পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণ :

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণ :

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণ :

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয় দুঃখজনক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। কি রণ-কৌশল, কি সামরিক দক্ষতা, কি নেতৃত্ব কোন দিক দিয়েই মারাঠারা আবদালীর সমকক্ষ ছিল না তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয় দুঃখজনক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। কি রণ-কৌশল, কি সামরিক দক্ষতা, কি নেতৃত্ব কোন দিক দিয়েই মারাঠারা আবদালীর সমকক্ষ ছিল । তাছাড়া মারাঠাদের নানা ভুল ভ্রান্তি ও নেতাদের পারস্পরিক বােঝাপড়ার অভাবও মারাঠাদের ভাগ্য বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রথমে আসা যাক উভয় পক্ষের সামরিক শক্তির তুলনামূলক আলোচনায়। আবদালীর সৈনিককের সংখ্যা ছিল মােট ৬০,০০০, যার মধ্যে তাঁর নিজস্ব সৈন্য ছিল অর্ধেক ও বাকী অর্ধেক ছিল তাঁর ভারতীয় মিত্রপক্ষের সৈন্য। অপরপক্ষে মারাঠাদের অশ্বারােহী ও পদাতিক সৈন্য ছিল মােট ৪৫,০০০। কিন্তু কেবলমাত্র সংখ্যা দিয়েই কোন সেনাবাহিনীর ক্ষমতা সব বাড়তি সুবিধা দেয়।

মারাঠাদের কমানগুলি ভারী হয় তাদের গতি ছিল শ্লথ। যুদ্ধের অন্যান্য উপকরণের দিক দিয়েও আবদালীর ন্যৈ মারাঠা সেনাবাহিনীর তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। আবদালীর সৈনিকরা আরক্ষার্থে বর্ম পরিধান করতাে। কিন্তু মারাঠা সৈনিকে পােষাক ছিল খুবই হালকা ধরণের। তাছাড়া শঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ সব দিক দিয়েই আবদালীর সেনাবাহিনী মারাঠাদের তুলনায় অনেক এগিয়েছিল। সবার উপরে ছিল আদালীর নেতৃত্ব। বয়স ও অভিজ্ঞতা উভয় দিক দিয়েই আবদালীর সঙ্গে সুদরি রাও তুলনাই হয় না। নাদির শাহের প্রশিক্ষণে শিক্ষিত ও মধ্য এশিয়ার বন্ধে অভিজ্ঞ অবদালী সেই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনানায়ক ছিলেন। মারাঠা কহনীর বলতার আর একটি কারণ হলো যুদ্ধ শিবিরে অসামরিক ব্যক্তি, বিশেষতঃ মহিলাদের অনাবশ্যক উপস্থিতি। সদাশিব রাওকে এ ব্যাপারে সচেতন করে দেয়া হলেও তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিলেন। এই সব অসামরিক ব্যক্তির ভিড় যে কেবলমাত্র সাকি দক্ষতা হ্রাস করতাে তাই নয়, সেই সঙ্গে অসবিধা ও নিরাপত্তাজনিত দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ব্যয়বন্ধি ঘটে ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে টান পড়ে। লাবি রাও এর উচিত ছিল এই সব অসামরিক ব্যক্তিকে ভরতপুর অথবা জিতে রেখে আসা। কিন্তু তা তিনি করেন নি।

মারাঠাদের এটিপূর্ণ রণকৌশলও তাদের পরাজয় ডেকে আনে। ১৫৫০ সালের অক্টোবর মাসের শেষে যখন দুটি সেনাবাহিনী পরষ্পরের মুখোমুখি হয়, তখনই মারাঠাদের আক্রমণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তারা অনাবশ্যক মারেও বেশী সময় নষ্ট করে যখন খাদ্যাভাবে সেনাবাহিনী অনশনের সখন হয়, তখন বেপরােয়া হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মারাঠা সেনাবাহিনীতে এই ভাবে ম নট করেছিল, তা অবশ্য রহস্যই থেকে গেছে। তাছাড়া বিশ্বাস রাও-এর তুর পর সদাশিব রাও যেভাবে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই বন্ধে কাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাও কেন ব্যাখ্যা মেলে না। আর এক দিক থেকেও মারাঠারা অবিবেচনার কাজ করছিল। যুদ্ধে পরাজয় হলে যাতে সুষ্ঠভাবে পশ্চাৎ অপসারণ করা যায়, সে দিকে তার কোন নজর দেয় নি। ফলে পরাজয়ের পর বহ, অসহায় ব্যক্তি আফগানদের হাতে নির ভাবে প্রাণ হারায়।

কোন কোন ঐতিহাসিক মারাঠাদের পরাজয়ের জন্য তাদের চিরাচরিত গেরিলা যদ্ধ রীতি পরিত্যাগ করাকে দায়ী করেছেন। তাঁদের মতে মারাঠারা সম্মুখ যুদ্ধে কোন দিনই পারদর্শী ছিল না। সুতরাং তাদের পক্ষে গেরিলা রণনীতি পরিত্যাগ করা সমীচীন হয় নি। ঐতিহাসিক সরদেশই এই অভিযােগ যৱিষত বলে মনে করেন না। তাঁর মতে এই রণকৌশল অন্যত্র মারাঠাদের সাফল্যের কারণ হলেও উত্তর ভারতের বিস্তৃত সমতল এলাকায় এই রণকৌশল প্রয়ােগ করা সম্ভব ছিল না। দাক্ষিণাত্যের পর্বতসকুল এলাকাতেই এর কার্যকারিতা ফলপ্রসূ ছিল।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের ব্যর্থতার কারণ :

ওয়াকিবহাল ছিল না। সুতরাং তাদের পক্ষে গেরিলা কৌশল ইচ্ছা থাকলেও প্রয়ােগ করা সম্ভব ছিল না। কেবলমাত্র উভয় বাহিনীর মধ্যে সামরিক শক্তির বৈষম্য ও ভ্রান্ত কুণকৌশলের জন্যই মারাঠাগণ পরাজিত হয়েছিল বলা যুক্তিযুক্ত হবে না। তাদের নানা ভুলভ্রান্তি, অদরদর্শিতা, কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও পারস্পরিক বােঝাপড়ার অভাবও তাদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল। লক্ষ্য করার বিষয় আবদালী অযােধ্যার বাব ও রােহিলরে মুসলমানদের সহানুভূতি ও সহায়তা লাভ করলেও মারাঠার কারও কাছ থেকে কোন সাহায্য পায় নি। এই অবস্থার জন্য মারাঠারা নিজেরাই দায়ী ছিল। তারা হিন্দ মুসলিম নির্বিশেষে অত্যাচার চালাতাে এবং হিন্দুপাদ পদশাহীর আদর্শ পরিত্যাগ করে রাজপত ও জাঠেদের বিক্ষধ করে তোলে। তাদের এই অত্যাচারের ফলে হিল, মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়। দ্বিতীয়তঃ উত্তর ভারতে মারাঠা নেতাদের মধ্যে সুষ্ঠ বােঝাপড়া ও ঐক্যের অভাব ছিল। সিন্ধিয়া ও হোলকার এই দই মারাঠা নেতার মধ্যে তীব্র মতবৈষম্য ও ব্যক্তিত্বের সংঘাত ছিল। এই দুই নেতার মধ্যে একটা বোঝাপড়া আনার জন্য রঘুনাথ রাওকে পাঠানো হয়। কিন্তু রঘুনাথ রাও সমস্ত ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন ও সিন্ধিয়া ও হােলকারকে সমঝোতায় আনতে ব্যর্থ হন।

উত্তর ভারতে মারাঠাদের মধ্যে গােলমাল মেটানোর জন্য সদাশিব রাওকে পাঠানাে হয়। তিনি সিঃসন্দেহে যােগ্য ব্যক্তি ছিলেন ও তাঁর প্রচেষ্টায় অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু তিনি কিছুটা একগয়ে ও মাথাগরম স্বভাবের লােক ছিলেন, ফলে অনেকেই তাঁকে সুনজরে দেখতাে না। এই অবস্থায় মারাঠাদের মধ্যে অনৈক্য তাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উত্তর ভারতে মারাঠা নেতারা কিভাবে মারাঠা স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন একটি উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে। উত্তর ভারতে রঘুনাথ রও মারাঠা চর বা প্রতিনিধিদের মধ্যে একটা শঙ্খলাবােধ ও নিয়মানুবর্তিতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। এর ফলে মারাঠা স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। অন্যদিকে নাজিব খাঁ যাতে মারাঠাদের কোন ক্ষতি করতে না পারেন হােলকার সেদিকে নজর রাখতে পারেন নি। এক কথায় উত্তর ভারতে মারাঠা নেতারা যেন অভিভাবকশূন্য হয়ে যে যার মত আচরণ করছিলেন।

সবশেষে মারাঠাদের ব্যর্থতার জন্য পেশবা বালাজী বাজীরাও-এর পরােক্ষ দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। মারাঠাদের উত্তর ভারতের রাজনীতিতে গভীর ভাবে জড়িত হয়ে পড়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণই ছিল না। শতদ্র, নদী অতিক্রম করে অগ্রসর হওয়ার কোন প্রয়ােজনই মারাঠাদের ছিল না। বস্তুতঃ মারাঠাদের পাঞ্জাব নীতি আগাগােড়াই একটা বড় ভুলের উপর দাঁড়িয়েছিল। আবদালীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত হয়ে মারাঠারা অহেতুক খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছিল। বালাজী বাজীর;ও-এর এই নীতি অবিবেচনাপ্রসত ও অদরদশী ছিল। পানিপথের যুদ্ধের আগে সদাশিব রাও পেশবার কাছে বার বার টাকা চেয়ে পাঠান। কিন্তু তাঁর পক্ষে আর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় বালাজী বাজীরাও-এর উচিত ছিল ।

উত্তর ভারতে মারাঠা উচ্চাকাঙ্খার লােভ সংবরণ কর ও সদাশিব রাওকে নিবত্ত করা। স্যার যদুনাথ এই এটির জন্য পেশবার কঠোর সমালােচনা করেছেন। তাছাড়া উত্তর ভারতে যখন মারাঠাদের মধ্যে গােলমাল চলছিল, তখন পেশবার উচিত ছিল স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হয়ে গােলমাল মিটিয়ে দেয়া ও মারাঠা নেতাদের মনে আহার ভাব ফিরিয়ে আনা। তা না করে তিনি তাঁর অপদার্থ অনুচরদের হাতে সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নির্বিকার থাকেন। স্যার যদুনাথ ও সরদেশাই উভয়েই তাঁর নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন:

Leave a Comment