেই ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়।

পেশবার পত্র বিশ্বাস রাও, সদাশিব রাও ও অন্যান্য বহ, মারাঠা সেনানায়ক এই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় ২৮,000 সৈনিক প্রাণ হারান। 50,000 ঘােড়া, ৫০০ হাতী ও হাজার উটও এই যুদ্ধে ধংস হয়। স্যার যদুনাথ মারাঠাদের এই পরাজয়কে একটি “জাতীয় বিপর্যয়” বলে উল্লেখ করেছেন। মহারাষ্ট্রে এমন কোন পরিবার ছিল না, যার অন্তত একজন সদস্য এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় নি। এক কথায় এই যুদ্ধের ফলে মারাঠা সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। ঐতিহাসিক এলফিলস্টোনও অনরপ মন্তব্য করেছেন। মারাঠাদের দীর্ঘদিন এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির জের টানতে হয়েছিল। স্যার যদনাথের মতে এই পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির নৈতিক ফল ছিল আরও মারাত্মক। এই পরাজয়ের ফলে মারাঠাদের মর্যাদা ও অপরাজেয় ভাবতি ধলিলণ্ঠিত হয়। দেশীয় শক্তিগুলি মারাঠাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা বুঝতে পারে যে মারাঠারা নিজেরাই যখন আত্মরক্ষা করতে অক্ষমু, তখন তাদের উপর নির্ভর করা বা তাদের পক্ষপটে আশ্রয় গ্রহণ কর। নিবুদ্ধিতার নামান্তর। বস্তুতঃ মারাঠা শক্তি যেভাবে দুত শক্তি সঞ্চয় করছিল, তাতে মনে হয়েছিল তারাই সারা ভারত জুড়ে এক বিশাল তৃতীয় যুদ্ধে তাদের এই স্বপ্ন ভেঙ্গ সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম। পানিপথের চুরমার হয়ে যায়। এই দিক দিয়ে বিচার করলে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ফলে পেশবার সম্মান ও মর্যাদা ক্ষম হয়। বালাজী বাজীরাও এই পরাজয়ের আঘাত সহ্য করতে না পেরে ভগ্নহৃদয়ে প্রাণত্যাগ করেন। পরবতী পেশবা মাধব রাও ভাগ্যবশতঃ বেশীদিন বাঁচেন নি। বিশ্বাস রাও, সদাশিব রাও ইত্যাদি যােগ্য মারাঠা নেতারা আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে মত্যু বরণ করেছিলেন। ফলে মারাঠাদের জীবনে এক বিপর্যয় নেমে আসে। প্রথম শ্রেণীর নেতাদের মৃত্যুর ফলে রঘুনাথ রাও-এর মত অপদার্থ ও অযােগ্য নেতা মারাঠাদের ভাগ্যনিয়ারপে আবির্ভূত হন। স্যার যদুনাথের মতে পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হলেও রঘুনাথ রাও-এর অভ্যুথান মারাঠাদের যা ক্ষতি করেছিল, তার হাত থেকে মারাঠারা রেহাই পায় নি। রঘুনাথ রাও-এর নিফল উচ্চাকাঙ্খা ও পেশবা পদের জন্য নিলজ্জ লােভ মারাঠা শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। পানিপথের যুদ্ধের আগে পেশবারা যে মর্যাদা ও প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন, পরবর্তীকালে বিশেষতঃ মাধব রাও-এর মত্যুর পর, তা তাঁরা কোন দিনই ফিরে পান নি। মারাঠাদের এই অধঃপতন ও ভাগ্যবিপর্যয়ের সময় নানা ফড়নবীশের মত নেতার অবিভবি না ঘটলে মারাঠাদের অবস্থা আরও করণ ও সঙ্গীন হতাে। অন্যদিকে মারাঠাদের এই বিপর্যয়ের পণ সুযােগ গ্রহণ করে মহাশরে হায়দর আলি নিজ ক্ষমতা ও প্রাধান্য বিস্তারে তৎপর হন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, তাদের পক্ষে হায়দরকে বাধা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। হায়দারের এই অভ্যুথান দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে আরও জটিলতার সষ্টি করে। ।

একথা অবশ্য ঠিক যে, পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ফলে মারাঠা শক্তি ধংস হয় নি এই যুদ্ধে মারাঠারা একটা প্রচণ্ড আঘাত পেলেও, তারা দ্রুতগতিতে তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়। পরবর্তী পেশবা মাধব ধাও-এর নেতৃত্বে মারাঠাৱা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। মাধব রাও-এর মত্যু অবশ্য এই পুনরুদ্ধারের কাজকে যথেষ্ট ব্যাহত করে। কিন্তু নানা ফড়নবীশ ও মহাদজী সিন্ধিয়ার যােগ্য নেতৃত্বের ফলে মারাঠারা আবার উত্তর ভারতে সক্রিয় হয় ও মুঘল সম্রাট তাদের ছত্রছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন; পাঞ্জাব অবশ্য চিরদিনের জন্য মারাঠাদের হস্তচ্যুত হয়। এদিকে আবদালীও ভারত ত্যাগ করে চলে যান ও তিনিও পাঞ্জাবে নিজের কতৃত্ব ধরে রাখতে পারেন নি। সুতরাং ভাগ্যও কিছুটা মারাঠাদের সহায়ক ছিল। পানিপথের তৃতীয়

যুদ্ধের পরেও মারাঠরা যথেষ্ট শক্তির অধিকারী ছিল এবং পরপর তিনবার তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। নিজাম ও মহীশরের হায়দার আলি ও টিপ সুলতানও তাদের হাতে পরাজিত হন। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেমারাঠারাই ছিল দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে প্রচণ্ড আঘাত পাবার পরও তাদের এই দুত পুনরুজ্জীবন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় গরত্ন এইখানে যে, এই যুদ্ধ অষ্টাদশ শতকে ভারতে রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের প্রশ্নটিকে অনেক সরল করে দেয়। এই যুদ্ধের পর এ কথা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, আফগান বা মারাঠা কারও পক্ষেই।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের গুরত্ব:

ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। আবদালী নিজে ভারতে কোন সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হন নি। অন্যদিকে তিনি মারাঠা শক্তির শিরদাঁড়া ভেঙ্গে দিয়ে তাদেরও ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতা অধিকার করার পথে প্রতিবন্ধকতার সষ্টি করলেন। এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। তারা আগেই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত তৈরী করে নিজেদের ক্ষমতা বিস্তারের জন্য তৎপর হচ্ছিল। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয় তাদের কাছে এক সুবর্ণ সুযােগ এনে দেয় তাদের এই স্বপ্ন সফল করতে। এ কথা অবশ্য ঠিক যে, এই লক্ষ্যে উপনীত হতে ইংরেজদের তখনও অনেক পথ ও বাধা অতিকুম করা বাকী ছিল। কিন্তু সব চেয়ে শক্তিশালী দেশীয় রাজ্যের এই ভাগ্য বিপর্যয় তাদের স্বপ্ন সফল করার পথে অনেকটা সহায়ক হয়েছিল। মারাঠা ঐতিহাসিক সরদেশাইও পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের এই সুদূরপ্রসারী গুরত্বকে অস্বীকার করতে পারেন নি।

It is significant that while the two contestants, the Marathas and the Musalmans were locked in deadly combat on the field of ancient Kurukshetra, Clive the first founder of British empire in India, was on his way to England to explain the feasibility of his dreams of an Indian empire to the great commoner, Lord Chatham, then the Prime minister. Panipat indirectly ushered in a new participant in the struggle for Indian supremacy. This is indeed the direct outcome of that historical event, which on that account marks a turning point in the history of India ; ( G.S. Sardesai ; New history of the Marathas

উপরের উদ্ধৃতি থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে সরদেশই পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ কোন কিছুরই মীমাংসা করেনি বলে এর গুরত্বকে অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিলেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত স্বীকার না করে পারেন নি যে, এই যুদ্ধই ভারতের ইতিহাসের মােড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যলক্ষী এই ভাবেই ইংরেজদের ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ পরােক্ষভাবে গড়ে দিয়েছিলেন। বিনা লােকক্ষয়ে ও অর্থ ব্যয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক মারাঠারা এইভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আবদালীর কাছে ইংরেজদের ঋণ ও কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

বাজিরাও এর সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment