বাজীরাও (১৭২০-৪০ )

বাজীরাও (১৭২০-৪০ )

বাজীরাও (১৭২০-৪০ ) ১৭২০ সালে বালাজী বিশ্বনাথের মত্যুর পর তার পত্র বাজীরাও পেশবা পদে অভিষিক্ত হন। মারাঠা সাম্রাজ্যবাদের যে আদশ বালাজী বিশ্বনাথের নীতিতে অস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল, তার পর্ণাঙ্গ ও বলিষ্ঠ রপায়ণ ঘটে পত্র বাজীরাও এর হাতে। গ্রান্ট ডাফের ভাষায় তাঁর মস্তিক ছিল পরিকল্পনার জন্মভূমি ; আর দুই বাহ, ছিল সেই সব পরিকল্পনা কার্যকরী করার অস্ত্র। তারণ্য ও শক্তির প্রতীক ছিলেন তিনি। পিতার কাছে তিনি পেয়েছিলেন কূটনৈতিক বুদ্ধি ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ছত্রপতি শহর আস্থা। এই সব গুণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর সাংগঠনিক ও সামরিক প্রতিভা। প্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা ছিল তাঁর আর একটি অসাধারণ গুণ। তাঁর স্বপ্ন ছিল তরণ ও অনুগত মারাঠা নেতাদের উদ্বুদ্ধ করে মুঘল সাম্রাজ্যের ধংসস্তুপের উপর মারাঠা সাম্রাজ্য গড়ে তােলা।

বাজীরাও-এর নীতি ছিল বালাজী বিশ্বনাথের নীতির সম্প্রসারিত রপে মাত্র। পিতার মত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন ও সারা দেশ জড়ে চলেছে এক প্রচণ্ড বিশখলা ও অরাজকতা। এই সুযোেগে মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কিন্তু বালাজী বিশ্বনাথ এই সুযােগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারেন নি। বাজীরাও হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করার জন্য হিন্দুপাদ পাদশাহীর অদর্শ তুলে ধরলেন। এক ধমজ্যের পাশে তিনি বেধে দিতে চাইলেন গােটা ভারতকে। ফলে হিন্দু রাজারা সানন্দে তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিলেন। বাজীরাও-এর এই সাম্রাজ্যবাদী নীতি অবশ্য অনেকেই সমর্থন করলেন না। তাঁরা চেয়েছিলেন আগে দাক্ষিণাত্যে মারাঠা প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করে পরে উত্তর ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তৃতির দিকে নজর দেয়া হােক। কিন্তু বাজীরাও হতােদ্যম হলেন না। তিনি শাহর সমর্থন ও সম্মতি আদায় করে নিজ লক্ষ্যে উপনীত হতে বদ্ধপরিকর হলেন। যাই হােক তাঁর হিন্দােদ পাদশাহী বা হিন্দ, সাম্রাজ্যের আদশ যে হিন্দুদের কতটা অনুপ্রাণিত করেছিল, তা প্রমাণ পাওয়া গেল ১৭২৩ সালে, যখন তিনি মালৰ আক্রমণ করেন। স্থানীয় হিন্দু জমিদারগণ অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও তাঁকে মালব অভিযানে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। এরপর তিনি গজরাটে এক গহ বিবাদের সুযোগ নিয়ে সেখানে মারাঠা প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু তাঁর এই সাফল্য, সেনাপতি কিরাও বাড়ের নেতৃত্ব কিছ; মারাঠা নেতার ঈষার উদ্রেক করে। অন্যদিকে কোলাপুর শাখার রাজা দ্বিতীয় শম্ভুজী ও হায়দ্রাবাদের নিজামও তাঁর এই সাফল্যে আতঙ্কিত হয়ে ধাবাড়েকে সমর্থন করেন। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাজীরাও বিচলিত হলেন না।

বিলহাপরের যুদ্ধে (১৭৩১) তিনি ধাবাড়েকে পরাজিত ও নিহত করেন। এর ফলে মহারাষ্ট্রে তাঁকে বাধা দেবার মত কোন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী অর রইলো না। এদিকে সুযােগসন্ধানী বাজীরাও নিজামের সঙ্গে তাঁরই ঘনিষ্ট [ অনুচর মুবারিজ খাঁর বিরােধিতার সুযােগ নিয়ে বুরহানপুর দখল করলেন। তাছাড়া, তিনি চিতলদুগ, বেলগাঁও, বেদনাের প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কর আদায় করতে থাকেন। মারাঠাদের এই সব কার্যকলাপে নিজাম ঘােরতর অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু মারাঠাদের। হাতে পরাজিত হয়ে তিনি ১৭২৮ সালে মঙ্গীসেওগাঁও এর চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই চুক্তি অনুসারে নিজাম শম্ভুজীর প্রতি তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। তাছাড়া তিনি ১৭১৯ সালের চুক্তি স্বীকার করে নেন। মারাঠাদের ইতিহাসে এই চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। এই চুক্তির মাধ্যমে নিজাম মারাঠাদের চৌথ ও সরদেশমুখী আদায়ের অধিকার স্বীকার করে নেন। সেই সঙ্গে শাহর ক্ষমতাও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ধরদ্ধর রাজনীতিবিদ ও দক্ষ সেনানায়ক হিসাবে বাজীরাও যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। নিজাম অবশ্য এই চুক্তি মেনে চলতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি শভুজী ও ধাবাড়ের সঙ্গে হাত মেলান। কিন্তু বাজীরাও-এর তৎপরতায় শভুজী শেষ পর্যন্ত ওয়ানার চুক্তি (১৭৩১) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই চুক্তির ফলে সাতারা ও কোলাপুরের

বিরােধের অবসান হয় এবং কোলাপর কার্যতঃ সাতারার প্রাধান্য মেনে নেয়। তবে এর ফলে মারাঠা সাম্রাজ্যের ব্যবচ্ছেদ এড়ানাে যায় নি। ওয়ানা ও কৃষ্ণা নদীর সঙ্গম থেকে কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর সঙ্গম পর্যন্ত এলাকার অধিকারী হন শম্ভুজী। অন্যদিকে তুঙ্গভদ্রা থেকে রামেশ্বরম পন্ত এলাকা উভয় পক্ষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়। অবশেষে নিজামও ১৭৩১ সালের এক চুক্তিতে উত্তর ভারতে মারাঠাদের প্রাধান্য মেনে নিতে স্বীকৃত হন। মারাঠারাও অবশ্য অনুরুপভাবে দাক্ষিণাত্যে নিজামের উচ্চাকাঙ্খ মেনে নেন এরপর বাজীরাও উত্তর ভারতে মারাঠা প্রতিপত্তি বিস্তারের দিকে মন দেন। এই কাজে তিনি অম্বরের রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ ও ছত্রশাল বন্দেলার সক্রিয় সাহায্য পান। ১৭৩৭ সালে তিনি প্রথম যমুনা অতিম করে দোয়াব লন করেন। কিন্তু মালহর রাও হােন্ডার অযোধ্যার নবাব সাদাত খাঁর হাতে পরাজিত হন। বাজীরাও অবশ্য মুঘলদের পরাজিত করে দিল্লীর উপকণ্ঠে উপস্থিত হন। নিরপায় সম্রাট নিজমের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু নিজাম মারাঠাদের হাতে আবার ভপালের যুরে পরাজিত হন এবং দোয়াহা সরাইয়ের সচিব (১৭৩৮ করতে বাধ্য হন। এই চুক্তির সতানুসারে নিজাম মালবের উপর মারাঠাদের সার্বভৌম ক্ষমতা মেনে নিতে বাধ্য হন। তাছাড়া নর্মদা ও চম্বল নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলেও মারাঠা গ্রাধান্য নিজাম স্বীকার করে নেন। এই চুক্তি যাতে মুঘল সম্রাটও মেনে নেন, তার জন্য নিজাম সচেষ্ট থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এই চুরি ফলে উত্তর ভারতে মারাঠা প্রাধান্য নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক এইচ এন. সিনহার মতে এটাই বাজীরাও এর জীবনে সবচেয়ে গৌরবজনক সাফল্য এবং এর ফলেই তাঁর রাজ্যবিস্তার নীতি পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।

বাজীরাও (১৭২০-৪০ )

১৭৩৩ সালে বাজীরাও জাঞ্জিরার শিদিদের বিরুদ্ধে এক দীঘস্থায়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হন এবং তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হন। সেই সঙ্গে তিনি পশ্চিম উপকূলে পতুগীজদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ক্যাথলিকদের অত্যাচার থেকে হিন্দু ধর্ম রক্ষা করাও পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটি কারণ ছিল। যাই হোক শেষ পর্যন্ত তিনি পর্তুগীজদের কাছ থেকে সলসেট ও বেসিন অধিকার করেন। ওদিকে নাদির শাহের ভারত আক্রমণ তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তােলে। কিন্তু এ সম্পর্কে কোন কিছু করার আগেই ১৭৪০ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর মৃত্যু হয়।

মারাঠা সাম্রাজ্যের অভ্যুত্থানে বাজীরাও-এর অবদান সম্পকে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত নেই। সামরিক প্রতিভা ও বিচক্ষণ কূটনীতিবিদ হিসাবে তাঁর স্থান শিবাজীর পরেই। পােবা পদে যখন তিনি অভিষিক্ত হন, তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ। কিন্তু নিজ বুদ্ধিবলে ও বিচক্ষণতায় মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে তিনি মারাঠা সাম্রাজ্যকে একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেন। চতুর্দিকে মারাঠা প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করে তিনি পনেকে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। ঐচ্ছািসিক সরদেশাই এর মতে মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে তিনি মারাঠা রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক রপান্তর ঘটান এবং সমস্ত ভারতের রাজনৈতিক শক্তিগুলির পুনর্বিন্যাস করেন। তাঁর এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে উচ্চ প্রশংসার দাবী রাখে। স্যার রিচার্ড টেম্পলের মতে আরব সাগর থেকে

বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সমগ্র এলাকা তাঁর ভয়ে প্রকম্পিত হয়। একজন সংগ্রামী পেশা ও হিন্দ, ক্ষাত্রধর্মের প্রতীক হিসাবে আজও সমস্ত মহারাষ্ট্রে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। বস্তুতঃ শাহ, তাঁকে পেশা পদে অভিষিক্ত করে ও তাঁর উপর পর্ণ আস্থা রেখে যে চরম দরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বাজীরাও-এর জন্যই শাহ একটি বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন। উভয়ের লক্ষ্য এক হলেও পদ্ধতি এক ছিল না। শাহর সম্রাট প্রীতি অক্ষুন্ন রেখেও বাজীরাও উত্তর ভারতের মারাঠা প্রাধান্য স্থাপন করেছিলেন। অন্য কারও পক্ষে এই কাজ অসম্ভব ছিল। অষ্টাদশ শতকে মারাঠা সাম্রাজ্য স্থাপনে তাঁর অবদানের কথা মনে রেখেই ঐতিহাসিক সরদেশাই তাঁকে “বহত্তর মহারাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা” বলে অভিহিত করেছেন।

দুঃখের বিষয় সমগ্র মারাঠা রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদল করে এক সুবিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও বাজীরাও সেই সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বিধান করতে কোন সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। সেনানায়ক হিসাবে তিনি যতটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, শাসক হিসাবে তার খণ্ডাংশও পারেন নি। তাঁর চরিত্র ও কৃতিত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্যার যদুনাথ সরকার মন্তব্য করেছেন “The peshwa’s work was that of a conqueror, not that of a consolidator. He was a matchless cavalry leader but no statesman, no far-sighted reformer. The very idea of remodelling the political institutions of the Marathas and setting up of shools for training the new type of captains and civil servants Tequired by the altered condition of the Maratba state, and the sudden impact of European arts and arms upon the old Indian world, Devec entered Baji Rao’s head, nor into that of his more happily situated son and successor.”

রাজারামের সময় থেকেই মারাঠাদের মধ্যে জায়গির প্রথার পুনঃ প্রবর্তন হয়, যার ফলে মারাঠা ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হয় এবং কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা সচিত হয়। বেবারে ভোঁসলে পরিবার, ধাবাড়ে পরিবারের পতনের পর গাইকোয়াড়রা গুজরাটে (বরােদা), গােয়ালিয়রে সিদ্ধিারা এবং ইন্দোরে হােলকাররা ক্ষমতা বিস্তার করতে থাকে। মারাঠা শক্তি বিস্তারে এদের দান অবিস্মরণীয়। কিন্তু এদের শক্তিবদ্ধি ও সমস্ত মারাঠা সদরদের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার অভাব ক্রমশঃ মারাঠা ঐক্যের পথে একটা প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরণের বিপদ সম্পকে বাজীরাও সচেতন হন নি। তাছাড়া এই সব মারাঠা সদার বলপ্রয়ােগের দ্বারা যতটা পারা যায় রাজস্ব আদায় করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে তৎপর ছিলেন। কিন্তু এই অত্যাচারের ফলে মারাঠাদের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক বিরপে মনােভাবের সন্টি হয়, যা মারাঠা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের সহায়ক ছিল না। অন্যদিকে মারাঠা রাজাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বনির্ভর করে তােলার জন্যও বাজীরাও কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। মহারাষ্ট্রের অনবর জমিতে এমনিতেই চাষ বাস ভাল হতাে না। কিন্তু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জলসেচ বা বাঁধ তৈরী করার দিকে তাঁর কোন নজর ছিল না। ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতির জন্যও তিনি কোন চেষ্টা করেন নি। সুরেন্দ্রনাথ সেন যথার্থই বলেছেন বাণিজ্যের প্রসার দ্বারা দেশের সমদ্ধি বদ্ধি করা ব্যতীত তাঁহাদের আর্থিক অনটন ঘচাইবার আর উপায় ছিল না। বস্তুতঃ মারাঠাদের আর্থিক স্বাচ্ছল্যের অভাৰ ছিল তাদের পতনের অন্যতম কারণ।

বালাজি বিশ্বনাথ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন:

Leave a Comment