মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি :

মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি :

মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি : অষ্টাদশ শতকে মারাঠারাই ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশীয় রাজ্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেও তাদের এই সগৌরব অভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছিল পেশবাদের আন্তরিক ও অনলস প্রচেষ্টায়। কিন্তু তাঁরা কেবলমাত্র মারাঠা সাম্রাজ্যের ভৌগােলিক সীমাই বাড়িয়ে ছিলেন এবং তার হায়িত্ব বিধানের জন্য কোন যথােপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি বলে অভিযােগ করা অসঙ্গত হবে। অত্যাচার ও লুঠতরাজের জন্য মারাঠাদের অখ্যাতি থাকলেও একথা ভুললে চলবে না যে, কেবলমাত্র লুঠতরাজের উপর ভিত্তি করে কোন সাম্রাজ্য শতাধিক বছর টিকে থাকতে পারে না। বস্তুতঃ বাজীরাও, প্রথম মাধব রাও প্রভৃতি পেশবার

রাজ্যবিস্তারের সঙ্গে প্রশাসনের দিকেও যথেষ্ট নজর দিয়েছিলেন এবং মারাঠা সাম্রাজ্যের হায়িত্ব বিধানের জন্য রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। হিন্দুপাদ পদশাহীর আদশ এই রাজনৈতিক কৌশলেরই অঙ্গ ছিল। ১৭১৩ থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত পেশবারাই ছিলেন মারাঠাদের ভাগ্যবিধাতা, যদিও আইনতঃ ছত্রপতি ছিলেন মারাঠাদের দণ্ডমুণ্ডের কতা। 

ছত্রপতিও সাধারণত পেশবাদের কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করতেন না। সুতরাং পেশবারা সম্রাট না হলেও তাঁরাই ছিলেন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। আবার এক অর্থে পপশবারা ছিলেন অষ্ট-প্রধানের একজন মাত্র। কিন্তু বালাজী বিশ্বনাথ পেশবা পদকে বংশানুক্রমিক করে ও ছত্রপতি শাহ মত্যুকালে সমস্ত ক্ষমতা তৃতীয় পেশবা বালাজী বাজীরাও-এর হাতে সমর্পণ করে পেশবাদের মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী করে যান। ১৭৭২ সাল পর্যন্ত কোন মারাঠা নেতাই পেশবার সর্বময় কর্তৃত্ব অগ্রাহ্য করতে পারেন নি। সুতরাং নামে না হলেও কাজে পেশবারই মারাঠাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

শিবাজীর সময়ে মারাঠা রাজ্যের ক্ষুদ্রতম বিভাগ ছিল গ্রাম বা মৌজা। কতকগুলি মৌজা নিয়ে গঠিত হতো রফ ও কয়েকটি তরফের সমষ্টিকে বলা হতাে সভা। পেশাদের আমলেও পরগণা, তরফ, মৌজা, সভা প্রভৃতি নামগুলি প্রচলিত ছিল। তবে তাদের অর্থগত প্রভেদ এই সময় লােপ পেয়েছিল। পেশবাদের সময়ে সভার বদলে প্রান্ত ও তরক ও পরগণার বদলে মহাল কথাটি ব্যবহার করা হতাে। ছােট ছােট মহালের কর্মচারীদের বলা হতাে কামাবিসদার আর বড় মহালের দায়িত্ব ছিল মামলতদারের উপরে। মামলতদারদের সাধারণতঃ নিযুক্ত করতেন পণ্য সরকার। কামাবিদার ও মামলতদারেরা সরাসরি পেশবার প্রতিনিধি ছিলেন বলে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল অনেক বেশী। কিন্তু তারা যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে পেশবা সরকারের প্রতীক্ষ দৃষ্টি ছিল। তাদের কার্যকলাপের দিকে নজর রাখার জন্য বিভিন্ন কর্মচারী নিযুক্ত করা হতাে। সাধারণতঃ মামলতদার ও কামাবিলদারেরা মাত্র অল্প কয়েক বছরের জন্য নিযুক্ত হতেন। পেশবাদের সময়ে মামলতদারেরা কোন গুরুতর অপরাধ না করলে একই মহালে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন থাকতেন। কিন্তু তাঁরা প্রজাদের উপর অত্যাচার করলে পেশবা সরকার তাঁদের বরখাস্ত করতেন। এই সব কর্মচারীদের বেতন সরকারী কোষাগার থেকে দেয়া হতাে। তবে সকল কামাবিদার একই বেতন পেতেন না। তাদের বেতন নির্ধারিত হতাে মহালের আয়তন ও আয়ের উপর ।

গ্রামে পল্লী সমিতিগলি চিরদিনই গ্রাম শাসনের দায়িত্ব পালন করতাে এবং পেশবার সরকার তাদের স্বাধীন বক্তার উপর হস্তক্ষেপ করতেন না। তবে পোবার কিছু, কিছ, কর্মচারী গ্রাম সমিতির কাজকর্ম তদারক করতেন। গ্রামের প্রধান ছিলেন পাতিল ; রাজস্ব আদায়, পুলিশের বন্দোবস্ত ও পঞ্চায়েত ডাকার দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর। তিনিই ছিলেন গ্রামবাসীর মুখপাত্র এবং পেশবার সরকার ও কর্মচারীদের সঙ্গে যােগাযােগের মাধ্যম। গ্রামে বিবাদ বিশবাদের মীমাংসা করাও ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু সালিন বা আপোষে কোন বিরােধের মীমাংসা না হলে তিনি তা .িপেত্তির জ, পঞ্চায়েত ডাকতেন। এ ব্যাপারে এমবাসীরা রকারী আদালতের উপর নির্ভর করতেন না। পুলিশ কাজে গ্রনের চৌকিদার তাঁকে সাহায্য করতেন। পঢিল কোন রকারী কর্মচারী ছিলেন না। সুতরাং তাঁর ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্ৰামৰ নাই বহন করতে হতো। অধিকাংশ পাটিল মারাঠা জাতিভুক্ত হলেও, কোন কোন গ্রামে মুসলমান পাটিলও ছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পাটিল সচারচর দেখা যেত এম শাসনে পাটিলের পরেই ছিল কুলকানীর হান। ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কেউ না।

কুলকানী হতে পারতেন না। গ্রামের আয় ব্যয়ের হিসাব রাখা ও দলিল দস্তাবেজ লেখা ও রক্ষা করা ছিল তাঁর প্রধান কাজ। কিন্তু রাজস্ব আদায় বা প্রদানের দায়িত্ব তাঁর হাতে না থাকলেও রাজস্ব আদায় না হলে বা তা ঠিক সময়ে পেশবার কাছে জমা পড়লে পাটিলের সঙ্গে তিনিও সাজা ভােগ করতেন। মজার কথা দায়িত্ব প্রায় সমান সমান হলেও কুলকানীর পাওনা-গণ্ডা ছিল পাটিলের চেয়ে কম। কুলকানীকে দলিল দস্তাবেজ রক্ষা করার ব্যাপারে সাহায্য করতেন চৌগল। তিনি আবার রাজব আদায়ের কাজে পাটিলকেও সাহায্য করতেন। গ্রাম্য সমিতিতে পদমর্যাদায় ও জাতি হিসাবে মহারের স্থান ছিল সবার নীচে। কিন্তু গ্রামের সমস্ত মঙ্গলজনক কাজে তাঁর সাহায্য ছিল অপরিহার্য। গ্রামবাসীকে চোর ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করা ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। মহারাষ্ট্রের গ্রামগুলি পরপর বিচ্ছিন্ন ছিল বলে গ্রামের নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসগুলি গ্রামবাসীরাই উৎপন্ন করতো এবং প্রত্যেক গ্রামেই কিছু, শিল্পী থাকতাে। এদের বলা হতাে বলতা। এই সব শিল্পীদের ভরণ পােষণের দায়িত্ব গ্রামবাসীরাই গ্রহণ করতাে। বলতার ষাতে গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে না পারে তার দিকে গ্রামবাসীরা নজর রাখতাে। আর্থিক ব্যাপারে মহারাষ্ট্রের গ্রামগলি পর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতাে। খাজনা দেয়া ছাড় পেশবা সরকারের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না। গ্রামের আভ্যন্তরীণ আয় ব্যয়ের পণ দায়িত্ব ছিল গ্রামবাসীর নিজেদের উপর। এ ব্যাপারে পেশবার সরকার কোনপ্রকার হস্তক্ষেপ করতেন না। গ্রামের কর্মচারীদের পেশার সরকার নিযুক্ত করতেন না। সুতরাং তাদের বেতন দেবার প্রশ্নও ছিল না। গ্রামবাসীরাই তাদের ভরণ পােষণের দায়িত্ব গ্রহণ করতাে। গ্রাম শাসনে পেশবার সরকারের তত্ত্বাবধান ছিল নামমাত্র। এককথায় মহারাষ্ট্রের গ্রামগুলি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বশাসিত। ।

পরগণার দায়িত্ব ছিল দেশমুখ ও দেশপাণ্ডের উপর। কিন্তু শিবাজীর আমলেই তাদের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য তাদের পুরুষানুক্রমিক পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয় নি। পেশবারা শিবাজীর নীতি অনুসরণ করে পরগণায় প্রকারী কর্মচারী নিযুক্ত করতেন। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থেকে দেশমুখ ও দেশপাণ্ডেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও সমস্ত জমির দলিলের নকল তাঁদের কাছেই থাকতাে ও তারাই সমস্ত নতুন দলিল নথিভুক্ত করতাে। তাছাড়া দেশমুখ নিজে রাজস্ব আদায় করলেও পাটিলরা রাজস্বের হিসাব তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং সরকারী কর্মচারীরা যখন রাজস্বের হিসাব দিতেন, তখন তার সঙ্গে দেশমুখের হিসাব মিলিয়ে নেয়া হতাে। এর ফলে মামলতদার বা কামাবিসদারেরা সরকারী টাকা আত্মসাৎ করতে পারতেন না। দেশমুখের পারিশ্রমিক ছিল আদায়ী রাজস্বের শতকরা পাঁচভাগ। তাছাড়া অন্যান্য নানাখাতে তিনি বিভিন্ন পাওনাগণ্ডা আদায় করতে পারতেন। তবে পেশবা সরকার থেকে তাঁদের বেতনের কোন ব্যবস্থা ছিল না। \স্থানীয় প্রশাসনের পর এবার আসা যাক কেন্দ্রীয় শাসনের আলােচনায়। পরে হজর-দপ্তর ছিল মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় ২০০ জন কারকুন কাজ করতেন। মারাঠা সাম্রাজ্যের শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এই দপ্তর থেকে পাওয়া যেত। হজর দপ্তরের প্রধান ছিলেন হজর ফড়নবিশ। শাসন কার্যের সুবিধার জন্য হজর-দপ্তর নানা ভাগে বিভক্ত ছিল। সেই

বিভাগগুলির আবার নানা উপবিভাগে বিভক্ত ছিল। হজর-দপ্তরের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে চালতে (চলন্ত) দপ্তর ও একবেরিজ দপ্তর ছিল প্রধান। একবেরিজ দপ্তরে সমস্ত ধরণের হিসাব-নিকাশের কাজ করা হতাে। চালতে দপ্তর থেকে সমস্ত প্রকার সহকারী নিদেশ ও সনন্দ জারী করা হতাে। তাছাড়া বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বাজেট করার দায়িত্বও ছিল এই দপ্তরের। এই দপ্তরের কাজকর্ম পরিচালনা করতেন স্বয়ং ফড়নবিশ। হজরদপ্তরের সমস্ত কাজকর্ম এমন সশঙ্খলভাবে পরিচালিত হতাে এবং সমস্ত কাগজপত্র এমন যত্নের সঙ্গে রক্ষা করা হতাে যে, রাজ্যশাসন সংক্রান্ত ৮৮ বছরের সমস্ত কাগজ ও দলিলপত্র পরে অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন স্বয়ং রাজা অথবা তাঁর প্রতিনিধি পেশবা। কিন্তু পেশবার কাজের চাপ এত বেশী ছিল যে, তাঁর পক্ষে বিচার কার্যের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হতাে না। তার হয়ে বিচারকার্য সম্পাদন করতেন পনার প্রধান ন্যায়াধীশ বা প্রধান বিচারপতি। ন্যায়নিষ্ঠ ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের ন্যায়াধীশের পদে নিযুক্ত করা হতাে। প্রধান ন্যায়াধীশ ছাড়া বড় বড় শহরে বিচার কার্য সম্পাদন করার জন্য শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা ন্যায়াধীশের পদ অলঙ্কৃত করতেন। গ্রামের বিচারের দায়িত্ব ছিল পাটিলের হাতে। তবে তিনি কোন বিরােধের নিষ্পত্তি করতে না পারলে পঞ্চায়েত ডাকতেন। দেশে চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধ কম থাকায় ফৌজদারী মামলা কম হতাে। গ্রামে ফৌজদারী বিচারের দায়িত্ব পাটিলই পালন করতেন। জেলাস্তরে কামাবিসদার বা মামলতদার ফৌজদারী বিচারের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন। প্রান্তের শাসনকতা সরসভাদারের কাছে আপীলের শুনানি হতো। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পতি হতে পাের ন্যায়াধীশের আদালতে। ফৌজদারী মামলায় সাধারণতঃ পঞ্চায়েত ডাকা হতাে না। সমস্ত অপরাধের সাধারণ শাস্তি ছিল অথদণ্ড বা কারাদণ্ড। প্রাণদণ্ডের প্রচলন সাধারণত ছিল না। তবে পেশবা মাধব রাও-এর সময় অপরাধীকে অনেক সময় বিকলাঙ্গ করে দেয়া হতাে।

যে কোন রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নিভর করে অর্থনৈতিক সম্পদ ও সমদ্ধির উপর। এই দিক থেকে মারাঠা সাম্রাজ্যের ভিত্তি কিছুটা দুর্বল ছিল, কারণ মহারাষ্ট্রের জমি ছিল অনবর এবং তা থেকে পতি শস্য উৎপন্ন হতাে না। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য সব সময়েই মারাঠারা তৎপর ছিল। আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্যই মারাঠারা অনেক সময় লুঠ তরাজের সহজ পথ গ্রহণ করতাে। মারাঠারা নিজেদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন এলাকাকে বলতাে স্বরাজ্য এবং সাধারণতঃ মুঘল অথবা অন্যান্য অঞ্চলগলিকে বলতে মােগলাই। দ্বিতীয় প্রকারের এলাকা থেকে তারা চৌথ ও সরদেশমুখী আদায় করতে। 1 সরদেশমুখীর পরিমাণ ছিল রাজস্বের এক দশমাংশ ও চৌথ ছিল এক-চতুর্থাংশ। শিবাজীর সময় থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছিল। লুঠতরাজ এবং চৌথ ও সরদেশমুখী আদায় মারাঠাদের অপ্রিয় করে তুলেছিল। যাই হােক দেশের অভ্যন্তরে কৃষির উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়িয়ে রাজস্ব বধির দিকে পেশবাদের সব সময়েই নজর ছিল। মারাঠাদের অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল গ্রামকে কেন্দ্র করে। এই গ্রামগলি হয় পাহাড়ের মাথায়, নয় পাহাড়ের নীচে উপত্যকায় গড়ে উঠেছিল। নিরাপত্তার জন্য প্রত্যেক গ্রাম পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখা হতাে। 

বাস করতো না। রামােসী, ভীল, বেভর প্রভৃতি কিছু জাতি, যাদের জীবিকা ছিল চুরি-ডাকাতি, গ্রাম পাঁচিলের বাইরে বাস করতাে। গ্রামের অধিকাংশ অধিবাসী কৃষিকার্যে নিযুক্ত থাকলেও নিত্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য কামার, কুমার প্রভৃতি কুটির শিল্পে নিযুক্ত কিছু ব্যক্তি যাতে গ্রামে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করে, তার জন্য সব সময়েই চেষ্টা করা হতাে। গ্রামের সমস্ত জমি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক ভাগে বসতবাটী নির্মাণ করা হতাে। আর অপেক্ষাকৃত উর্বর কালাে জমিতে চাষবাস করা হতাে। মারাঠা পল্লীর চাষীরাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল— মিরাসদার বা মিসারী ও উপরি। মিসাররা ছিল গ্রামের অধিবাসী এবং জমিতে তাদের স্থায়ী স্বত্ব ছিল। ঠিক সময় খাজনা দিলে এই জমি হস্তচ্যুত হবার ভয় ছিল । এমনকি দীর্ঘদিন খাজনা বাকী থাকলেও বা জমি হস্তান্তর হলেও মিরাসীর স্বত্ব লোপ পেত না। বাকী খাজনা মিটিয়ে দিলে আবার জমি ফেরত পাবার সুযােগ ছিল। উপরিরা অন্য গ্রামের লােক। তারা স্বল্প মেয়াদের ভিত্তিতে জমি চাষ করতো। মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে জমির উপর তাদের কোন অধিকার থাকতাে না।

জমি থেকে প্রাপ্ত কর ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। চাষীরা অধিকাংশ জমির মালিক হলেও, সরকারের নিজস্ব কিছু জমি বা খাসমহল ছিল। খাসমহলের জমি উপরি প্রজাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতাে। তাছাড়া সরকারের প্রয়ােজনে ঘােড়ার ঘাসের জন্য কিছু জমি রেখে দেয়া হতো, এদের বলা হতো কুরণ। খাসমহল থেকে সরকারের খুব একটা আয় হতাে না। খাজনা স্থির করার জন্য গ্রামের সমস্ত জমি জরিপ করে উর্বরতার ভিত্তিতে সমস্ত জমিকে তিন ভাগে ভাগ করা হতো। পতিত জমি থেকে প্রথম কয়েক বছর কোন খাজনা আদায় করার রীতি ছিল না। তারপর যখন কর ধার্য করা হতাে তখন তার পরিমাণ খুব কম হতাে খাজনার হার স্থির করার আগে জমি পরিদর্শন করার নিয়ম ছিল। এরপর ফসলের অবস্থা দেখে ও প্রজাদের সুবিধা অসুবিধার কথা চিন্তা করে এবং গ্রাম্য সমিতির সঙ্গে পরামর্শ করার পর খাজনার হার স্থির করা হতাে। খাজনা আদায়ের ভার ছিল পাটিল ও কুলকানীর সাধারণত তিন বা চার কিস্তিতে খাজনা আদায় করা হতাে। আবার অজন্মা বা দেশে অশান্তি উপদ্রব হলে খাজনা ছাড় বা রেহাই দেবার ব্যবস্থাও ছিল। বিভিন্ন শ্রেণীর জমির করের হারও বিভিন্ন ছিল। প্রজারা নিজেদেরই সুবিধা অনুযায়ী শস্য অথবা নগদ টাকায় খাজনা দিত। তবে পেশার সরকার উৎপন্ন শস্যে কর আদায়ের পক্ষপাতী ছিল। এ ব্যাপারে অবশ্য কোন জোরজবস্তি করা হতাে না। ব্রাহ্মণ প্রজারা করের ব্যাপারে অনেক ছাড় পেত। ফলে অব্রাহ্মণ প্রজাদের উপর করভার ছিল বেশী। কৃষি ও কৃষকদের উন্নতির দিকে পেশবা সরকারের সজাগ দৃষ্টি ছিল। 

মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি :

অনাবলি, অতিবটি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুযোগ বা উপবের সময় প্রজারা সরকারের কাছ থেকে অল্প সদে ঋণ পেত। একে বলা হতাে তগাই ঋণ। সহজ কিস্তিতে এই ঋণ শােধ করা যেত। সদের জন্য কোন রকম জলম করা হতাে না। এমন কি বিনা সদেও তগাই পাওয়া যেত। কৃষির উন্নতির জন্য পেশবা সরকার জলসেচের দিকেও নজর দিতেন। মহারাষ্ট্রে জলসেচনের দরকম প্রথা প্রচলিত ছিল। প্রথমতঃ পাহাড়ের কোন খাদে উপর।bবাঁধ দিয়ে বর্ষার জল ধরে রাখা হতো। পরে ছোট ছোট নালার সাহায্যে সেই জল চাষীর ক্ষেতে পৌছে দেয়া হতাে। এই বাঁধ তৈরীর খরচ কখনও সম্পর্ণ আবার কখনও বা আংশিক ভাবে, সরকার থেকে বহন করা হতাে। দ্বিতীয়তঃ কূপ খনন করেও জলসেচনের ব্যবস্থা করা হতাে। কৃষিকাযের উন্নতির জন্য চাষীদের মধ্যে প্রতিযােগিতামূলক পুরস্কারের ব্যবস্থাও ছিল। কৃষি ও কৃষকদের অবস্থার উন্নতির জন্য পেশবাদের এই চেষ্টাও ওয়েলিংটন ও মনরাের প্রশংসা অর্জন করেছিল।

ভূমিকর ও খাসমহলের আয় ছাড়া জঙ্গল বিভাগের আয়, টাঁকশালের আয়, আদালতের আয়, আয়কর ও আমদানী-রপ্তানী শক থেকেও সরকারী কোষাগারে অথ আসত। মারাঠা সাম্রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ভালাে ছিল না বলে মারাঠা রাষ্ট্রনায়কেরা ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারের দিকে নজর দিয়েছিলেন। শিবাজীর সময় থেকেই মারাঠারা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। পেশবাদের সময় দু-ধরণের শকের কথা শোনা যায়। প্রথমটিকে বলা হতাে মোহতফা বা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ীকৃত ব্যবসায় কর। দোকানদার, কামার, চামার, কুমার, তৈলিক (কল) প্রভৃতি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এই কর আদায় করা হতো। ব্যবসায়ভেদে করের হারের তারতম হতাে। দ্বিতীয়টিকে বলা হতাে জকাত বা ক্রয়-বিক্রয় আমদানী-রপ্তানী কর। জকাত আবার চার ভাগে বিভক্তি ছিল—

(১) থলভরিত বােঝাই করার জায়গায় দেয় কর 

(২) থল মােড় ও পণ্য বিক্রয় হলে দেয় শক 

(৩) ছাপাই বা শীলমোহর করার কর ও হাশীল। প্রত্যেক পরগণায় আলাদা আলাদা ভাবে জকাত আদায় করা হতাে। এর ফলে অবশ্য ব্যবসা-বাণিজ্যের কিছুটা অসুবিধা হতাে। জকাত আদায়ের দায়িত্ব ছিল ইজারাদারদের। শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির দিকে পেশবা সরকারের লক্ষ্য ছিল। কখনও কখনও ব্যবসার সুবিধার জন্য জাতের হার কমিয়ে দেয়া হতাে। প্রজাদের সুবিধার দিকেও পেশবাদের দৃষ্টি ছিল। দুর্ভিক্ষের সময় আমদানী কর পুরােপুরি রহিত করে দেয়া হতাে। ব্যবসাদারেরা যাতে খদ্দেরদের ঠকাতে না পারে তার জন্য বাটখারা ও ওজন পরীক্ষা করে দেখা হতাে। সরকারী ছাপ ছাড়া কাপড় বিক্রী করা যেত না। অনেক সময় নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসের বাজারদর বেধে দেওয়া হতো। পেশবা সরকারের প্রচেষ্টায় বহিঃবাণিজ্যেরও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল। চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মারাঠাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।

এবার আসা যাক মারাঠাদের সামরিক সংগঠন কেমন ছিল, সেই আলােচনায়। মারাঠা সেনাবাহিনীর গঠন ও তার কঠোর শখলাবােধ ও নিয়মানুবতিতা শিবাজীর অনলস প্রচেষ্টা ও দরদর্শিতার পরিচায়ক। ভগ্যিবশতঃ তার উত্তরাধিকারীরা ক্ৰমশঃ তাঁর প্রদর্শিত পথ ও নীতি থেকে বিচ্যুত হন। অবহার চাপে পড়ে শভুজী সামরিক বিভাগে শৈথিল্যের প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হন। শিবাজীর সময়ে যুদ্ধবিগ্রহের লুঠতরাজ থেকে যা আয় হতাে তা সরকারী সম্পত্তি বলে পরিগণিত হতাে। শভুজীর সময়ে এই আয়ের সবটুকুই যেত সেনাবাহিনীতে। এর ফলে শখলার দ্রুত অবনতি ঘটে। এরপর রাজারামের সময়ে জায়গির প্রথার পুনঃ প্রবর্তনের ফলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। শিবাজীর মত্যুর কুড়ি বছরের মধ্যেই তাঁর সামরিক সংগঠন ভেঙে পড়ে। অষ্টাদশ শতকে শাহর উত্থানের আগে পর্যন্ত মারাঠাদের এই দুদিন চলতে থাকে। বালাজী বিশ্বনাথ মারাঠা সাম্রাজ্যের পুনরুত্থানের জন্য অনেকাংশে দায়ী হলেও তাঁর পক্ষে জায়গির প্রথার পনঃ প্রবর্তন জনিত কুফল আটকানাে সম্ভব হয় নি। কানহােজ

দমন করতে তিনি বিফল হন। মারাঠা নেতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য ও আভ্যন্তরীণ শান্তি ও শঙখলা বজায় রাখার জন্য বালাজী বিশ্বনাথ চেয়েছিলেন মারাঠা এলাকার বাইরে তাদের উচ্চাকাঙখা চরিতার্থ করার সুযোেগ দিতে। মুঘল সম্রাট যখন মারাঠাদের চৌথ ও সরদেশমুখী আদায়ের অধিকার মেনে নেন, তখন বালাজী বিশ্বনাথ তাঁর এই নীতি কার্যকরী করতে সক্ষম হন। সরদেশমুখী ছিল রাজার বতন বা স্বত্ত্ব। সুতরাংচৌথের বাকী তিনচতুথাংশ শাহর অনুচরদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতাে। একে বলা হতাে মােকাশা। মােকাশার সবটা কিন্তু সদারেরা পেতেন না। চৌথের সহােত্ৰী বা শতকরা ছ’ভাগ ছিল পন্ত সচিবের প্রাপ্য। যাই হােক মারাঠা সদারেরা মােকাশার বিনিময়ে একটি নিদিষ্ট সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং রাষ্ট্রের প্রয়ােজনে সামরিক সাহায্য প্রদান করতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। মারাঠা সদারদের মধ্যে যাতে কোন সংঘাত না বাঁধে তার জন্য বালাজী বিশ্বনাথ বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন মারাঠা সদারদের মধ্যে ভাগ করে দেন। সেই সব এলাকা থেকে তাঁরা চৌথ আদায় করতে পারতেন। ইচ্ছা করলে তাঁরা তাঁদের নির্ধারিত এলাকা আরও বাড়াতে পারতেন। তাঁরা তাঁদের নিজস্ব এলাকায় এক প্রকার স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করতেন। এই ব্যবস্থার ফলে মারাঠা রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীতে সামন্ততন্ত্র পুরােপুরি কায়েম হয়। বলা বাহুল্য এর ফলে মারাঠাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। তাছাড়া এই সব সামরিক নেতার হাতে প্রশাসনিক দায়িত্বও থাকায় সামরিক দক্ষতা হ্রাস পায়।

বালাজী বাজীরাও-এর সময়ে মারাঠা সেনাবাহিনীতে অ-হিন্দ, ভাড়াটে সৈনিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে মারাঠা সেনাবাহিনীর জাতীয় চরিত্র নষ্ট হয়। ফলে তাঁর সময়ে মারাঠা বাহিনী পুরোপুরি আদর্শচ্যুত হয়। এক লক্ষ্য ও স্বার্থের বন্ধনে মারাঠা সৈনিকরা আবদ্ধ ছিল না। তারা উদ্ধত ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মারাঠা সৈন্য ভারতের সর্বত্র ব্রাস ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে মারাঠা নেতারা সেনাবাহিনীর দক্ষতা বাড়ানাের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়ােগ সম্পর্কে পরােপরি উদাসীন ছিলেন। ফলে পরবতী সময়ে তাঁরা যখন ইংরেজ সেনাবাহিনীর সম্মুখীন হন, তখন তাঁরা পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন। তাছাড়া যে অবারােহী বাহিনী ছিল একদা মারাঠাদের গর্বের বস্ত, কালক্রমে তা অবহেলার শিকার হয় ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তারা ক্রমশঃ পদাতিক বাহিনীর উপর অধিকতর নির্ভরশীল। হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে মারাঠা সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় সেনানায়কদের নিযুক্ত করে ও মারাঠা সৈনিকদের ইউরােপীয় প্রশিক্ষণে শিক্ষিত করে তােলার চেষ্টা করে মারাঠারা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন নি। তাদের মনে রাখা উচিত ছিল যে, মারাঠা রণপদ্ধতি ও কৌশল ইউরােপীয় রণকৌশল ও পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছুটা এই কারণেই পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা আবদালীর হাতে পরাজিত হয়।

অষ্টাদশ শতকে মারাঠারা ভারতের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মুঘল সাম্রাজ্যের শূন্য স্থান পূর্ণ করতে পারেন নি। তাদের এই ব্যর্থতার জন্য তারা নিজেরাই অনেকাংশে দায়ী ছিল। তাদের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামাের মাধ্যমে এমন কিছ, মারাত্মক গলদ ছিল কিছুতেই অতিক্রম করতে পারে নি। তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামাে যথেষ্ট দক্ষতা ও মােটের উপর প্রজা হিতৈষণার প্রতীক হলেও তার মধ্যে মৌলিকতার অভাব ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ছিল শিবাজী প্রবতিত মারাঠা আদশ ও ঐতিহ্যের পরিপহী। ফলে তা মঘল ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে নি। রাজনৈতিক দিক থেকে মারাঠাদের সব চেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল একটি সর্বাঙ্গীন ঐক্যের অভাব এবং দুভাগ্যজনকভাবে ক্ষমতার বিভাজন। এই ক্ষমতা বিভাজনের দটি স্তর ছিল। প্রথমে ছত্রপতি ও পেশবার মধ্যে ও পরে পেশা ও তাঁর অনুচরদের মধ্যে। মারাঠাদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী চেতনা ও উচ্চাকাঙ্খরও অভাব ছিল। মুঘলদের সঙ্গে প্রতিরােধে তারা অসাধারণ দঢ়তা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্য সন্টির প্রেরণা ও ঐতিহ্য তাদের ছিল না। 

গেরিলা যুদ্ধে তারা পারদর্শী ছিল। কিন্তু একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে তারা পারে নি। গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর আক্রমণের মােকাবিলা করা যায়। কিন্তু একটি নিয়মিত দক্ষ সেনাবাহিনী ছাড়া সাম্রাজ্য স্থাপন করা সম্ভব নয়। অন্য দিকে মারাঠারা কেবলমাত্র সামরিক বিজয়কেই বড় করে দেখতাে। আর সেই বিজয়ের পিছনে প্রেরণার উৎস ছিল লুঠতরাজ আর চৌথ আদায়। কিন্তু লণ্ঠন আর অত্যাচার কোন সাম্রাজ্যের স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে । পরাজিত অঞ্চলের মানুষের সহানুভূতি আর সমর্থনের কোন তােয়াক্কাই মারাঠারা করতাে না। কেবলমাত্র রাজ্য জয় করেই সাম্রাজ্য স্থাপন করা যায় না। বিজিত এলাকায় নিজেদের প্রাধান্য সদঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে একটা সঞ্জু শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলারও প্রয়ােজন আছে। মারাঠারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণরপে উদাসীন ছিল। বালাজী বাজারাও-এর আমলে হিন্দুপাদ পাদশাহীর নীতির পরিহার হিন্দুদের মধ্যে শুধ, হতাশার সন্টিই করে নি, একটি সুস্পষ্ট মারাঠাবিরােধী মনােভাবও এর ফলে দানা বেধে ওঠে। আসলে মারাঠারা যুদ্ধে জয় করতে পেরেছিল, কিন্তু মানুষের মন জয় করতে পারে নি। ফলে মহারাষ্ট্রের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর বাইরে তাদের সুনাম ছিল না। তাদের অত্যাচার আর লণ্ঠন মানুষের মন বিষিয়ে দিয়েছিল। গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক ও হিন্দু ধর্মের রক্ষক হিসাবে তাদের ভাবমূতি হয়ত ভারতের কিছু মানুষের প্রশংসা পেয়েছিল। কিন্তু এই ধরণের অস্পষ্ট প্রশংসা কোন সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দঢ় করতে পারে না। মারাঠা সাম্রাজ্য ছিল বালির বাঁধের মত। এর অর্থনীতি ছিল দুর্বল। অনুর্বর ও উর্ষর ভূমি থেকে পর্যাপ্ত শস্য উৎপন্ন হতাে না। কৃষির উন্নতির দিকে পেশবাদের নজর থাকলেও তাই উদ্বত্তের পরিমাণ কখনই বেশী হতাে না। কিছুটা এই কারণেই মারাঠারা লঠন বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। যাই হােক অথভাবের জন্য মারাঠাদের পক্ষে কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তােলা একটি অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়।

হিন্দু পাদশাহী আদর্শ স্বরূপ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment