মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা:

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা:

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা:  শ্রেষ্ঠ কীতি হলাে বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার। মুর্শিদকুলি যখন বাংলায় ক্ষমতা দখল করেন, তখন সমস্ত জমি সরকারী কর্মচারীদের বেতনের বিনিময়ে জায়গির হিসাবে বণ্টন করে দেয়া হয়েছিল। অথাৎ জমি থেকে সরকারের কোন আয় হােত না এবং সরকারী আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাণিজ্য শঙ্ক। এই পরিস্থিতিতে সরকারী আয় বৃদ্ধি করার জন্য মর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় ভূমি-রাজস্ব সংস্কারে মন দেন।

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব সংস্কার সম্পকে পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের হাতে নেই। ঐতিহাসিকেরা প্রধানতঃ সলিম আল্লার তারিখ-ই বাংলা ও জেমস গ্রান্টের Analysis of t!!e Finances of Bengal এই দুই প্রামাণ্য তথ্যের উপর নির্ভর করেন। সলিম আল্ল। পরিবেশিত তথ্যগুলি পন্ট, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে গ্রাট রাজস্ব সংক্রান্ত যে সমস্ত পরিসংখ্যান দিয়েছেন তার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়, কারণ যে সব তথ্যের উপর ভিত্তি করে তিনি এই সংখ্যাগলি উল্লেখ করেছেন, তা সবই হারিয়ে গেছে। আবার সলিম আল্লা ও গ্রান্টের তথ্যের তুলনামূলক আলােচনা করলে দেখা যায় কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবেশিত তথ্যের মধ্যে মিল নেই , অবশ্য এই পার্থক্য খুব একটা বেশী নয়।

স্যার যদুনাথ সরকার মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার বিস্তৃত আলােচনা করেছেন। তাঁর আলােচনা থেকে জানা যায় রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মুর্শিদকুলি খাঁ দুটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রথমতঃ তিনি সমস্ত কর্মচারীর জায়গির বাজেয়াপ্ত করে তা সরাসরি সরকারের নিজস্ব জমি বা খালসায় রপান্তরিত করলেন। বিনিময়ে জায়গিরদারদের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও অনবর উড়িষ্যায় বদলি করা হলাে। দ্বিতীয়তঃ জায়গিরদারদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জমি থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য সেখানে নীলামের ভিত্তিতে ইজারাদারদের একটা চুক্তি পত্রের (security bond) বিনিময়ে নিয়োগ করা হলাে। এই ইজারাদারদের সঙ্গে অন্টাদশ শতকের ফ্রান্সের ফার্মিয়ার্স জেনারেলের তুলনা করা হয়ে থাকে। মুর্শিদকুলি খাঁর এই ব্যবস্থাকে “মালজমিনি” ব্যবস্থা বলা হয়। এর ফলে অবশ্য জমিদারের। তাঁদের জমি হারালেন না। তাঁরা এই নবনিযুক্ত ইজারাদারদের অধীনে রইলেন। আসলে জমিদারেরা অলস, দায়িত্বহীন ও অবিবেচক হওয়ায় এদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা সম্ভব হচ্ছিল না বলেই মুর্শিদকুলি খাঁ এদের মাথার উপর ইজারাদারদে গণপিয়ে দিলেন। কালক্রমে অনেক জমিদার নিশ্চিহ্ন হয়ে যান এবং এই সব নব। ইজারাদারেরাই তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হন। এইভাবেই মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার জমিদারী ব্যবস্থায় একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল করিম স্যার যদুনাথের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো এমন কোন তথ্য আমাদের হাতে নেই যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইংরেজদের মত মুর্শিদকুলিও সবোচ্চ নীলামদারের সঙ্গে জমি বন্দোবস্ত করতেন। তাঁর মতে আখম-ই আলমগিরিতে যে মালজমিনি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ঔরঙ্গজেবের সময়ে অর্থাৎ মুর্শিদকুলির জীবনের প্রথম ভাগ সম্পকে প্রযােজ্য। সলিম আল্লা ও জেমস গ্রান্টের লেখা অনুধাবন করলে পষ্ট বােঝা যায় যে, দীর্ঘদিন বাংলার ভূমি-রাজব ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পরে ১৭২২ সাল নাগাদ মুর্শিদকুলি খাঁ তাঁর নিজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। আবদুল করিমের মতে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় কোন বিরাট পরিবর্তন আনেন নি। মুর্শিদকুলি খাঁর রাজধ ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করে অধ্যাপক করিম বলেন যে, জমির উৎপাদিকা শক্তি ও কৃষকের কর প্রদানের ক্ষমতা ও সাধ্যের কথা চিন্তা করে মুর্শিদকুলি খ ভূমি-রাজস্বের পরিমাণ স্থির করতেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির কথা চিন্তা করলেও তিনি প্রজাদের স্বার্থ ও সযােগ সুবিধার দিকেও নজর রাখতেন।

পর কিছুটা জমি জরিপের ভিত্তিতে ও কিছুটা পুরানাে নথিপত্রের সাহায্যে মুর্শিদকুলি খাঁ অনেকটা নিখতভাবে রাজস্বের পরিমাণ স্থির করেছিলেন। জমিদার ও অমিল উভয়ের সাহায্যেই এই রাজস্ব আদায় করা হতাে। তবে রাজস্ব-আদায়ে কোন শৈথিল্য সহ্য করা হতাে না। জমিদারেরা যদি নিয়মিত ও যথাযথভাবে নির্ধারিত রাজস্ব Rন করতেন, তাহলে তাঁরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারতেন। কিন্তু এর অন্যথা ঘটলে শিদকুলি খাঁর কাছে ক্ষমা ছিল না। এই অপরাধের শাস্তি ছিল খুব কঠোর। সলিম আল্লার মতে এই শাস্তি বর্বরতার নামান্তর ছিল। জমিদারেরা শধে জমিই হারাতেন না, তাঁদের বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হতাে। রাজশাহীর জমিদার উদিত নারায়ণ রাজস্ব দিতে গড়িমসি করায় তাঁর বিরুদ্ধে এক সেনাবাহিনী পাঠানাে হয়। মুর্শিদকুলি খাঁর ভয়ে উদিত নারায়ণ শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন। আবদুল করিমের মতে এই ধরণের ঘটনা মুর্শিদকুলি খাঁর বর্বরতার পরিচয় দেয় না। যাই হােক কর প্রদানে ব্যর্থ জমিদার বা আমিলকে যে তিনি ক্ষমা করলে না, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্ব বিভাগে হিন্দুদের নিয়ােগ করতেন এবং হিন্দু জমিদারদের অধিকতর পছন্দ করতেন, কারণ তাঁরা ঠিকমত ও নিয়মিত প্রতিশ্রত সথ রাজকোষে জমা দিতেন। হিন্দ, জমিদার ছিলেন নম্র, ভীত ও কর্তব্যপরায়ণ। অন্যদিকে মুসলিম জমিদারেরা ছিলেন বাদশাহের জাতি ও দিল্লী দরবারে তাঁদের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। সুতরাং তাঁদের মধ্যে মুর্শিদকুলি খাঁর নির্দেশ অমান্য করার প্রবণতা ছিল অনেক বেশী। মুর্শিদকুলি খাঁর রাজস্ব ব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলাে বছরের শেষে রাজস্ব আদায়ের কাজ সম্পূর্ণ করে হিসাব-নিকাশ চড়ান্ত করার জন্য পণ্য বা পণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়ােজন করা। এই সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য কারণে শস্যহানির পরিপ্রেক্ষিতে খাজনায় ছাড়ের ব্যবস্থা করা হতাে। এ থেকে বােঝা যায় প্রজাদের কাছে থেকে রাজস্ব সব সময়ে কড়ায় ক্লান্তিতে আদায় করা হতাে না এবং জেমস গ্রান্টের তথ্য থেকে জানা যায় যে নির্ধারিত রাজস্বের সবটা কোনদিনই আদায় করা হতাে না। রাজস্বের হারও খুব একটা বেশী ছিল বলে মনে হয় না। সম্ভবতঃ উৎপন্ন শস্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশী কখনও দাবী করা হতাে না। ছাড়া প্রজার বিপদে আপদে সরকারী ঋণ বা তকাভির ব্যবস্থাও ছিল। প্রজাদের মিথের কথা চিন্তা করে যে রাজস্বের হার করা হতাে সে কথা আগেই বলা হয়েছে। সুতরাং মশিদকুলি খাঁ প্রজাপীড়ক ছিলেন এ কথা বলা যুক্তিসঙ্গত হবে না।

রাজস্ব ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মশিদকুলি খাঁ কয়েকটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতার কথা আগেই বলেছি। তবে রাজস্ব আদায়ে কঠোর হলেও রাজস্বের হার নির্ধারণে তিনি কখনই কঠোর ছিলেন না। শাসনতান্ত্রিক সুবিধার জন্য সমস্ত দেশকে তেরটি বিভাগ বা চাকলায় বিভক্ত করা হয় এবং প্রত্যেক চাকলার দায়িত্ব একজন আমিলের হাতে দিয়ে দেয়া হয়। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য মশিদকুলি খাঁ বড় জমিদারী গঠনে যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন। তাঁর আমলে বাংলায় ছ’টি রাজশাহী, দিনাজপুর, নদীয়া, ।

বীরভূম, বিষ্ণুপুর ও বর্ধমান) ও বিহারে , সাহাবাদও টিকারী ) বড় জমিদারী গড়ে উঠেছিল এবং ভূমিরাজস্বের বেশীটাই আসতো এইসব বড় জমিদার থেকে। একা বর্ধমানরাজ যে ভূমিরাজস্ব দিতেন, তা গােটা বিহারের ভূমিরাজস্বের চার ভাগের তিন ভাগের সমান ছিল। বড় বড় জমিদারী গঠনের ফলে রাজস্ব আদায়ের কাজ অনেক সহজ হয়েছিল। কিন্তু বড় জমিদারেরা যাতে অধিক ক্ষমতাশালী না হয়ে উঠতে পারেন, সেদিকেও তাঁর তীক্ষ দৃষ্টি ছিল। যেমন রাজসাহী জমিদারদের উপর কড়া নজর রাখার জন্য এই জমিদারী আটটি চাকলার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ছােট জমিদারী ভেঙ্গে এই ভাবে বড় জমিদারী গঠনের কাজ অবশ্য অসম্পূর্ণ ছিল। ডঃ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহের মতে মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে অসংখ্য ছােট জমিদারির অস্তিত্ব ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক সময় অভিযােগ করা হয় যে বড় জমিদারী গঠন করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় ছোট জমিদারদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। ডঃ সিংহের মতে এই অভিযােগের সত্যতা প্রমাণ করা দুরহ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমিরাজস্ব নীতি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর ভূমিরাজস্ব নীতি সরকার, জমিদার ও প্রজা প্রত্যেকের পক্ষেই লাভজনক হয়েছিল। ১৬৫৮ সালে শাহ সুজার আমলে রাজবের পরিমাণ যা ছিল, মুর্শিদকুলি খাঁ তার উপর শতকরা সাড়ে তের ভাগ রাজধ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাজস্বের হার খুব একটা বেশী না হওয়ায় মনে হয় এই বর্ধিত আয়ের জন্য প্রধানতঃ দায়ী ছিল কৃষির প্রসার। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে দেশে শান্তি, ও শঙখলা বিরাজ করতাে বলে কৃষকদের নিরাপত্তা বজায় ছিল এবং চাষবাসেরও যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছিল। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটেছিল। স্যার যদুনাথের মতে দেশে শান্তি বিরাজ করার ফলে লোকের কর প্রদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ও তাঁর রাজত্বের শেষ দশ বছরে রাজস্বের পরিমাণ বদ্ধির জন্য তাঁর অত্যাচারী নীতিকে কোনক্রমেই দায়ী করা চলে না। আয় বদ্ধির আর একটি কারণ ছিল প্রশাসনিক ব্যয় সংক্ষেপ। নানা খাতে খরচ কমিয়ে ও খুঁটিনাটি প্রতিটি জিনিসের উপর কড়া নজর রেখে মুর্শিদকুলি খাঁ প্রশাসনিক দক্ষতার এক চমকপ্রদ নজির তুলে ধরেছিলেন। যে কঠোরতা ও দৃঢ়তার সাহায্যে তিনি ভূমি রাজস্ব আদায় করতেন, তার তুলনা মেলা ভার। কিন্তু কঠোরতা বা কড়াকড়ি থাকলেও প্রতারণা ও দ-নীতির সুযােগ খুব একটা ছিল না।

মুর্শিদকুলি খাঁর বিরুদ্ধে অনেক সময় অভিযােগ করা হয় যে, তিনি জমিদা উপর অত্যাচার চালাতেন ও তাঁর সময়ে বহ, জমিদারীর অবলুপ্তি ঘটে। তাঁর বির আরও অভিযোগ করা হয় যে, তাঁর রাজনীতির ফলে বাংলার জমিদারী ব্যবস্থা দুবেল হয়ে পড়ে। তিনি যে কঠোরতার সঙ্গে জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন, তারও তীব্র সমালােচনা করা হয়েছে। জমিদারের উপর সবাদারী আবওয়াব বা স্থায়ী আর্থিক কর তিনিই প্রথম চাপিয়ে দেন। আগে”সবাদারেরা জমিদারের কাছ থেকে নজরানা বা উপহার গ্রহণ করতেন। জমিদারদের রাজস্ব আদায় করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির ক্ষতিপূরণ হিসাবে এবং তাঁদের ভরণ পােষণের জন্য জমি বা নানকরের ব্যবস্থা করা হয়। পরে নানকরের সঙ্গে যুক্ত হয় বনকর (বনে কাঠ সংগ্রহের অধিকার। ও জলকর ( নদী, খাল, বিলের উপর অধিকার)।

এই সব অভিযােগের অধিকাংশই ভিত্তিহীন বলে আধুনিক ঐচ্ছািসিকেরা মনে করেন। তাঁদের মতে ছােট বড় সমস্ত জমিদারকেই মুর্শিদকুলি খাঁ স্বপদে বহাল রেখেছিলেন। সলিম আল্লার মতে নির্ভরযােগ্য বিশ্বাসভাজন ও অনগত সমস্ত জমিদারকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে এটা হতে পারে বা হওয়া স্বাভাবিক যে, জমিদারেরা মশিদকুলি খাঁর ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং রাজস্ব আদায়ের পারিশ্রমিক স্বরপ ভরণ পােষণ ভাতা ( subsistence allowance ) গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এসবই করতে হয়েছিল রাষ্ট্রের স্বার্থে ও কাঁর ব্যয় সংক্ষেপ নীতির অঙ্গ হিসাবে। আসলে মশিদকুলি খাঁ নিজে জমিদারী সম্পত্তিকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়ােগের ক্ষেত্র বলে মনে করতেন ও সেই কারণে দৌহিত্র করাজের জন্য একটি জমিদারীও কিনেছিলেন। সুতরাং জমিদারী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করা বা দুর্বল করাকে তিনি অবিবেচকের কাজ বলে মনে করতেন এবং এই ধরণের কোন উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। ভূমিরাজস্ব আদায়ে মশিদকুলি কঠোর নীতি হণ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু রাজস্বের পরিমাণ কখনই দবহ ছিল না। জমিদারদের উপর সুবেদারী আবওয়াব মশিদকুলি খাঁ প্রথম চাপিয়েছিলেন, এ কথা সত্য। কিন্তু এর পরিমাণ ছিল নগণ্য—মাত্র ২,৫৮,৮৫৭ টাকা। পরবর্তী নবাবদের আমলে এর পরিণ অবশ্য অনেক বেড়েছিল। সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় এই নতুন করের বােঝাও জমিদারদের খুব একটা গায়ে লাগতাে না। মনে রাখতে হবে জমিদারেরা নিজেরাই রায়তদের উপর অতিরিক্ত করভার চাপিয়ে সবাদারী বেওয়াব বসানোর রাস্তা খুলে দিয়েছিলেন। তাছাড়া জমিদারেরা এই আবওয়াবের বোঝা রায়তদের ঘাড়ে চালান করে দিতেন। সুবাদারী আবওয়াবের হার ছিল নির্ধারিত জমা বা দেয় অর্থের পরিমাণের তেত্রিশ শতাংশ। কিন্তু জমিদারের প্রজাদের কাছ থেকে শতকরা ৫০ ভাগ হারে তা আদায় করতেন। সুতরাং সুবাদারী আবওয়াব জমিদারদের লাভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা:

আসলে মুর্শিদকুলির আমলে জমিদারী ব্যবস্থা দুর্বল হবার পরিবতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জমিদার তাঁর দেনা পাওনা মিটিয়ে দিলে সরকারের কিছু করার থাকতাে না। অবশ্য জমিদারেরা চোর ডাকাতকে আশ্রয় দিলে বা বিদ্রোহ করলে তাঁদের জমি বাজেয়াপ্ত করা হতো। যাই হােক মুর্শিদকুলি খাঁ যে বাংলার জমিদারী ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে চেয়েছিলেন তার প্রমাণ বড় বড় জমিদারী গঠনে তাঁর উৎসাহ দান। তাঁর ধারণা ছিল বড় বড় জরিদারীর সাহায্যে রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনা করা অনেক সহজ হবে। কিন্তু বড় জমিদারী গঠনে তাঁর প্রচেষ্টা যে আংশিকভাবে সাফল্য লাভ করেছিল, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। বড় বড় জমিদারেরা যাতে অধিক ক্ষমতাশালী না হয়ে উঠতে পারে সেদিকে তিনি নজর দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্বেও এই সব জমিদারেরা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। বস্তুতঃ মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে কয়েকটি জমিদারী পরিবারের উল্লেখযােগ্য শ্রীবদ্ধি ঘটে। যে সব নতুন জমিদার তাঁর সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তার মধ্যে রঘুনন্দনের নাম খুব উল্লেখযােগ্য। রাজস্ব বিষয়ে তিনি নবাবের বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁরই পরামর্শ ও উৎসাহে তিনি কতকগুলি ছােট জমিদারী মিলিয়ে রাজশাহী জমিদারী গঠন করেন। তাঁর ভাই রামজীবন ছিলেন

নাটোর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। নাটোর অচিরেই বর্ধমানের সমকক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। রঘুনন্দনের বিশ্বস্ত অনুচর দয়ারাম রায় দীঘাপতিয়া (রাজশাহী) রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা পরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, সুসঙ্গ, বীরভূম, বিষ্ণুপুর প্রভৃতির জমিদারগণ অবশ্য মুর্শিদকুলি খাঁর আগে থেকেই বিখ্যাত ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে ১৬ জন খুব বড় জমিদার ছিলেন এবং ৬১৫ টি পরগণা থেকে তাঁরই খাজনা আদায় করতেন। কিছু কিছু ছােট জমিদারীর ধংস তাঁর আমলে ঘটলেও ছােট জমিদারীর সংখ্যা এই সময় মােটেই কম ছিল না। মােট ১০৪৫ টি পরগণা অসংখ্য ছােট জমিদারীতে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই ছিল ৪১৮ জন জমিদার। মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামে এই সংখ্যা ছিল আরও বেশী—যথাক্রমে ৩,০০০ ও ১৫০০। সুতরাং মুর্শিদকুলির আমলে বাংলার জমিদারী ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছিল বললে তা সত্যের অপলাপ হবে।

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনকে কি ভাবে প্রভাবিত করেছিল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্যার যদুনাথ বলেছেন—“Bengal was at last freed from the double set of leeches who had been sucking the people, one the temporary governor bent solely upon making his own pile before being transferred form Bengal and the other the diwan loyally trying to collect the revenue to the last pice.” fpoo তা সত্বেও সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টের অবধি ছিল না। এটা ঠিক যে, মুর্শিদকুলির সময় জিনিসপত্রের দাম খুব কম ছিল। তখন চালের দাম ছিল টাকায় ৪ মন। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম খুব কম ছিল বলেই যে লােকে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতাে, তা নয়। আসলে বাংলাদেশ থেকে অপরিমিত অর্থ দিল্লীর সম্রাটের কাছে পাঠানাে হতাে বলে দেশের মধ্যে অর্থের গুরতর ঘাটতি ছিল এবং দেশে মারাত্মক মদ্রাহ্ৰাসজনিত (deflation) পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। ফলে লােকের ক্রয়ক্ষমতা গুরুতরভাবে হ্রাস পায়। এক কথায় লােকের হাতে তখন টাকা ছিল না। ফলে জিনিসপত্রের দাম কম থাকলেও সাধারণ লােকের অবস্থার উন্নতি হয় নি। যাই হােক কৃষি ও কৃষকদের অবস্থার উন্নতির জন্য মুর্শিদকুলি খাঁর সহৃদয় দৃষ্টি ছিল। রাজস্বের বোঝা যাতে কৃষকদের কাছে দুর্বহ না হয় তার জন্য তিনি ভূমিরাজস্বের হার স্থির করার আগে জমি জরিপ করাতেন এবং জমির উৎপাদিকা শক্তি ও প্রজাদের করপ্রদান করার ক্ষমতা বিবেচনা করে দেখতেন। সলিম আল্লার বিবরণ থেকে জানা যায় যে, জমিদার ও আমিলদের অত্যাচারের হাত থেকে প্রজাদের বাঁচানাের জন্য তিনি সব সময়েই চেষ্টা করতেন। কৃষি ঋণ বা তকাভি দিয়ে রায়তদের দুদিনে তাদের পাশে দাঁড়াতেন এবং নানাভাবে সাহায্য করতেন। এক কথায় প্রজাদের স্বার্থ ও মঙ্গলের দিকে তিনি সব সময়েই লক্ষ্য রাখতেন। দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত থাকায় কৃষির উৎপাদন বেড়েছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে একমাত্র ১৭১১ সাল ছাড়া আর কখনও দুভিক্ষ ১৭১১ সালের দুর্ভিক্ষও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে হয় নি।

অত্যাচার করতেন না, তা নয়। এই অত্যাচার মফঃস্বল অঞ্চলেই বেশী মাত্রায় হতাে। জন শােরের মতে জমিদারের অজ্ঞতা ও অক্ষমতাই ছিল এই ধরণের অত্যাচারের কারণ এবং বড় বড় জমিদারেরাই এ ব্যাপারে বেশী দায়ী ছিলেন। ছােট জমিদার ও তালুকদারেরা এই ধরণের অপরাধ থেকে অনেকাংশে মত ছিলেন। তাঁরা নিজেদের জমিদারী সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন। জমিদারদের অত্যাচার অবশ্য পরবর্তীকালে আরও বেড়ে গিয়েছিল।

মুর্শিদকুলি খাঁ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ এর সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment