সুজাউদ্দীন (১৭২৭-২৯):

সুজাউদ্দীন (১৭২৭-২৯):

সুজাউদ্দীন (১৭২৭-২৯): মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দীন বাংলার মসনদে আরােহণ করেন। একদিকে মুর্শিদকুলি খাঁ ও অন্যদিকে আলীবদী খাঁ এই দুই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও দক্ষ শাসকের মধ্যে সুজাউদ্দীনের শাসন অনেকাংশে মলিন ও নিষ্প্রভ বলে মনে হয়। কিন্তু অনেকে তার শাসনকাল গৱত্বহীন বলে মনে করলেও সিয়ার উল-মুতাখরিন রচয়িতা গােলাম হসেন তার রাজত্বকালকে শান্তি ও সমদ্ধির যুগ বলে উচ্চ প্রশংসা করেছেন। স্যার জন শােরও তার সুরে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন। শাসক হিসাবে অবশ্য সুজা অযােগ্য বা অপদার্থ ছিলেন না। তবে মুর্শিদকলি খাঁ বাংলার শাসনব্যবস্থায় যে শক্তিশালী ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, তার কার্যকারিতা তাঁর সময়ে অক্ষয় ছিল এবং তাঁর পক্ষে আর নতুন করে করার খুব একটা কিছু ছিল না। তা সত্বেও তিনি প্রশাসনিক কাঠামােকে জোরদার করার জন্য মর্শিদকুলি খাঁর নীতি অনুসরণ করে নিজ আত্মীয় বন্ধুদের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিজ পত্র সরফরাজ খাঁ ছিলেন বাংলার দেওয়ান। সরফরাজের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা মহম্মদ তকি খাঁ ছিলেন উড়িষ্যার নায়েব সুবাদার! জামাতা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁকে দেয়া হয় ঢাকার নায়েব সুবাদারী। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সমস্ত রাজ্যকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়

(১) পশ্চিমবঙ্গ মধ্যবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় বিভাগ

(২) পববঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম নিয়ে ঢাকা বিভাগ

(৩) বিহার ও উড়িষ্যা! শাসনকার্যে তিনি উদার নীতি অনুসরণ করতেন।

জমিদারদের প্রতি কঠোরতা পরিত্যাগ করে তিনি তাদের দেয় বাকী রাজস্ব কিস্তিতে শােধ করার সুযোেগ দিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মত তিনিও দিল্লীতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত অর্থ প্রেরণ করে সম্রাটকে সন্তুষ্ট করলেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনীতে আরও সৈন্য নিয়ােগ করে তিনি দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করলেন। এই সব কার্যকলাপ তাঁর শাসন দক্ষতার সাক্ষ্য দেয়।

সুজাউদ্দীন (১৭২৭-২৯):

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রগতির দিক থেকেও তার শাসনকাল স্মরণীয়। মুর্শিদকুলি খাঁর নীতি অনুসরণ করে তিনিও হিন্দুদের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। রাজবল্লভ, জয়ন্ত রায়, বসন্ত রায় প্রভৃতি হিন্দ, কর্মচারী তার সময়ে প্রভাবশালী ছিলেন। সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতি তার সময়ে অক্ষম ছিল। সুজাউদ্দীন আড়ম্বরপ্রিয় ও সৌন্দর্যবিলাসী ছিলেন বলে বহ, সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করতেন না। বিদেশী বণিকদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যকলাপ ও সমদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তােলে। বাংলাদেশ ছিল বণিকদের বর্ণভূমি। কিন্তু বিদেশী বণিকেরা, বিশেষতঃ ইংরেজরা, যাতে বেশী বাড়াবাড়ি করতে না পারে সেদিকেও তাঁর নজর ছিল। সাধারণভাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল। মুর্শিদকুলির চেয়েও তিনি বেশী টাকা দিল্লীতে পাঠাতেন। জগৎ শেঠ পরিবারের অর্থনৈতিক সমদ্ধি তার সময়েই চরম অবস্থায় পৌঁছায়। জিনিসপত্রের দামও মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ের চেয়ে কম ছিল। চালের দাম টাকা প্রতি চার মন থেকে কমে দাঁড়ায় আট মনে।

তবে গােলাম হসেন ও জন শশারের উচ্চ প্রশংসার মধ্যে অতিশয়ােক্তি আছে। বস্তুতঃ শাসক ও রাজনীতিবিদ হিসাবে সুজাউদ্দীন কোন উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেন নি। বরং রাজত্বের শেষ দিকে তিনি বিলাস ও আমােদে দিন অতিবাহিত করতে থাকেন। ফলে শাসনকার্যে অবহেলা দেখা দেয়। দেওয়ান হাজী আহম্মদ ( আলীবদীর ভাই), রায় রায়ান আমিন চাঁদ ও মহাজন জগৎ শেঠের হাতে রাজ্যের দায়িত্বভার অর্পণ করে তিনি বিলাসে গা ভাসিয়ে দেন। এরাও নবাবের দুর্বলতার সুযােগ গ্রহণ করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির দিকে নজর দেন। স্বাভাবিক ভাবেই দুনীতি ও কশাসনে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। জমিদারদের প্রতি

উদার আচরণের ফলে তারা প্রজাপীড়ক হয়ে ওঠেন। তার সময়ে সুবাদারী আবওয়াব এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ও এই করের বােঝা যথারীতি প্রজাদের কাঁধে চালান করে দেয়া হয়। অন্যদিকে মুর্শিদকুলি খাঁ যেমন বিদেশী বণিকদের প্রতি অ্যথা কঠোর আচরণ করতেন না এবং তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের দিকে নজর রাখতেন, সুজাউদ্দীনের সেই দরদষ্টি ছিল না। অনেক সময় ইংরেজ বণিকদের প্রতি তাঁর আচরণ অত্যাচারের নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ইংরেজ বণিকেরা অনেক সময় তার উপর অসন্তুষ্ট হয়। এই ধরণের ঘটনা দেশের স্বার্থের পরে যথেষ্ট ক্ষতিকারক ছিল।

অন্যান্য বণিক সংস্থা ও মুর্শিদকুলি খাঁ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো

Leave a Comment