পেশবাতন্ত্রের উদ্ভব ও ১৭০৭ সাল থেকে ১৭৬১ সাল পর্যন্ত ও মারাঠা শক্তির বিকাশঃ

পেশবাতন্ত্রের উদ্ভব ও ১৭০৭ সাল থেকে ১৭৬১ সাল পর্যন্ত ও মারাঠা শক্তির বিকাশঃ

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে সকল আঞ্চলিক শক্তির উদ্ভব ঘটেছিল, তাদের মধ্যে মারাঠারা ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য। শিবাজীর মত্যুর পর মারাঠা শক্তি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে পর পর কয়েকজন প্রতিভাশালী পেশার নেতৃত্বে মারাঠারা পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে ও ভারতের এক বিস্তৃত এলাকায় সাম্রাজ্য স্থাপন করে মুঘল সাম্রাজ্যের যােগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে নিজেদের দাবী প্রতিষ্ঠিত করে। মারাঠাদের এই চমকপ্রদ অগ্রগতি অবশ্য প্রচণ্ড এক ধাক্কা খায় ১৭৬১ সালের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে।

পেশবাতন্ত্রের উদ্ভব ও ১৭০৭ সাল থেকে ১৭৬১ সাল পর্যন্ত মারাঠাদের উত্তরােত্তর ক্ষমতাবদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছিল পেশবাদের অসাধারণ নেতৃত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য। অষ্টাদশ শতকে ছত্রপতি ক্রমশ ক্ষমতাহীন হয়ে তাঁর গুরত্ব হারিয়ে ফেলেন ও পেশবার মারাঠাদের সকল ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী হন। অবশ্য আইনতঃ পেশবা ছিলেন ছত্রপতি মহারাজার কর্মচারীমাত্র এবং তাঁর সমস্ত ক্ষমতার উৎস ছিলেন ছত্রপতি। পেশবার নিয়ােগপত্র সংগ্রহ করতেন ছত্রপতির কাছ থেকেই । পেশবার ছত্রপতির উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দান করতে কাপণ্য করতেন না। কিন্তু আইনতঃ যাই হােক কার্যতঃ পেশবারাই সমস্ত ক্ষমতা ভােগ করতেন।

ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন বলেছেন—“হােলি রােমান সাম্রাজ্যের সম্রাটদের পক্ষে রােমে, অভিষেক যেমন আবশ্যক বলিয়া বিবেচিত হইত, পেশবাদিগের পক্ষেও সাতারার , ছত্রপতি মহারাজের সনন্দ সেইরপ প্রয়ােজনীয় বলিয়া পরিগণিত হইত। তফাতের মধ্যে এই যে মধ্যে মধ্যে রােমের পােপ কোন কোন সম্রাটের অভিষেকে আপত্তি করিতেন, আর শিবাজীর অযােগ্য বংশধরের সে শক্তি বা সাহস কিছুই ছিল না। তাঁহারা দদশার এত নিম্নস্তরে পৌছিয়াছিলেন যে, নজরের কয়েকটি টাকা পাইবার জন্য সকল প্রকার সনদ ও নিয়ােগপত্রেই স্বাক্ষর করিতে প্রস্তুত ছিলেন। ( সুরেন্দ্রনাথ সেন–পেশবাদিগের রাজ্যশাসন পদ্ধতি পঃ ৯) পেশাদের অভুত্থান অষ্টাদশ শতকে মারাঠা জাতির ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য ঘটনা।

পেশাবাদের এই অভ্যুত্থান কিন্তু আদৌ আশ্চর্যজনক বা আকস্মিক ছিল না। ধাপে ধাপে ক্ষমতা সঞ্চয় করে পেশবারা দেশের সবোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন। পেশবা। বালাজী বিশ্বনাথ ছিলেন পেশবাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে তাঁর বংশধরেরাই পেশবাপদ অলংকৃত করেন। ছত্রপতি শাহর সমস্যা ও সেই সমস্যা সমাধানে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাব এবং অষ্টাদশ শতকের গােড়ার দিকে মহারাষ্ট্র জুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিশস্থলা পেশবাদের অভ্যুত্থানের পথ সুগম করে। ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মত্যুর অব্যবহিত পরেই শভুজীর পুত্র শাহকে মুক্তি দেওয়া হয়। শাহর মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মহারাষ্ট্রে এক গৃহবিবাদের সূত্রপাত হয়। শিবাজীর দ্বিতীয় পত্র রাজারামের বিধবা স্ত্রী তারাবাঈ শাহর বিরােধিতা করেন। আসলে মারাঠাদের মধ্যে এই ধরণের গহবিবাদ সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করার অসৎ উদ্দেশ্যেই শাহকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। যাই হােক শেষ পর্যন্ত খেদের যুদ্ধে (১৭০৭) তারাবাঈ-এর স্বপ্ন বিফল করে শাহ, বিজয়গৌরবে সাতারা অধিকার করেন এবং ছত্রপতির পদ অলংকৃত করেন।

ব্যক্তিজীবনে শাহ তাঁর পিতামহের গুণাবলী পান নি। হয়ত দীর্ঘদিন মুঘল রাজ দরবারে বন্দীজীবন যাপন করায় তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব পরিপণভাবে বিকশিত হতে পারে নি। সবচেয়ে বড় কথা শিবাজীর আজীবন সংগ্রাম ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের বিরদ্ধে। মঘলদের শক্তি ধংস করে একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্য গড়ে তােলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু তাঁর পৌত্র শাহ, এই নীতি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন। তিনি মুঘল সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞ ও অনুগত ছিলেন এবং সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করতেন। ফলে অষ্টাদশ শতকে মারাঠারা অমিত শক্তির অধিকারী হলেও মুঘল সম্রাটদের বিরুদ্ধাচরণ করেন নি। বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ বা সমরকুশলী সেনানায়ক হিসাবেও তাঁর কোন খ্যাতি ছিল না। এক কথায় নেতৃত্ব দান করার কোন গণ বা যােগ্যতাই তাঁর ছিল না। তবে নিজে যে অপদাথ ও অযােগ্য, তা তিনি বুঝতেন। আর নিজের কোন গুণ না থাকলেও অন্যের গুণ ও যােগ্যতা যাচাই করার ক্ষমতা তাঁর ছিল। এই কারণে ঐতিহাসিক জি. এস. সরদেশাই তাঁকে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যাই হােক যখন তিনি বুঝলেন যে, তাঁর পক্ষে মারাঠাদের জটিল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়, তখন তিনি সমস্ত দায়িত্ব তাঁর পেশবা বালাজী বিশ্বনাথের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হন। এরপর থেকে যতদিন শাহ জীবিত ছিলেন, তাঁর হয়ে পেশবারাই মারাঠাদের পরিচালনা করেছেন।

পেশবাতন্ত্রের উদ্ভব ও ১৭০৭ সাল থেকে ১৭৬১ সাল পর্যন্ত ও মারাঠা শক্তির বিকাশঃ

মত্যুকাল তিনি কয়েকটি সাপেক্ষে পেশবাকেই রাজ্যের সবোচ্চ ক্ষমতা দান করেন। তখন পেশবা ছিলেন বালাজী বাজীরাও। তারাবাঈ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কিছু করতে পারলেন না। পেশবা সমস্ত বিরোধিতা অতিক্রম করে নিজের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন এবং ছত্রপতির প্রভু হয়ে বসলেন। নিঃশব্দে এই রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেল। পেশবাদের ক্ষমতালাভে কেউ অবাক হলো না; যেন এ ঘটনা ছিল অনিবার্য ও স্বাভাবিক।

শাহর সময়েই পেশবাদের ক্ষমতা চড়ান্তভাবে বেড়ে গিয়েছিল বলে এবং শাহ, তাঁদের উপর পুরোপুরি নির্ভর করতেন বলে যদি কেউ মনে করেন যে, তিনি পেশাদের হাতের পুতুল ছিলেন, তা হলে কিন্তু ভুল হবে। তিনি সক্রিয়ভাবে শাসনকাষে অংশ গ্রহণ করতেন এবং পেশবারা যাতে তাঁর নীতি অনুসরণ করে চলেন, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতেন। তাঁর রাজভক্তির কথা আগেই বলেছি। পেশবারা যাতে মঘল সম্রাটের প্রতি আনুগত্য দেখান, সে দিকে তাঁর লক্ষ্য ছিল। একদিকে সম্রাটের প্রতি আনুগত্য ও অন্যদিকে মরাঠা সাম্রাজ্যবাদ—এই আপাত বিরােধ ও প্রায় অসম্ভব একটি দায়িত্ব পেশবাদের মেনে নিতে হয়েছিল। পেশবাদের কৃতিত্ব বিচার করার ‘ময় তাঁদের এই অবস্থার কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। শাহ, অবশ্য অকৃতজ্ঞ ছিলেন না বা মারাঠাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না। সেই কারণেই তিনি মৃত্যুর আগে পেশাবাদের হাতে সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিয়ে যান। অথচ শিবাজীর বংশধরগণ যাতে মারাঠা সাম্রাজ্যের অধীবরের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যবস্থাও তিনি করে গিয়েছিলেন। ছত্রপতির সঙ্গে পেশবাদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সুরেন্দ্রনাথ সেন জাপানের মিকাডাের সঙ্গে ছত্রপতির এবং শােগুণের সঙ্গে পেশবার তুলনা করেছেন।

পেশবাদের অভুত্থান একদিকে যেমন মারাঠাদের শক্তিবন্ধি ও গৌরবের কারণ হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি ভাবে তা মারাঠাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে তাদের ঐক্য ক্ষম হয় এবং পতনের পথ প্রশস্ত হয়। প্রথমতঃ শিবাজী ও তাঁর কনিষ্ঠ পত্র রাজারামও বুঝেছিলেন যে, মারাঠাদের ঐক্য ও প্রাধান্য বজায় রাখতে হলে জায়গিরদারী প্রথা যতদূর সম্ভব তুলে দিতে হবে, কারণ মারাঠা জায়গিরদারেরা দেশের ঘাথের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে বড় করে দেখতে। কিন্তু এই নীতি পুরােপুরি মেনে চলা কখনই সম্ভব হয় নি। যাই হােক পেশবার অভ্যুত্থানের পর সমস্ত শক্তিশালী জায়গিরদারই তাঁর দণ্টান্ত অনুসরণ করে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করতে আগ্রহী হয়। এর ফলে মারাঠা সাম্রাজ্যও ইউরােপের পবিত্র রােমান সাম্রাজ্যের মত জায়গিরের সমষ্টি মাত্রে পরিণত হয়। এর ফলে মারাঠাদের ঐক্য বিপন্ন হয় এবং পেশবার ক্ষমতা হ্রাস পায়, বিশেষতঃ যখন পেশবার দুর্বল হয়ে পড়েন। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ও উনবিংশ শতকের গােড়ায় এই ধরণের ঘটনাই ঘটেছিল। দ্বিতীয়তঃ পেশবাদের অভ্যুত্থানের ফলে অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে দুটি শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। প্রাচীন, অভিজাতবর্গ নিজেদের পেশবাদের সমকক্ষ বলে মনে করতেন। ফলে তাঁর পেশবাদের কাছ থেকে সমমর্যাদা, সম্প্রম এবং সম্মানসূচক ও ভদ্র ব্যবহার প্রত্যাশা করতেন।

প্রাচীন নবীনরা নিজ নিজ এলাকায় প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। তবে যুদ্ধের সময় তাঁরা সৈন্যবাহিনী দিয়ে পেশবাকে সাহায্য করতেন। কিন্তু যে সব গ্রামের উপর তাঁরা প্রভুত্ব করতেন, সেখানে এক ধরণের প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সুতরাং গ্রাম্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জায়গিরদারদের কর্মচারীদের তত্বাবধানে কাজ করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারও ছিল না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে পেশবারা যে রাষ্ট্রসংঘের ভিত গড়ে তুলেছিলেন, তা জাতীয় ঐক্যের উপর দাঁড়িয়ে ছিল না; বরং তার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এইভাবে পেশরা শিবাজীর জাতীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে মারাঠা সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল।

দক্ষিণাত্যে ইঙ্গ ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করোঃ

Leave a Comment