মারাঠা আক্রমণ :

মারাঠা আক্রমণ :

মারাঠা আক্রমণ : আলীবদীর রাজত্বকালের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য অবশ্য ভোঁসলের সাফল্যে পেশবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং উভয়ের মধ্যে বাংলার চৌথ আদায়ের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। ফলে দুজনেই বাংলা আক্রমণ করেন। শেষ পর্যন্ত ছত্রপতি শাহর মধ্যস্থতায় এই বিরােধের নিষ্পত্তি ঘটে এবং উভয়ের মধ্যে বাংলায় চৌথ আদায়ের বাঁটোয়ারা হয়। মারাঠা আক্রমণের দ্বিতীয় কারণ হলাে বাংলার অপরিমিত ধন সম্পদ। তৃতীয় কারণটি অবশ্য একটি ভ্রান্ত ধারণার উপর দাঁড়িয়েছিল। সুজাউদ্দীনের মত্যুর পর বাংলায় যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ঘটনা হলাে মারাঠা আক্রমণ। সমসাময়িক সাহিত্যিক গঙ্গারাম তাঁর মহারাষ্ট্র পরাণ গ্রন্থে মারাঠা আক্রমণের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সালের মধ্যে একের পর এক মারাঠা আক্রমণের ঢেউ বাংলায় অছিড়ে পড়তে থাকে। এই সব মারাঠা আক্রমণের জন্য সাধারণভাবে তিনটি কারণ দায়ী ছিল। প্রথমতঃ পেশবা বালাজী বাজীরাও ও রঘজী ভোঁসলের মধ্যে ঘরােয়া কলহ ও বিবাদ ভোঁসলেকে বাংলা আক্রমণে প্ররােচিত করে। ভোঁসলের উত্তরােত্তর ক্ষমতাবন্ধি পেশবার মনে হিংসার উদ্রেক করে। তাই তিনি চেয়েছিলেন দরবতী বাংলায় ভোঁসলে যদি লুঠতরাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে পুণের রাজনীতি থেকে তাঁকে দরে রাখার কাজ সহজ হবে। অন্যদিকে ভোঁসলেও বাংলায় তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খ চরিতার্থ করার সুযােগ পেয়ে নিজেকে কিছুটা ধন্য ও কৃতার্থ মনে করেন।

১৭৪২ সালে মারাঠারা বর্ধমান জেলায় লঠপাট শর করে। এপ্রিল মাসে নবাব বর্ধমানে এসে এই আক্রমণের মােকাবিলা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মারাঠা সৈন্য সেখানে নবাবকে অবরােধ করে। এদিকে রস্তম জঙ্গের বিচক্ষণ নায়েব মীর হাবিব মারাঠাদের সঙ্গে যােগ দেওয়ায় তাদের শক্তি বদ্ধি পায়। মারাঠারা গ্রামের পর গ্রাম জালিয়ে দিতে থাকে ও লুঠতরাজ চালায়। নবাবের অনুপস্থিতিতে মারাঠা বাহিনীর নায়ক ভাস্কর পণ্ডিত মুর্শিদাবাদ শহর লুঠ করেন। নবাব মুর্শিদাবাদ রক্ষার উদ্দেশ্যে দুত রাজধানীতে ফিরে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে মারাঠা সৈন্য কাটোয়া অধিকার করে নেয়। ফলে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে রাজমহল থেকে মেদিনীপার ও জলেবর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় নবাবী শাসনের বিলােপ ঘটে ও মারাঠাদের আধিপত্য স্থাপিত হয়। আলীবদী অবশ্য এই পরাজয় সহজে মেনে নিলেন না। বষাকালের পর ভাস্কর পণ্ডিত যখন নিশ্চিতমনে কাটোয়ায় দগপিজা করছিলেন, তখন হঠাৎ নবাবের বাহিনী তাঁকে আক্রমণ করে। মারাঠারা ভয়ে পালিয়ে যায়। পালাবার পথে অবশ্য মারাঠারা নিবিচারে লুঠতরাজ চালায়। যাই হােক নবাবের সৈন্য মারাঠাদের তাড়া করে কটক পর্যন্ত অগ্রসর হয়। কটক নবাবের হস্তগত হয়।

১৭৪৩ সালে রঘজী ভোঁসলে ভাস্কর পণ্ডিতকে সঙ্গে নিয়ে আবার কাটোয়ায় উপস্থিত হন। ইতিমধ্যে ছত্রপতি শাহ তাঁকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চৌথ আদায়ের অধিকার দান করেছিলেন। এই অবস্থায় মুঘল সম্রাট পেশবা বালাজী বাজীরাও-এর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। রঘুজীকে উৎখাত করার জন্য পেশবা বিহারে উপস্থিত হন। আলীবদী পেশার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে চৌথ দানের প্রতিশ্রুতি দেন। পেশবাও কথা দেন যে, তিনি রঘুজীর অত্যাচারের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করবেন। এ কথা অবশ্য তিনি রেখেছিলেন এবং রঘজীকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন। ১৭৪৩ সলের জুন মাস থেকে ১৭৪৪ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বাংলায় কোন মারাঠা আক্রমণ হয় নি। ইতিমধ্যে গহর মধ্যস্থতায় পেশার সঙ্গে রঘজীর বিরােধের নিষ্পত্তি হয় ও বাংলায় উভয়ের চৌথ আদায়ের এলাকা ভাগ করে দেয়া হয়।

১৭৪৪ সালের মার্চ মাসে উভয়েই বাংলা আক্রমণ করেন। এই অবস্থায় শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করে আলীবর্দী ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করেন। এই হত্যার ব্যাপারে সৈন্যদলের অধ্যক্ষ গোলাম মুস্তাফা খাঁ আলীবদীকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন। সেই সময়ে নবাব তাঁকে পুরস্কার স্বরুপ বিহারের শাসনকতার পদ দান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় মুস্তাফা বিদ্রোহ ঘােষণা করেন এবং রঘজীকে বাংলা আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেন। ফলে ১৭৪৫ সালে রঘজী আবার বাংলা আক্রমণ করেন। আলীবদী এই আক্রমণ প্রতিরােধ করতে সক্ষম হন। এই সময় আলিবর্দী একদিকে মারাঠা আক্রমণ ও অন্যদিকে আফগান বিদ্রোহের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। যাই হােক ১৭৪৭ সালে তিনি মারাঠাদের আবার পরাজিত করে বর্ধমান জেলা মারাঠাদের হাত থেকে উদ্ধার করেন।

মারাঠা আক্রমণ :

১৭৫১ সাল পর্যন্ত ছােটখাটো মারাঠা আক্রমণ লেগেই ছিল। কিন্তু বৃদ্ধ নবাবের পক্ষে মারাঠা আক্রমণের চাপ ক্রমশঃই দবহ হয়ে পড়ছিল। অন্যদিকে মারাঠারাও শান্তির জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৭৫১ সালের মে মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির শর্তানুসারে নবাব মারাঠাদের বাৎসরিক ১২ লক্ষ টাকা চৌথ দিতে স্বীকৃত হন। সবণরেখা নদী উভয়ের সীমারেখা হিসাবে চিহ্নিত হয় এবং মারাঠারা এই সীমারেখা অতিক্রম করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মারাঠারা উড়িষ্যার রাজস্বও লাভ করে। শেষ পর্যন্ত উড়িষ্যা নবাবের হস্তচ্যুত হয় মারাঠাদের আক্রমণে বাংলাদেশ ছিন্নভিন্ন হলেও এই আক্রমণের মােকাবিলায় আলীবদী একটি সুস্পষ্ট নীতি অনুসরণ করেন। কোন ক্রমেই তিনি মারাঠাদের কাছে নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন না। সম্মান হানিকর কোন বােঝাপড়ায় আসা বা অপমানজনক কোন সন্ধিতে স্বাক্ষর করার ঘােরতর বিরােধী ছিলেন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন মারাঠাদের আক্রমণ প্রতিহত করে তাদের বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে। এর জন্য শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করতেও তিনি ইতস্ততঃ করেন নি। ভাস্কর পণ্ডিতের হত্যা তা প্রমাণ করে। কিন্তু আফগান বিদ্রোহ তাঁর সমস্যা জটিলতর করে তুলেছিল। বয়েসের ভার ও ক্লান্তি এবং বাংলার জনগণের অবর্ণনীয় দুরবস্থা তাঁকে শেষ পর্যন্ত মারাঠাদের সঙ্গে একটা বােঝাপড়ায় আসতে বাধ্য করে।

১৭৫১ সালের সন্ধি বাংলাদেশের ইতিহাসে মারাঠা আক্রমণের মত দুভাগ্যজনক ঘটনা খুবই কম ঘটেছে। বারংবার মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার জনজীবন ছারখার হয়ে যায় এবং বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে অনুভূত হয়। গ্রাম শহর সবত্র মারাঠা আক্রমণের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায় মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার সামাজিক জীবন প্রধানতঃ দ-ভাবে প্রভাবিত হয়। প্রথমতঃ মারাঠাদের অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে যায়। প্রাণভয়ে লােক ঘরবাড়ী ছেড়ে পালাতে থাকে। ফলে পশ্চিম বাংলার যে সমস্ত অঞ্চলে মারাঠাদের আক্রমণ আছড়ে পড়েছিল, সেখান থেকে মানুষ দলে দলে পব ও উত্তর বাংলায় ভিড় করতে থাকে। কলকাতাতেও অনেকে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ মারাঠাদের আক্রমণে পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা উল্লেখযােগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং পব ও উত্তরবঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে কিছু, মারাঠা পরিবারও বরাবরের মত বাংলাদেশে থেকে যায়। কালক্রমে এরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে অথবা সরকারের রাজধবিভাগে যােগদান করে জীবিকা যাপন করতে থাকে। দ্বিতীয়তঃ গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পরাণ থেকে জানা যায় যে মারাঠা সৈন্যগণ এই স তাদের আগেকার ঐতিহ্য ও স্ত্রী-জাতির প্রতি শ্রদ্ধা সম্পণ রপে হারিয়ে ফেলে । তাদের এই নৈতিক অধঃপতনের ফলে বাংলার সমাজ জীবন কলষিত হয়ে যায়। গঙ্গারাম এক জায়গায় লিখছেন এর আক্রমণ বাংলার রাজনৈতিক জীবনকে তিন ভাবে প্রভাবিত করে। প্রথমতঃ মারাঠা আক্রমণের ফলে আফগান বিদ্রোহ ত্বরান্বিত হয়। আলীবদীর বিরুদ্ধে আফগানদের কিছ, অভিযােগ ছিল। মারাঠা আক্রমণের সুযােগে আফগানরা তাদের দাবীদাওয়া নিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে সাহস পায়। মারাঠা আক্রমণকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা নবাবকে বেশ কিছু অসুবিধার মধ্যে ফেলে দেয়। দ্বিতীয়তঃ মারাঠা আক্রমণের ফলে উড়িষ্যা বাংলার হস্তচ্যুত হয়।

১৭৫১ সালের চুক্তিতে অবশ্য মারাঠারা কেবলমাত্র উড়িষ্যার অধিকারী হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারাঠারা উড়িষ্যা পুরােপুরি দখল করতে সক্ষম হয়। তৃতীয়তঃ মারাঠা আক্রমণের সময় ইংরেজরা কলকাতায় বহ, পলাতক ব্যক্তিকে আশ্রয় দান করে তাদের কৃতজ্ঞতা অর্জন করে। ফলে এই সব ব্যক্তি ইংরেজদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। মারাঠা আক্রমণের অর্থনৈতিক ফল সদরপ্রসারী হয়েছিল। বাংলার কৃষি, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে এই প্রভাব অনুভূত হয়েছিল। মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার কৃষি অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। চাষীরা প্রাণের ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় অনেক জায়গায় চাষবাস বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় ধানের ক্ষেতে আগন লাগিয়ে দেয়া হয়। ফলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। দেশে শান্তি ও শঙ্খলা না থাকায় শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিअछ গ্রস্ত হয়। নিরাপত্তা না থাকায় ও ব্যাপক লঠ তরাজের ফলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর নথিপত্র থেকে জানা যায় কিভাবে ইংরেজরা মারাঠা আক্রমণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসার জন্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। যে সামান্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হয়, তার গুণগত মানও যেমন নিকৃষ্ট ছিল, তেমনি তা দামেও বেশী পড়তো। আসলে শিল্পী কারিগরেরাও ঘরবাড়ী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক সময় ইংরেজরা জিনিসপত্র তৈরী করার জন্য অগ্রিম টাকা দিত। একে বলা হতাে “দাদনী। দাদনী দিয়ে ইংরেজরা খুব বিপদে পড়ে যায়। শিল্পী কারীগরেরা পালিয়ে যাওয়ায় অনেক সময় তারা জিনিসপত্রও পেত না, আবার দাদনী বা অগ্রিম টাকাও মার যেত। ১৭৫১ সালের চুক্তির পরেও বেশ কিছুদিন অবস্থার উন্নতি হয় নি। অন্যদিকে টাকাকড়ি ব্যাপকভাবে লুঠতরাজ হওয়ায় দেশের অর্থের ঘাটতি দেখা দেয় ও মুদ্রা ব্যবস্থায় সঙ্কটের সষ্টি হয়। এর ফলেও ব্যবসা বাণিজ্য যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়

সরফরাজ খাঁ আলীবর্দী খাঁ এর সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন:

Leave a Comment