হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শের স্বরূপ:

হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শের স্বরূপ:

হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শের স্বরূপ: মুঘল সামাজ্যের পতনের যােগে ভারতে হিন্দ, পুনরভ্যুত্থান ও হিন্দ, সামাজ্যের পুনঃ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন পেশব প্রথম বাজীরাও। দরদশী ও সুযােগসন্ধানী বাজীরাও বুঝেছিলেন মুঘল সামাজ্যের ধংস আসন্ন। তাই তিনি ছত্রপতি শাহকে বলেছিলে হিন্দুদের দেশ থেকে বিদেশীদের বিতাড়িত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আমরা প্রথমে শীণ মুঘল বক্ষকাণ্ডে আঘাত করবাে। গাছের ডালগলি তখন নিজে থেকেই খসে পড়বে। তারপর মারাঠা জাতির বিজয় পতাকা কৃষ্ণা নদীর তীর থেকে আকট পর্যন্ত সমগ্র এলাকায় শোভা পাবে।” শাহ, তাঁর এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে অনুমােদন করেছিলেন। হিন্দপদ পাদশাহীর আদশে মারাঠা নেতাদের উজ্জীবিত করে বাজীরাও তাঁর সাম্রাজ্যবাদী নীতির সূত্রপাত করেছিলেন।

হিন্দপাদ-পদশাহীর স্বপ্ন অবশ্য তিনিই প্রথমে দেখেন নি। আসলে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজী তাঁর গর, রামদাসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং এক ধর্মরাজ্যপাশে সমগ্র ভারত-ভূখণ্ডকে বেধে দেবার মহান উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মহারাষ্ট্রের বা দাক্ষিণাত্যের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে তিনি এই আদর্শকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চান নি। তাঁর দুটি ছিল সদরপ্রসারী। কিন্তু শিবাজীর পক্ষে এই মহান লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব ছিল না। মারাঠা শক্তি তখনও শৈশব অবস্থায় এবং মারাঠা প্রাধান্য তখন এক সঙ্কীর্ণ এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

শিবাজী যদি আরও কিছুকাল বাঁচতেন, ত’হলে হয়ত তাঁর এই স্বপ্ন সফল হতাে। শিবাজীর মৃত্যুর পর পরিস্থিতির বিরাট পরিবর্তন ঘটে এবং নর্মদা অতিক্রম করে মারাঠা প্রভাব উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে মুঘল সাম্রাজ্য তখন মুমুর্ষ। এই যােগেই বাজীরাও শিবাজীর অসম্পূর্ণ স্বপ্নকে সম্পূর্ণ করতে ব্রতী হন। তবে শিবাজীর সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য ছিল। শিবাজী হিন্দ সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখলেও মারাঠা জাতির প্রতি তার এক ধরণের দুর্বলতা ও অনুভূতি ছিল, যা তাঁর ধর্মীয় চেতনা ও অনুভূরি সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর কাছে মারাঠা জাতিসত্তার স্থান ছিল সবার উপরে। অন্যদিকে বাজীরাও মহারাষ্ট্রের বাহিরের হিন্দুদের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। কেবলমাত্র মারাঠা জাতিসত্তার উপর গুরুত্ব আরােপ না করে তিনি উত্তর ও মধ্য ভারতের হিন্দুদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। সমগ্র ভারতের হিন্দুরা বাজীরাওকে তাদের পরিত্রাতা ও নেতার মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করে নি। ফলে অকুণ্ঠিত চিত্তে নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করেও হিন্দ, রাজারা তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। জয়পুরের রাজা জয় সিং সােয়াই তাঁকে পর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। নন্দলাল মান্দলই-এর মত প্রভাবশালী সঙ্গে  জমিদাররাও তাঁর ছিলেন ।

হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শের স্বরূপ:

হিন্দু ধর্মের প্রতি বাজীরাও-এর এই অবিচল নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা তাঁর বিজয় অভিযানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর প্রতিটি যুদ্ধে অভিযানের সঙ্গে ধর্মীয় ভাব জড়িয়ে ছিল। মালব অভিযানে তিনি হিন্দুদের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করেছিলেন। শিদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের কারণ ছিল হিন্দ, মন্দির ধংসের প্রতিশােধ গ্রহণ করা। পর্তুগীজদের বিরদ্ধে সংঘর্ষের অন্যতম লক্ষ্য ছিল হিন্দুধর্ম রক্ষা করা। কোন হিন্দ, রাজা ও প্রধান বিপন্ন বোধ করলে তাঁরা তাঁর কাছেই সাহায্যের জন্য আবেদন জানাতেন। ফরক্কাবাদের পাঠান নবাবের আক্রমণে ভীত বন্দেলা নেতা ছত্রশাল আত্মরক্ষার জন্য তাঁর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। লক্ষ্য করার বিষয় বাজীরাও হিন্দুদের সমর্থন ও সহানুভূতি লাভ করলেও ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁর ছিল না।

পত্র বালাজী বাজীরাও ব্রাহ্মণ ও হিন্দ; হিসাবে বাজীরাও-এর চেয়ে অনেক নিষ্ঠাবান ছিলেন। কিন্তু হিন্দু ধর্মের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে মারাঠা সাম্রাজ্যবাদী আদর্শ তিনি বড় করে দেখতেন। পিতার রাজনৈতিক দরদর্শিতা তাঁর ছিল না। তিনি সম্পণ জ্ঞাতসারে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দপাদ-পদশাহীর আদশ পরিত্যাগ করে মারাঠাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন করেন। তিনি যে রাজ্যজয় নীতি অনুসরণ করেছিলেন, তা হিন্দুদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল না। রাজ্যজয়ের মাধ্যমে তিনি অর্থ উপার্জন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের সম্পদ যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করে রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করার পরিবর্তে অত্যাচার ও লণ্ঠনের সহজ পথ বেছে নিয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁর এই নীতির শিকার হয়। কিন্তু হিন্দুদের প্রতি তাঁর এই অত্যাচারী নীতির স্কুলে হিন্দুরা তাঁর প্রতি বিরুপ হয় ও মারাঠাদের প্রতি তাঁদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে থাকে। হিন্দ, রাজা ও শাসকদের প্রতি তাঁর আচরণ কেমন ছিল তা একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই যথেষ্ট হবে।

জয়পুরের রাজা জয় সিং সােয়াই-এর সঙ্গে তিনি এক সাক্ষাৎকারে মিলিত হন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল টাকা আদায় করা। তাঁর এই রাঢ় ব্যবহার ও আচরণের জন্যই রাজপুত, জাঠ ও শিখেরা মারাঠাদের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। বালাজী বাজীরাও অবশ্য মৌখিক ভাবে হিন্দু ধর্মের রক্ষক বলে সব সময়েই দাবী করতেন। তিনি ব্রাহ্মণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁদের নানাভাবে অর্থ সাহায্য করতেন। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে হিন্দ, মৈত্রীর মুল্য তিনি উপলব্ধি করতে পারেন নি। হিন্দু রাজাদের সামরিক সহায়তার চাইতে তাঁদের অর্থের প্রতি তাঁর লধ দণ্টি ছিল। অথলােভ ও মারাঠাদের মধ্যে রেষারেষি ও অন্তদ্বন্দ্ব এমন এক ঘণ্য পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় যে, পেশবা শুধ, হিন্দপাদ-পাদশাহী নীতি থেকেই বিচ্যুত হন নি, তিনি নাগপুরের মারাঠা নায়ক রঘুজী ভোঁসলের বিরুদ্ধে বাংলার নবাব আলিবদী খাঁকে সাহায্য করতেও কুণ্ঠিত হন নি। রঘজী ভোঁসলের সঙ্গে পেশবার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল ছিল না। ঐতিহাসিক সুরেন্দ্রনাথ সেন পেশবার এই নীতির তীব্র সমালােচনা করে বলেছেন-“The moral effect of fighting a Maratha sardar, while employed in a Muhammadan province, was simply disastrous.

বালাজী বাজীরাও-এর হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শ বিসর্জনের প্রভাব মারাঠা সেনাবাহিনীর মধ্যেও পড়ে ছিল। শিবাজীর সময়ে মারাঠা সেনাবাহিনীতে মারাঠা সৈনিকদের নির্ভর করলেও শিবাজীর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন নি। কিন্তু বালাজী বাজীরাওএর সময় এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাড়াটে সৈন্য জোগাড় করে মারাঠা বাহিনীতে স্থান দেন। হিন্দু মুসলমান এমন কি কিছু, পর্তুগীজ সেনাও মারাঠা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে মারাঠা সেনাবাহিনীর জাতীয় চরিত্র বিনষ্ট হয়। যে আদর্শবাদ ও মারাঠাদের জাতীয় স্বার্থ সেনাবাহিনীর প্রেরণার উৎস ছিল, বালাজী বজীরাও-এর আমলে তা ক্রমশঃ হারিয়ে যেতে থাকে। মারাঠা সেনাবাহিনী সর্বত্র ত্রাস ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মারাঠা সেনাবাহিনীর অত্যাচার হিন্দ, জনসাধারণের মনে এক বিরপে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পেশবাদের শাসনাধীন মারাঠা জাতির ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যাবে হিন্দপাদ-পাদশাহী বা সাম্রাজ্যবাদের আদর্শ একমাত্র বাজীরাও-এর সময় ছাড়া আর প্রাধান্য ছিল।

কখনই মারাঠাদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত বা উদ্বুদ্ধ করতে পারে নি। বালাজী বাজীরাও এই আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরুপে সরে গিয়েছিলেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পর হিন্দােদ-পাদশাহীর কথা একেবারেই শোনা যায় নি। আসলে মাধব রাও-এর মৃত্যুর পর থেকেই পেশবাদের মর্যাদাহানি ঘটায় ও মারাঠাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশিত হওয়ায় শিবাজী বা বাজীরাও-এর আদর্শের আবেদন মারাঠাদের কাছে পুরােপুরি নষ্ট হয়ে যায়। পেশবাদের প্রতি আনুগত্যের অভাবে মারাঠা ঐক্য বিপন্ন হয় ও মারাঠা সর্দারের যে যার খুশী মত ক্ষমতা বিস্তার করতে থাকে। একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শের অনুপস্থিতিতে হিন্দােদপাদশাহীর আবেদন সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যায়। ব্যক্তিস্বার্থ ও তাৎক্ষণিক লাভই জাতীয় স্বার্থ ও আদর্শের উপরে স্থান পায়। আসলে হিন্দপাদ-পাদশাহী আদর্শ রূপায়ণে সাধারণ ভাবে মারাঠাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। এর আবেদন বা আদর্শবাদ কোন বাস্তব রূপ নেয় নি। বাজীরাও-এর প্রচেষ্টার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন ফাঁক ছিল না। কিন্তু যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, ততদিনই এর প্রভাব অক্ষর ছিল। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এর আদর্শ ক্রমশঃ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

পেশা মাধব রাও এ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment