ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক হায়দার আলী ও টিপু সুলতান:

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক হায়দার আলী ও টিপু সুলতান:

হায়দার আলির অভ্যুত্থানের পটভূমি ও গুরুত্ব ও অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে নিজ প্রাধান্য বিস্তার করতে তৎপর ছিল। তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে কণটিকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফরাসীরা অবশ্য ইংরেজদের কাছে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিল এবং করমণ্ডল উপকূলে ইংরেজদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ফরাসীরা হীনবল হলেও তখন যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। ইংরেজরা স্বাভাবিক ভাবেই ফরাসীদের প্রভাব প্রতিপত্তি বদ্ধি সুনজরে দেখতাে না। দেশীয় শক্তিগুলির দুর্বলতা ইংরেজদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙখার জন্ম দিলেও তারা জানতাে দাক্ষিণাত্যের অনিশ্চিত পরিবেশে হিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজ মােটেই সহজসাধ্য নয়। নিজামের সামরিক শক্তিকে তারা ভয় পেত না। কিন্তু মারাঠা শক্তিকে তার সমীহ করতাে।

মারাঠা মহীশূর হায়দর আলির অভুত্থান দক্ষিণ ভারতের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তােলে। ঐ সময়ে দাক্ষিণাত্যের রাজনীতি ছিল খুবই অনিশ্চিত ও অস্থির। হায়দ্রবাদের নিজাম স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করলেও তাঁর অবস্থা ছিল খুব করণ। তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ছিল। কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার ক্ষমতা ও মনােবল ছিল না। তিনি ছিলেন একান্তভাবেই অসহায় এবং রাজ্য বিস্তার করা দূরে থাক, নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতেও তিনি ছিলেন অক্ষম। ফলে পরের উপর নির্ভর করা ছাড়া তাঁর গত্যন্তর ছিল না। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাব ছিল। তাঁর অব্যবস্থিত চিত্ত দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছিল। নিজামের দুর্বলতার পরিপূর্ণ সুযােগ নিয়েছিল মারাঠারা। তারা প্রধানতঃ উত্তর ভারতের দিকেই তাদের সাম্রাজ্যবাদী দষ্টি নিক্ষেপ করলেও নিজামের দুর্বলতা দাক্ষিণাত্যেও তাদের উচ্চাকাঙ্খ বাড়িয়ে তুলেছিল। নিজামের পক্ষে মারাঠা আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না।

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক হায়দার আলী ও টিপু সুলতান:

ইংরেজ ও ফরাসীরা দাক্ষিণাত্যের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজ শক্তিকে ঠেকানাের জন্য নিজামের মিত্ৰতা তাদের কাম্য ছিল। কিন্তু নিজামের অব্যবস্থিত চিত্ত ও খামখেয়ালী মনােভাব তাদের চিন্তার কারণ ছিল। মিত্র হিসাবে নিজাম কোনদিনই নির্ভরযােগ্য ছিলেন না। তবে মারাঠাদের সঙ্গে নিজামের শত্রতা ইংরেজদের ভরসার কারণ ছিল। অন্যদিকে মারাঠারা শক্তিশালী হলেও তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও উত্তর ভারতে তাদের উচ্চাকাঙ্খা ইংরেজদের কিছুটা নিশ্চিন্ত করেছিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক প্রাধান্যের প্রশ্নে যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তাতে ইংরেজরাই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। কিন্তু মহীশরে হায়দর আলি ও টিপ, সুলতানের অভ্যুত্থানের ফলে এই সব রাজনৈতিক অঙ্ক বেশ কিছুটা উল্টে পাল্টে যায়।

মহীশরের অভুত্থান নিজাম, মারাঠা ও ইংরেজ কেউই সনজরে দেখেনি। আসলে হায়দর আলির ক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চতুর্থ শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে। হায়দরের অভ্যুত্থান নিজামের চিন্তার কারণ হলেও এককভাবে তাঁর পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে মহীশুরের সঙ্গে মারাঠাদের সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। সুতরাং মারাঠাদের সঙ্গে নিজামের বৈরী সম্পর্ক থাকলেও উভয়ের একই প্রতিদ্বন্দ্বী মহীশরের বিরুদ্ধে তাদের সঙ্ঘবদ্ধ হবার সম্ভাবনা ছিল। ইংরেজদের পক্ষেও হায়দরের উচ্চাকাঙ্খা আশঙ্কা ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ হায়দর যা চাইছিলেন, ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল ঠিক তাইঅর্থাৎ দাক্ষিণাত্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল।

অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দাক্ষিণাত্যের ভবিষ্যতকে কেন্দ্র করে ইংরেজ, মহীশর, মারাঠা ও নিজামএই চার শক্তির মধ্যে জোরদার প্রতিযােগিতা চলতে থাকে। নানা ঘাত প্রতিঘাত ও কূটনৈতিক চাল ও ছলাকলা এই সময়ের দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষে রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের এই প্রশ্নের অবশ্য মীমাংসা হয়ে যায়। দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের কাজ অনেকটা এগিয়ে যায়। নিজাম কোনদিনই ইংরেজদের সামনে কোন বড় ধরণের সমস্যা সণ্টি করেন নি। বরং মাঝে মাঝে ইংরেজ পক্ষ ত্যাগ করলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ইংরেজদেরই লেজুড়ে পর্যবসিত হন। মারাঠা নেতারা উত্তর ভারতের দিকেই নজর দেয়ায় ও প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে থাকায়, তারাও দাক্ষিণাত্যের রাজনীতি থেকে নিজেদের অনেকটা গুটিয়ে নেয়। সবশেষে অবিরত ও আপােষহীন সংগ্রাম করতে করতে মহীশরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসার এর সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment