ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক:

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক:

ইঙ্গ-মহীশর সম্পর্ক: প্রথম ইজ মহীশর যম (১৭৬৭-৬৯) দাক্ষিণাত্যে রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মহীশরের অভ্যুত্থান মারাঠা বা নিজামের ইংরেজরাও সুনজরে দেখে নি। তবে এ কথা ঠিক নয় যে, হায়দর গোড়া থেকেই ইংরেজ বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু প্রধানত দুটি কারণে ইংরেজরা হাদরের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রথমতঃ ফরাসীদের সঙ্গে হায়দরের হৃদ্যতা ইংরেজদের মনপত ছিল না। তৃতীয় কণটিক যুদ্ধের সময় হায়দর ফরাসীদের ৪০০০ ঘােড় সওয়ার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু এই সাহায্যদানের পিছনে হায়দরের সক্রিয় ইংরেজ বিরােধিতার কোন ভূমিকা ছিল না। আসলে তিনি ফরাসীদের সাহায্য করেছিলেন এই কারণে যে, তার মহীশরে ক্ষমতা দখলের সময় ফরাসীরা তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। এক কথায় কৃতজ্ঞতাবােধই তাঁকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসীদের সাহায্য করতে প্রশ্মেদিত করেছিল। তাছাড়া তিনি আশা করেছিলেন যে, ফরাসীরা এই যুদ্ধে জয়লাভ করলে তিনি ত্রিচিনাপল্লী, মাদরা, তিনেভেল্লী প্রভৃতি স্থান দখল করতে সক্ষম হবেন। হায়দরের রাজসভায় ফরাসীদের প্রভাব প্রতিপত্তি বন্ধি ইংরেজদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মাদ্রাজের ইংরেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাল না হলেও, বােম্বাই এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষা করার পক্ষপাতী ছিল, কারণ তিনি তাদের গােলমরিচ কেনার পুরাে অধিকার দিয়ে তাদের কৃতজ্ঞতা আদায় করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত ইংরেজদের সাহায্যপট কণটিকের নবাব মহম্মদ আলির সঙ্গে হায়দরের কোন সম্ভব ছিল না। তিনি মহম্মদ আলির জ্যে ভ্রাতা ও পরম শত্র, সাহফুজ খাঁকে আশ্রয় দান করেছিলেন। তাছাড়া তিনি মহম্মদ আলির প্রতিদ্বন্দ্বী চাঁদ সাহেবের পুত্র রাজা সাহেবকে তাঁর অধীনে চাকরি দেন। সবশেষে দিগিল, কারর, পালনী, পাল্লাপট্টি প্রভৃতি স্থানের অধিকার নিয়েও মহীশুরের সঙ্গে কণাটকের বিরােধ ছিল। ইংরেজরা তাদের মিত্র মহম্মদ আলির প্রতি হায়দরের এই ধরণের আচরণে অসন্তুষ্ট ছিল। অন্যদিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দারেরও কিছু গুরুতর অভিযোগ ছিল। ভেলােরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সমাবেশ তাঁর বিরক্তি উদ্রেক করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও হায়দর ইংরেজদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইংরেজদের জানিয়েছিলেন যে, যদি তাঁরা উভয়ে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ হন, তাহলে মারাঠা বা মঘল কেউই তাদের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু ইংরেজরা তাঁর এই কথায় খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারে নি।

১৭৬৬ সালেহায়দারের বিরুদ্ধে নিজামের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এই ঘটনায় হায়দর অত্যন্ত ক্ষদ্ধ হন। এই ভাবে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূত্রপাত হয় নিজাম ও ইংরেজদের মিলিত বাহিনী মহীশর অভিমুখে রওনা হয়। নিজামের মিত্র মাধব রাও আগে থেকেই মহীশরে লটপাট শর, করেছিলেন। ত্রি-শক্তির একত্র আক্ৰমণ সত্ত্বেও কিন্তু হায়দর মনােবল হারান নি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ত্রি-শক্তির মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে তাদের দুর্বল করা। তিনি নিজামের মন জয় করার জন্য কয়েকটি হাতী ও নানা উপঢৌকন সহ মাহফুজ খাঁকে তার কাছে পাঠালেন। কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে হায়দর এইভাবে খামখেয়ালী নিজামকে মহীশরের শত্র থেকে মিত্রে পরিণত করলেন। এদিকে মাধব রাও হায়দরের সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে মহীশর ছেড়ে চলে গেলেন। ফলে ইংরেজরা পুরােপুরি মিত্রহীন হয়ে পড়ে। আসলে হায়দরক একঘর করতে গিয়ে ইংরেজরা নিজেরাই একঘরে হয়ে যায় ও নিজাম-মহীশর জোটের সম্মুখীন হয়। মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষের কূটনৈতিক তৎপরতা সম্পর্ণেরপে ব্যর্থ হয়। কিন্তু নিজাম ও হায়দরের মিলিত বাহিনী চঙ্গমের যুদ্ধে স্মিথের হাতে পরাজিত হয়। তবে এই যুদ্ধে ইংরেজরা নামে মাত্র বিজয়ী হয়।

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক:

ডঃ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহের মতে—“The battle of Changama was a very indecisive fight.” (P : 72 ) PICTEA য ত্রিনোমালিতেও ইংরেজরা জয়লাভ করে। পর পর দুটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খামখেয়ালী নিজাম হায়দরকে পরিত্যাগ করেন। আসলে হায়দ্রাবাদ মহীশর মৈত্রীর ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল এবং পর পর যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে স্বাভাবিক ভাবেই উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর অবসান ঘটে। ১৭৬৮ সালের মার্চ মাসে নিজাম ইংরেজদের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। তিনি হায়দরকে একজন দেশদ্রোহী ও বলপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই অবস্থায় হায়দর একাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান। কিন্তু ১৭৬৭-৬৮ সালে পর পর চারটি যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারলেন না। তবে স্মিথের সঙ্গে এটে উঠতে না পারলেও অন্যান্য ইংরেজ সেনানায়কেরা তাঁর সামনে দাঁড়াতে সক্ষম হন নি। যাই হােক তিনি দুতবেগে মাদ্রাজ অভিমুখে রওনা হন। মাদ্রাজের পতন আসন্ন দেখে ভীত সন্ত্রস্ত ইংরেজরা ১৭৬৯ সালে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তিতে স্থির হয় পরস্পর পরস্পরের বিজিত স্থান প্রত্যর্পণ করবে। তাছাড়া তৃতীয় কোন শক্তির দ্বারা কেউ আক্রান্ত হলে অপর শক্তি তাঁকে সাহায্য করবে।

প্রথম ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধ এক প্রকার অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়। কোন পক্ষেরই কোন লাভ বা ক্ষতি হয় নি। হায়দর সম্ভাব্য মারাঠা আক্রমণের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সক্রিয় সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেলেও, সেই প্রতিশ্রুতির মল্য কতটুক, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। প্রথম ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধে শেষপর্যন্ত হায়দর নিজ মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে সফল হন। ইংরেজরা ভয়ে তাঁর সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ডঃ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহের মতে—“The Anglo-Mysore war of 1767-69.is interesting as it was the first war in which the British government finished by suing an Indian power for peace.” (P; 91) এর ফলে হায়দরের মনােবল ও আত্মনির্ভর ‘; শক্তি যথেষ্ট বুদ্ধি পায়। হেভাবে চতুর্দিক শত্রর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে তিনি ত্রি-শক্তিতে ভাঙন ধরিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মােকাবিলা করার পরিকল্পনা করেছিলেন তা উচ্চ প্রশংসার দাবী রাখে। বস্তুতঃ মারাঠারা ও নিজাম যদি । তাঁর সঙ্গে সক্রিয় সহযােগিতা করতেন, তাহলে হয়ত ইংরেজদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াতে। অন্যদিকে এই যুদ্ধে ইংরেজদের খ্যাতি ও মর্যাদায় প্রচণ্ড আঘাত হানে। কোট অফ ডিরেক্টরসের আত্মসমালোচনায় এই যুদ্ধের ব্যথতার জন্য আক্ষেপ করা হয়েছে। কোটের মতে কোম্পানীর সাথ ও প্রভাব প্রতিপত্তি এর আগে কখনও এমনভাবে ক্ষম হয় নি। “The company’s interest and influence in India have suttered such diminution and discredit that the most consummate abilities, persevering assiduity, unstaken fidelity and intrepid courage in our future servants, may perhaps be proved insufficient in many years to restore the English East India company to a proper degree of credit and dignity in the eyes of the nations and inhabitants o Indostan,” ইংরেজরা যে যথেষ্ট যোগ্যতা ও তৎপরতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা কতে পারেনি, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই যুদ্ধে তাদের কোন লাভ হয় নি

হায়দারের বিরষে ইংরেজদের এই ব্যর্থতা আপাত দৃষ্টিতে বিস্ময়কর বলে মনে হতে পারে। শলা, নিয়মানুবর্তিতা, রণকৌশল, ক্ষিপ্রতা প্রভৃতির বিচারে ইংরেজ নােবাহিনীর দক্ষতা যে দেশীয় সেনাবাহিনীর তুলনায় অনেক বেশী, সে কথা অতীতে, বারংবার প্রমাণিত হয়েছিল। এই সব কারণেই সংখ্যাগত বিচারে দেশীয় সেনাবাহিনী ইংরেজদের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্র সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। কিন্তু হায়দর আলির ক্ষেত্রে ইংরেজদের ব্যর্থতার কারণ কি? আসলে বিচক্ষণ হায়দর ঝেতে পেরেছিলেন যে ইংরেজদের সঙ্গে যুঝতে হলে সেনাবাহিনীকে ইউরােপীয় কায়দায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে নিজ সেনাবাহিনীকে শিক্ষিত রার জন্য তিনি ইউরােপীয় প্রশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। তাছাড়া হায়দর নিজেও, সেনানায়ক হিসাবে ছিলেন খুব উচু দরের। স্মিথের সঙ্গে তিনি যুদ্ধে সুবিধা করতে পারেন নি। কিন্তু উড, ল্যাঙ্গ প্রভৃতি ইংরেজ সেনাপতিরা তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। তার সাফল্যের আর একটি কারণ ছিল তাঁর দ্রতগামী অববাহিনী। এই দিক দিয়ে ইংরেজরা তাঁর থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। বস্তুতঃ হায়দরের সেনাবাহিনীর গরি কাছে ইংরেজরা অসহায় হয়ে পড়েছিল। সর্বোপরি মাদ্রাজ কাউন্সিলের অপদার্থতার জন্য ইংরেজদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। স্মিথ অভিযােগ করেছিলেন যে, জনৈক ফরাসী রণনায়কের পরামর্শ অনুসারে মাদ্রাজ কাউন্সিল মহীশর জয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে মাদ্রাজ কাউন্সিলের মতান্তর হওয়ায় মাদ্রাজ কাউন্সিল মিথকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় উডকে যুদ্ধের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এতে হায়দরেরই সুবিধা হয়। তাছাড়া অর্থাভাবও ইংরেজদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যাহত করেছিল।

হায়দারের অভ্যন্তরের কারণ :

Leave a Comment