ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দারের সাফল্য ও টিপুর ব্যর্থতার কারণ:

ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দারের সাফল্য ও টিপুর ব্যর্থতার কারণ: অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে-ইঙ্গ-মহীশর সম্পর্ক পর্যালােচনা করলে দেখা যায় হায়দার  আলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে সাফল্য অর্জন করলেও তাঁর পুত্র টিপু, সুলতান ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত মহীশরের পতন ঘটে। মহীশরের এই পতনের জন্য অনেকেই টিপু, সুলতানকে দায়ী করেছেন। ঐতিহাসিক উইলকস (Wilks) এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন যে হায়দার  জন্মেছিলেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে আর টিপু, তা ধংস করতে।

“Haritar was born to create an empire, Tipu to lose one.” অবশ্য টিপু, যে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছিলেন এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই। কিন্তু তিনি যে শেষপর্যন্ত মহীশরের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন নি, সে কথা ঠিক। তবে মহীশরের পতনের জন্য তাঁর দায়িত্ব কতটুকু তা চুলচেরা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে ।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দরের সাফল্য ও টিপুর ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করার সময় উভয়ের সমকালীন পারিপার্বিক অবস্থা, সামরিক শক্তির তারতম্য, উভয়ের ব্যক্তিগত দটিভঙ্গী ও নীতি প্রভৃতির কথা মনে রাখতে হবে। এ কথা ভুললে চলবে না যে টিপু যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তার সঙ্গে হায়দরের সমকালীন পরিস্থিতির অনেক পার্থক্য ছিল।

প্রথম ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধের পর থেকেই ইংরেজদের বিশবাসঘাতকতা ও কথায় খেলাপের জন্য হায়দার  তীব্রভাবে ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। এবং তার পর থেকে টিপু সুলতানের মত্যু পর্যন্ত মহীশরের বৈদেশিক নীতি ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দরের সাফল্য ও টিপুরে ব্যর্থতার কারণ-অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে-ইঙ্গ-মহীশর সম্পর্ক পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, হায়দার  আলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে সাফল্য অর্জন করলেও তাঁর পুত্র টিপু সুলতান ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত মহীশরের পতন ঘটে।

মহীশরের এই পতনের জন্য অনেকেই টিপু সুলতানকে দায়ী করেছেন। ঐতিহাসিক উইলকস (Wilks) এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন যে হায়দার  জন্মেছিলেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে আর টিপু, তা ধ্বংস করতে। “laidar was born to create an empire, , Tipu to lose one.” অবশ্য টিপু যে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছিলেন এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই।

কিন্তু তিনি যে শেষপর্যন্ত মহীশরের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন নি, সে কথা ঠিক। তবে মহীশরের পতনের জন্য তাঁর দায়িত্ব কতটুকু তা চুলচেরা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দরের সাফল্য ও টিপুর ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করার সময় উভয়ের সমকালীন পারিপাবিক অবস্থা, সামরিক শক্তির তারতম্য, উভয়ের ব্যক্তিগত দুটিভঙ্গি ও নীতি প্রভৃতির কথা মনে রাখতে হবে। এ কথা ভুললে চলবে না যে টিপু যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তার সঙ্গে হায়দারের সমকালীন পরিস্থিতির অনেক পার্থক্য ছিল।

গোড়ার কথাই ছিল ইংরেজদের বিরােধিতা করা ও টিপু, দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইংরেজরাই তাদের প্রধান শর্ত। ইংরেজরাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, হায়দার  ও টিপুর মহীশরই দাক্ষিণাত্যে তাদের সব চেয়ে বড় শত্র। সুতরাং দাক্ষিণাত্যে রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উভয়েই যে পর্ণ শক্তি নিয়ে অবতীর্ণ হবে, তা ছিল স্বতঃসিদ্ধ।

কিন্তু রণকৌশল ও সামরিক দক্ষতায় ইউরোপীয় সেনাবহিনী যে দেশীয় সেনাবাহিনীর তুলনায় অনেক উন্নত, সে কথা বারংবার প্রমাণিত হয়েছিল। এই দিকে দিয়ে বিচার করলে মহীশরের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং হায়দার  জীবিত থাকলেও মহাশরের পতন বােধহয় আটকাতে পারতেন না। তথাপি প্রথম দিকে ইংরেজদের বিরদ্ধে তাঁর সাফল্যের কয়েকটি কারণ ছিল।

  • প্রথমতঃ তাঁকে লড়তে হয়েছিল কেবলমাত্র ব্রিটিশ ইট-ইণ্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে, যার ক্ষমতা ও সঙ্গতি ছিল সীমিত। মাদ্রাজ কাউন্সিল দক্ষতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে নি। তাদের অনেক সিদ্ধান্তই ছিল ভুল।
  • দ্বিতীয়তঃ হায়দারের নীতি ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময়ে ইংরেজদের একঘরে করা। শুধু তাই নয়, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় তিনি মারাঠা অথবা নিজাম কিংবা মারাঠা ও নিজাম উভয়ের সাহায্য পেয়েছিলেন। মিত্র হিসাবে নিজাম বা মারাঠা কেউই যে নিভরযােগ্য ও আস্থাভাজন নয়, তা তিনি জানতেন। তথাপি তিনি তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে এদের সঙ্গে হাত মেলাতে দ্বিধা করতেন না।
  • তৃতীয়তঃ তাঁর শক্তির প্রধান উৎস ছিল তাঁর ক্ষিপ্রগতিবিশিষ্ট অশারােহী বাহিনী। এই ব্যাপারে ইংরেজরা তাঁর সমকক্ষ ছিল না। যােদ্ধা হিসাবে তিনি হয়ত টিপুর চেয়ে বড় ছিলেন। কিন্তু তাঁর সামরিক প্রতিভা যে খুব একটা উচ্চাঙ্গের ছিল, তা কিন্তু নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অনেক সময়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কখনও মনােবল হারান নি। সংগঠক হিসাবে তিনি ছিলেন যথেষ্ট উচু দরের। যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার দিক দিয়েও তিনি দক্ষতার পরিচয় রেখেছিলেন। তাছাড়া সংখ্যাগত বিচারে তাঁর সেনাবাহিনী ইংরেজদের তুলনায় বেশী ছিল এবং তাঁর সৌভাগ্য যে, প্রথম ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধে মিথ ছাড়া অন্য কোন সুদক্ষ ব্রিটিশ সেনানায়কের সঙ্গে তাঁকে মােকাবিলা করতে হয় নি।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দারের সাফল্য ও টিপুর ব্যর্থতার কারণ:

নিজ সেনাবহিনীকে দক্ষ ও ইংরেজদের সমকক্ষ করে তােলার জন্য তিনি ইউরােপীয় প্রশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। সুতরাং ইংরেজদের সঙ্গে সমান ভাবে পাল্লা দেবার যােগ্যতা তাঁর ছিল।টিপু যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল। ১৭৮৪ সালের আগে পর্যন্ত কোম্পানীর সংগঠন ছিল খুব দুর্বল।

কিন্তু ১৭৮৪ সালের পিটের ভারত আইন ও অন্যান্য পরিপূরক আইনের ফলে অবস্থার উল্লেখযােগ্য রপান্তর ঘটে। ইতিপর্বে গভর্ণর জেনারেল তাঁর কাউন্সিলের উপর অসহায়ভাবে নিভরশীল ছিলেন। কিন্তু ১৭৮৪ সালের আইনের ফলে তাঁর ক্ষমতা যথেষ্ট বদ্ধি পায়। গভর্ণর জেনারেলের হাতে চড়ান্ত সামরিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়

এবং বােবই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীকে যুদ্ধ, শান্তি, দেশীয় রাজ্যগুলির সহিত যােগাযােগ ইত্যাদি ব্যাপারে তাঁর পুরােপুরি কর্তৃত্বাধীনে আনা হয়। এই সমস্ত পরিবর্তনের ফলে কণওয়ালিস ও ওয়েলেসলি ওয়ারেন হেস্টিংশের তুলনায় অনেক স্বাধীনভাবে ও জোরের সঙ্গে টিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে ১৭৮৪ সালের আগে পর্যন্ত কোম্পানীর কার্যকলাপে ব্রিটিশ সরকার কদাচিৎ হস্তক্ষেপ করতেন।

১৭৮৪ সালের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহ ও উৎসাহ দেখাতে থাকে এবং কোম্পানী যাতে ভারতে তার সম্প্রসারণ নীতি নিবিয়ে অনুসরণ করতে পারে, তার জন্য তৎপর হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজদের ব্যর্থতা যাতে ভারতে কিছুটা পুষিয়ে নেয়া যায়, সেদিকে ব্রিটিশ সরকার নজর দেয়। এই অবস্থায় টিপুকে শুধুমাত্র কোম্পানীর বিরুদ্ধেই নয়, কোম্পানী ও ব্রিটিশ সরকারের মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়। ফলে তাঁকে হায়দারের তুলনায় অনেক বেশী জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

টিপুর ব্যথতার জন্য তাঁর নিজের দায়িত্বও কিছু কম ছিল না। কুটনীতিবিদ হিসাবে তিনি তাঁর পিতার সমকক্ষ ছিলেন না। তাঁর ঔদ্ধত্য ও অত্যধিক আত্মনিভরশীলতা মহীশরের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল । হায়দারের নীতি ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে মারাঠা ও নিজামের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া অথবা তাদের নিরপেক্ষ রাখা।

টিপু এই নীতি থেকে পুরােপুরি বিচ্যুত হন। ফলে তাঁকে ইংরেজ, নিজাম ও মারাঠা এই তিন শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। মহিবুল হাসানের মতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে টিপুর পরাজয়ের এটাই ছিল মূল কারণ। আর এক দিক থেকেও টিপু, কিছুটা অবিবেচকের মত কাজ করেন।

ফরাসীদের মৈত্রীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল না। হায়দার  ফরাসী মৈত্রীর উপর নিভর করে হতাশ হয়েছিলেন। তা সত্বেও টিপু, ফরাসীদের উপর নির্ভর করেছিলেন। অথচ তিনি ফরাসীদের কাছ থেকে কোনদিনই কোন সক্রিয় সাহায্য পান নি।

কিন্তু ফরাসীদের সঙ্গে তাঁর এই দহরম মহরমের ফলে ইংরেজরা তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হয় ও তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার এক চমৎকার অজুহাত খুজে পায়। টিপুর এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা মহীশরের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। অন্যদিকে ভাগ্যও কিছুটা হায়দারের সহায়ক ছিল। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ ও প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ প্রায় একই সময়ে সংগঠিত হওয়ায় ইংরেজরা সেই সময় প্রচণ্ড অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল।

১৭৮২ সালে সলবইয়ের চুক্তিতে প্রথম ইঙ্গমারাঠা যুদ্ধের অবসান হওয়ায় ইংরেজরা অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ও প্রায় ২০ বছর যাবৎ ইংরেজ ও মারাঠাদের মধ্যে শান্তি বজায় থাকে। ফলে টিপু যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ইঙ্গ-মারাঠা সম্পর্ক ভাল ছিল এবং ইংরেজরা কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দরের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর দক্ষ অশ্বারোহী বাহিনী।

মহীশরের অবারােহী সৈন্য মাদ্রাজের ত্রাসের কারণ ছিল। কিন্তু টিপু, তাঁর অবারােহী বাহিনীকে অবহেলা করে ভুল করেছিলেন। ১৭৮০ সালে হায়দরের অবারােহী ও পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৪,ooo ও ১৫,ooo। দশ বছরের মধ্যে টিপু, তাঁর পদাতিক সৈন্যসংখ্যা তিন গুণেরও বেশী বাড়ান (৫০,০০০)। কিন্তু অশ্বারােহী সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে করা হয় ২০,ooo। পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে বা তার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

Leave a Comment