মীরজাফরের পদচ্যুতি (১৭৬০):

মীরজাফরের পদচ্যুতি (১৭৬০):

মীরজাফরের পদচ্যুতি (১৭৬০): প্রধানত নিজেদের ব্যবসার ইংরেজদের কাছে বিকিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সিংহাসনে বসেই তিনি বুঝেছিলেন যে, যত টাকা তিনি ইংরেজদের দেবেন বলে কথা সাথেই ইংরেজরা সিরাজকে বাংলার মনসদ থেকে অপসত করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন যে সিরাজ ক্ষমতায় থাকলে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসার খাতিরেই তাঁরা বাংলা থেকে ফরাসী প্রাধান্য দূর করতে তৎপর ছিলেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করার কোন পরিকল্পনা বা ইচ্ছা তখন তাঁদের ছিল না। বস্তুতঃ প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামাের আওতায় তাদের ব্যবসার যে উন্নতি হচ্ছিল না, তা নয়। কিন্তু সিরাজের নিজ সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে অত্যধিক সচেতনতা তাঁদের নিবি বাণিজ্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেই পলাশীর যুদ্ধের প্রয়ােজন হয়েছিল। মীরজাফরকে তাঁর সিংহাসনে বসিয়েছিলেন এই উদ্দেশ্য নিয়ে যে, তিনি তাঁদের ব্যবসার পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না। মীরজাফরের সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি হয়েছিল তাতে ইংরেজরা নতুন কোন সুযোগ সুবিধা দাবী করেন নি বা কোনভাবে নবাবের ক্ষমতার উপর হস্তক্ষেপ করেন নি। তবে ফরাসীরা যাতে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে তার জন্য মীরজাফরকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল যে, তিনি ফরাসীদের কোন দুর্গ নির্মাণ বরার অনুমতি দেবেন না। কিন্তু মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসাবার পর ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ না করলেও নবাবের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়ােগ করতেই হবে। অন্যদিকে মীরজাফরও অপদার্থ, অযোগ্য ও ব্যক্তিত্বহীন হওয়ায় নিজের অস্তিত্বের জন্য পুরােপুরি ক্লাইভের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন। ফলে নিজের ইচ্ছানুসারে রাজ্য পরিচালনা করার কোন ক্ষমতাই তাঁর ছিল না। আসলে গোড়াতেই তিনি নিজেকে এমন অসহায়ভাবে দিয়েছিলেন, রাজকোষে তত টাকা নেই। শেষ পর্যন্ত অধেক টাকা নগদে দিয়ে এবং বাকী অর্ধেক টাকা তিন বছরে সমান কিস্তিতে শােধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নিষ্কৃতি পান।

নবাব পদে অভিষিক্ত হবার পর মীরজাফরকে তিনটি বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়

(১) মেদিনীপুরে রাজারাম সিংহের বিদ্রোহ

(২) পুর্ণিয়াতে হজর আলি খাঁ ও অচল সিংহের বিদ্রোহ

(৩) পাটনায় রামনারায়ণের বিদ্রোহ। মীরজাফরের সন্দেহ হয় এইসব বিদ্রোহের পিছনে রায়লভের হাত আছে। ক্লাইভ অবশ্য মীরজাফরের ক্ষমতা পাকা করার জন্য মুঘল সম্রাটের অনুমােদন বা ফরমানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যাই হােক শেষ পর্যন্ত ক্লাইভের সাহায্য নিয়ে মীরজাফর মেদিনীপুর ও পণিয়ার বিদ্রোহ দমন করলেন। কিন্তু ক্লাইভের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি রায় দলভ ও রামনারায়ণকে দমন করতে পারলেন না। ক্লাইভ তাঁদের রক্ষা করলেন। মীরজাফর মনে মনে চটলেন, কিন্তু কিছুই করতে না পেরে চুপ করতে বাধ্য হলেন। ক্লাইভের উপর তিনি যে কতটা অসহায়ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন, তা আবার প্রমাণিত হলো শাহ আলমের বাংলা আক্রমণের সময়। সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের হত্যার পর তাঁর পুত্র শাহ আলম দিল্লী থেকে পালিয়ে নিজের ভাগ্য ফেরানাের জন্য বাংলা আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। মীরজাফর চেয়েছিলেন তাঁকে কিছু টাকা দিয়ে নিরস্ত করতে। কিন্তু ক্লাইভ তাঁর বিরােধিতা করে সশস্ত্র প্রতিরােধের নীতি গ্রহণ করলেন। শেষ পর্যন্ত ক্লাইভের কথাই রইলো। শাহ আলম বাংলা ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

মীরজাফরের রাজত্বকালের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য গুরত্বপূর্ণ ঘটনা হলাে ওলন্দাজদের সঙ্গে বিদারার যুদ্ধ। ইংরেজদের মতে মীরজাফর তাঁদের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওলন্দাজদের সঙ্গে চক্রান্ত করে তাঁদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। হলওয়েল, ওয়ারেন হেস্টিংস ও অন্যান্য সমসাময়িক ইংরেজ এবং ম্যালেসন প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে মীরজাফর নাকি গােপনে ওলন্দাজদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার জন্য। উঃ অতুল চন্দ্র রায় সমসাময়িক ও আধুনিক ইংরেজদের এই অভিযোেগ ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করেছেন। তিনি কোট অব ডিরেক্টরসকে লেখা একটি চিঠি উদ্ধত করে দেখিয়েছেন যে ওলন্দাজদের মতিগতি সম্পর্কে মীরজাফর সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ ছিলেন। তাছাড়া ক্লাইভও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন। আসলে মীরজাফরের সঙ্গে ওলন্দাজদের সম্পর্ক কোনদিনই ভাল ছিল না। তবে মীরজাফর যখন ইংরেজদের উদ্ধত আচরণ ও শাসনকাযে হস্তক্ষেপের জন্য অত্যন্ত ক্ষদ্ধ, তখন হয়ত তিনি।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোন বিদেশী শক্তির সহায়তার কথা চিন্তা করে থাকতে পারেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কখনই তিনি তাঁর মনােভাব ওলন্দাজদের কাছে প্রকাশ করেন নি বা তাদের কোন বাড়তি সুযোেগ সবিধা দান করাও চিন্তা করেন নি। নবাবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওলন্দাজদের হয়ত কোন ভ্রান্ত ধারণার সষ্টি হয়ে থাকতে পারে। আসলে মুর্শিদাবাদের ওলন্দাজ প্রতিনিধি বাণেট বাটাভিয়ার ওলন্দাজ কর্তৃপক্ষকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিলেন। যাই হােক বিদারার যুদ্ধে ( ২৫, ১০১৭৫৯) ওলন্দাজরা ইংরেজদের হাতে পরাজিত হয়। কোন কোন ইংরেজ অভিযােগ করেছেন যে, এই যুদ্ধে নবাব ইংরেজদের সহায়তা না করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এই অভিযােগ ভিত্তিহীন, কারণ স্বয়ং ক্লাইভ মীরজাফরের সহযােগিতার কথা স্বীকার করেছেন। বিদারার যুদ্ধের গুরত্ব অনস্বীকার্য। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ওলন্দাজদের উচ্চাকাখার পরিসমাপ্তি ঘটে। এর আগেই ফরাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে গিয়েছিল। সুতরাং বাংলাদেশে ইংরেজদের বাধা দেবার মত কোন বিদেশী শক্তি রইলাে না। ফলে বাংলায় তারা রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

মীরজাফরের পদচ্যুতি (১৭৬০):

১৭৬০ সালের গােড়ায় দুটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা ঘটে। প্রথমটি হলাে ক্লাইভের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন (ফেব্রুয়ারী) ও দ্বিতীয়টি হলাে মীরণের মৃত্যু ( জুলাই)। মীরণের মত্যুতে নবাব ভেঙ্গে পড়লেও প্রথম ঘটনাটি অথাৎ ক্লাইভের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মীরজাফরের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেয়। ক্লাইভের স্থলাভিষিক্ত হন হলওয়েল। শেষ দিকে ক্লাইভ মীরজাফরের উপর বিরক্ত হলেও, যতদিন তিনি ছিলেন মীরজাফরও কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু হলওয়েল মীরজাফরের উপর মােটেই সতুষ্ট ছিলেন না। তবে সেই কারণেই তিনি মীরজাফরকে সিংহাসনচ্যুত করতে চান নি। তিনি মীরজাফরকে সরাবার জন্য কয়েকটি মিথ্যা অভিযোগ বা অজুহাত তৈরী করেছিলেন, যেমন ইংরেজদের বিরুদ্ধে ওলন্দাজদের সঙ্গে চক্রান্ত, শাহ আলমের সঙ্গে পত্রালাপ ইত্যাদি। যাই হােক হলওয়েলের পর ভ্যান্সিটাট কলকাতা কুঠির ভার গ্রহণ করেন। মীরজাফরকে সিংহাসনচ্যুত করার মূল কারণ ছিল কোম্পানীর অর্থের প্রয়ােজন। মীরজাফরের শত চেষ্টা সত্বেও তিনি ইংরেজদের দাবী মেটাতে পারেন নি। আসলে এই দাবী মেটানাে তাঁর পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। তাঁর রাজকোষ শুন্য হয়ে যায়। তাঁর আর্থিক অবস্থা এমন শােচনীয় হয়ে দাঁড়ায় যে, তিনি সৈনিকদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারেন নি। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। অন্যদিকে কোম্পানীও এক চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে মীরজাফরকে সরিয়ে বাংলায় আর একটি রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের কথা ইংরেজরা চিন্তা করতে থাকেন। মীরজাফরের কুশাসনে ইংরেজরা মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু তা সত্বেও তাঁরা এই কারণে মীরজাফরকে সরাতে চান নি। ভ্যাক্সিটাট প্রথমে ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মীরজাফরকেই নবাব পদে বহাল রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যখন ইংরেজরা বুঝলেন যে, নবাবের কাছ থেকে আর অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা সম্ভব নয়, তখন তাঁর মীরজাফরকে মসনদচ্যুত করার কথা চিন্তা করতে বাধ্য হন এবং মীরকাশিমের সঙ্গে কথাবার্তা শুর করেন।

হেষ্টিংস অবশ্য কোন পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন অন্যদিকে হলওয়েল চেয়েছিলেন কোম্পানীই সরাসরি বাংলার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করুক। শেষ পর্যন্ত নবাবের জামাতা মীরকাশিমকেই বাংলার মসনদ প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মীরকাশিম কথা দিলেন যে কোম্পানীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মােচনের জন্য তিনি যথােপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন এবং বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জেলার জমিদারী কোম্পানী ভােগ করতে পারবে। বিনিময়ে কোম্পানী তাঁকে ডেপুটি সবাদার পদে নিয়ােগ করবেন। মীরকাশিমের শত কোম্পানীর পক্ষে খুব সুবিধাজনক ছিল। মীরজাফর কিন্তু মীরকাশিমকে ডেপুটি সুবাদার পদে নিযুক্ত করতে অস্বীকৃত হলেন। শেষ পর্যন্ত মেজর ক্যালিউড নবাবের প্রাসাদ অবরােধ করে মীরজাফরকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেন। সঙ্গে সঙ্গে মীরকাশিমকে বাংলার নবাব বলে ঘােষণা করা হলাে।

১৭৬০ সালে বিনা রক্তপাতে ও উত্তেজনায় বাংলায় আবার রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলো। পলাশীর যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধের মাঝে ১৭৬০ সালের এই নিঃশব্দ বিপ্লব কিছুটা গুরুত্বহীন বলে মনে হয়। বাস্তবিক মীরজাফরের পদচ্যুতির মধ্যে পলাশীর যুদ্ধের নাটকীয়তা নেই। কিন্তু তা সত্বেও এর গুরত্ব উপেক্ষা করা অনুচিত। এই ঘটনা প্রমাণ করলো বাংলার রাজনীতিতে ইংরেজরাই আসল ক্ষমতার অধিকারী। তাঁদের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরই নবাবের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। নিজেদের স্বার্থেই ইংরেজরা মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসিয়েছিলেন, আবার নিজেদের স্বার্থেই তাঁরা তাঁকে হঠিয়ে মীরকাশিমকে ক্ষমতায় বসালেন। মীরজাফরের প্রতি কারও সহানুভূতি নেই বা থাকতে পারে না। কিন্তু তাঁকে যে ভাবে পদচ্যুত করা হলাে তা সমর্থনযোেগ্য নয়। মীরজাফর আগাগোড়াই ইংরেজদের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। রাজ্যশাসনে ক্লাইভের হস্তক্ষেপ পছন্দ না করলেও তিনি তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইংরেজদের প্রতি তিনি কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি। তবুও ইংরেজদের বিরুদ্ধে ওলন্দাজদের সঙ্গে চত্তান্ত ও ষড়যন্ত্র করার বদনাম তাঁর কপালে জুটেছিল। ইংরেজদের প্রতি তাঁর আনুগত্যের প্রমাণ দেবার জন্য তিনি উদগ্রীব ছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের কাছে তাঁর আনুগত্যের চেয়ে অর্থের প্রয়ােজন ছিল অনেক বেশী জরুরী। অতএব তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইংরেজদের বিবেকে বাঁধে নি ।

পলাশী থেকে বক্সার দেওয়ানী সম্পর্কে আমাদের এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment