টিপু সুলতানের তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:

টিপু সুলতানের তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:

টিপু সুলতান: তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধ ও ম্যাঙ্গালােরের চুক্তিতে ইঙ্গমহীশর দ্বন্দ্বের কোন নিষ্পত্তি না হওয়ায় ইংরেজদের সঙ্গে টিপুর পুনর্বার সংঘর্ষ মােটেই অস্বাভাবিক ছিল না। অনেকটা উত্তরাধিকারী সত্ৰেই টিপর মধ্যে ইংরেজ বিরােধী মনােভাবের জন্ম হয়েছিল। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সময় থেকেই হায়দর আলি প্রচণ্ডভাবে ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। অথবা বলা যেতে পারে ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতকতা, দায়িত্বহীন আচরণ ও অমিত্ৰসলভ মনােভাব তাঁকে ইংরেজদের আপসহীন শত্ৰতে পরিণত করে। টিপার সময়েও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। তাঁর পক্ষেও ইংরেজদের বিরোধিতা করা ছাড়া অন্য কোন পথ খােলা ছিল না। দক্ষিণ ভারতে ইংরেজরা মহীশরকেই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করতাে। ম্যাঙ্গালােরের চুক্তি স্বাক্ষর করার পরই তারা টিপুর বিরুদ্ধে নিজাম ও মারাঠাদের সঙ্গে চক্রান্ত করতে তৎপর হয়। আসলে ইংরেজদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টিপরে ধ্বংসসাধন। ১৭৯৮ সালে মনরো স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন—“our first care ought to be directed to the total subversion of Tipoo.” অন্যদিকে টিপুর পক্ষেও ইংরেজদের পদানত হয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী ছিল।

টিপুর ধংসসাধনের জন্য কেবল ইংরেজরাই আগ্রহী ছিল না; নিজামও মারাঠারাও তাঁর প্রতি শত্র,ভাবাপন্ন ছিলেন। তাঁরা টিপর শক্তিবধিতে ভীত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন। হায়দর ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজাম ও মারাঠাদের সাহায্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এবং কূটনীতির সাহায্যে নিজাম ও মারাঠাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ইংরেজদের বাধা দান করতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু নিজামের ব্যক্তিত্বের অভাব ছিল ও মতিস্থির ছিল । অন্যদিকে মারাঠারাও নিজেদের স্বার্থে হায়দবের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হলেও, তারা কখনই মহীশরের অভ্যুত্থান পছন্দ করতাে না। ১৭৮০ সালে তারা কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত দেশগুলিতে হায়দরের সার্বভৌম ক্ষমতা মেনে নিলেও তাদের মধ্যে সততার অভাব ছিল। ১৭৮২ সালে হায়দরের মৃত্যু না হলে হয়ত তিনি আবার মারাঠাদের হাতে আক্রান্ত হতেন। বস্তুতঃ তাঁর জীবদ্দশাতেই মারাঠারা ইংরেজদের সঙ্গে যৌথভাবে মহীশর আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু নিজেদের মধ্যে গােলমাল থাকায় তখন তারা কিছু করতে পারেনি। টিপ ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা টিপরে বিরােধিত্য শুরু করে। টিপ মারাঠাদের সঙ্গে কোন বিরােধের পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু মারাঠারা তাঁর আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করুক। অথবা হায়দরের অধিকৃত স্থানগুলি মারাঠারা দাবী করুকএটা তিনি কখনই চাইতেন । কূটনৈতিক চালে টিপ অবশ্য হায়দরের মত নিপুণ ছিলেন না।

১৭৮৪ সালে তিনি ইংরেজের সাথে ম্যাঙ্গালােরের চুক্তি স্বাক্ষর করায় নানা তার উপর চটে যান। আসলে নানা ভেবেছিলেন ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে মহীশর আক্রমণ কবে কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত জেলাগুলি পনরধিকার করবেন। তাছাড়া টিপ, যেভাবে সলবই-এর চুক্তির (১৭৮২ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির দ্বারা প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের অবসান হয়েছিল।) প্রকাশ্যে বিরােধিতা করে ও মারাঠাদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইংরেজদের সঙ্গে ম্যাঙ্গালােরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, তাতে নানা কিছুটা অপমানিত বােধ করেছিলেন। সুতরাং যখন তিনি দেখলেন যে, দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসানের পরও টিপ এক বিশাল রাজ্য, সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী ও পরিপূর্ণ রাজকোষের অধিকারী এবং টিপুর মর্যাদা অশ্লন, তখন তিনি নিজামের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে তাঁর রাজ্য আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। নিজাম নানার প্রস্তাবে সানন্দে সায় দেন, কারণ মহীশরের শক্তিবন্ধি তাঁরও স্বার্থের প্রতিকুল ছিল। এই অবস্থায় টিপ নারগণ্ড আক্রমণ করায় মারাঠা ও নিজামের সাথে তাঁর সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। নারগণ্ডের শাসকের সঙ্গে মারাঠাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই হায়দর নারগণ্ড অধিকার করলেও ও নানা নারগণ্ডের উপর হায়দরের সার্বভৌম ক্ষমতা মেনে নিলেও নারগণ্ডের শাসক পেশাকেই তাঁর প্রভু বলে মনে করতেন। এই কারণে টিপ নারগণ্ডের শাসকের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। টিপ নারগণ্ড অধিকার করার পর নানা নিজামের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে মহীশর আক্রমণ করেন (১৭৮৬) এবং বাদামী অধিকার করেন। তবে টিপ নিজামের সবচেয়ে দভেদ্য দুর্গ আদোনী দখল কবেন এবং বিনা প্রতিরােধে সাভারে প্রবেশ করেন। কিন্তু এই সব সাফল্য সত্ত্বেও টিপ মারাঠাদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর ভয় ছিল ইংরেজরা হয়ত এই শক্তি সঙ্ঘে যােগদান করতে পারে।

টিপু সুলতানের তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:

১৭৮৭ সালে তিনি মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধ মিটিয়ে নেন ও তাদের নারগুণ্ড, কিট্টর ও বাদামী ফিরিয়ে দেন। বলা বাহুল্য এই চুক্তিতে ম্য রাঠাদেরই লাভ হয়েছিল। যুদ্ধে পরাজিত হওয়া সত্বেও তারা সুবিধাজনক শত আদায় করতে পেরেছিল। অন্যদিকে টিপ না পেলেন কোন ক্ষতিপূরণ, না পারলেন তার রাজ্যসীমা বাড়াতে। উল্টে মারাঠাদের তিনি তিনটি জায়গা ও প্রভূত অর্থ ছাড়াও নিজামকে রায়চর ও আদোনি দিতে বাধ্য হলেন। প্রকৃত পক্ষে ১৭৮৭ সালের চুক্তিতে টিপ, যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই কারণে টিপর জীবনীকার মহিবুল হাসান মন্তব্য PACK-“Although Tipu won the war, he lost the peace” (M. Hassan ; History of Tipu Sultan : p: 108 ) আসলে মারাঠাদের প্রতি এতটা উদারতার একটাই কারণ ছিল। টিপ জানতেন ইংরেজরাই তাঁর সবচেয়ে বড় শত্র, ও মারাঠাদেরও তিনি তাই বােঝাতে চেয়েছিলেন। কোন এক সময়ে তিনি মারাঠা নেতা হরিপঙ্খ ফাদকেকে বলেছিলেন-“আপনাদের বােঝা উচিত আমি আপনাদের শত্র, নই। আপনাদের প্রকৃত শত্র, হচ্ছে ইংরেজরা। তাদের সম্পকে আপনাদের সাবধান হওয়া উচিত। কিন্তু মারাঠারা তাঁর কথায় গুরুত্ব দেয় নি। বস্তুতঃ মারাঠা নেতারা যদি টিপার কথা শুনতেন ও নিজেদের দলাদলি ভুলে গিয়ে সবাই একত্র হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতেন, তাহলে হয়ত ভারত ইতিহাসের গতি অন্য খাতে প্রবাহিত হতাে। কর্ণওয়ালিসের গতিবিধি টিপরে ভালাে লাগে নি।

মারাঠা ও নিজামের মৈত্রী অর্জন করার জন্য বেপরােয়া হয়ে গিয়েছিলেন। তবে ভাগ্যের বিষয় তাঁর এই উদারতার কোন দাম মারাঠারা দেয় নি ১৭৮৫-৮৭ সালের মারাঠা মহীশর যুদ্ধের সময় টিপ, যে ভাবে মারাঠাদের সঙ্গে যে কোন শর্তে সন্ধি স্থাপন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন, তা থেকে প্রমাণিত হয়েছিল যে, তিনি ইংরেজদেরই সবচেয়ে বড় শত্র, বলে মনে করতেন। বস্তুতঃ ম্যাঙ্গালােরের চুক্তি স্বাক্ষর করার পর থেকেই ইংরেজরা নানাভাবে তাঁর সঙ্গে অভদ্র আচরণ করছিলেন। অস্থায়ী গভর্ণর জেনারেল ম্যাকফারসন নিজেও ইংরেজদের এই সব অভদ্র আচরণ সমর্থন করেন নি। ইংরেজরা দিগিল লঠ করে ও বিভিন্ন জেলা থেকে বেআইনীভাবে জোরজবস্তি করে টাকা আদায় করতে থাকে। এমন কি তারা টিপর বিরদ্ধে তাঁর প্রজাদের বিদ্রোহ করতে উস্কানি জোগায় এবং বিদ্রোহীদের নিজ এলাকায় আশ্রয় প্রদান কবে। কর্ণওয়ালিস ভারতে এসেই বুঝেছিলেন দক্ষিণ ভারতে দেশীয় শক্তিগুলির মধ্যে মহীশরই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক। সুতরাং টিপর ধংসের জন্য তিনি ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি ইংরেজদের সেনাবাহিনী ও অর্থনীতিকে জোরদার করে তােলার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। সেই সঙ্গে তিনি মারাঠা ও নিজামের মৈত্রীর জন্য কথাবাতা শর, করেন। এদিকে টিপও ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতির অঙ্গ হিসাবে ফরাসীদের কাছে সাহায্যপ্রাথী হন। তিনি ১৭৮৪ ও ১৭৮৫ সালে কন্সট্যান্টিনােপলে দত প্রেরণ করেন ও১৭৮৫ সালে ফ্রান্সের রাজা ষােড়শ লুই-এর কাছেও সাহায্যের জন্য দত প্রেরণ করেন। কিন্তু তাঁর এই দৌত্য খুব একটা সফল হয় নি। তিনি ফরাসী সরকারের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ সাহায্যের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই আদায় করতে পারলেন না। কিন্তু ফরাসীদের সঙ্গে তাঁর এই ঘনিষ্ঠতায় ইংরেজরা স্বাভাবিক ভাবেই খুশী হলাে না। টিপার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটলো।

অবশেষে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ ত্বরান্বিত হলাে কর্ণওয়ালিসের কূটনৈতিক চাতুর্যে। তিনি বালাসৎ জঙ্গের মত্যুর পর নিজামের কাছ থেকে গটুরের প্রত্যার্তন দাবী করেন। নিজাম ইংরেজদের এই দাবী মেনে নেন। কিন্তু ১৭৬৮ সালের মালিপত্তমের চুক্তির শতনিসারে তিনি মহীশূরের কাছ থেকে বালাঘাট দখলের জন্য ইংরেজদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। বালাঘাটের উপর মহীশরের অধিকার ইংরেজরা প্রথমে ১৭৬৯ সালে ও পরে ১৭৮৪ সালে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু কর্ণওয়ালিস ১৭৬৮ সালের মাসলিপত্তমের চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজামকে কথা দেন যে, বালাঘাট ইংরেজদের হাতে এলে তা তিনি নিজামের হাতে সমপণ করবেন। তিনি নিজামকে সাহায্য করার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতিশ্রুতিও দিলেন। তবে এই সেনাবাহিনী ইংরেজদের কোন বন্ধ শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না বলে নিজামকে জানিয়ে দেয়া হ’ল। সেই সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজদের মিত্র রাষ্ট্রের নামের তালিকাও তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হ’ল। কিন্তু সেই তালিকায় টিপুর নাম না থাকায় তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে ইংরেজরা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর। এইভাবে পরােক্ষভাবে কণওয়ালিস টিপকে যুদ্ধ ঘােষণা করতে বাধ্য করলেন। কর্ণওয়ালিসের এই ছলনা ও কপটতা অধিকাংশ ঐতিহাসিকই সমর্থন করতে পারেন নি। স্যার জন ম্যালকমের মতে কর্ণওয়ালিসের আচরণ কেবলমাত্র মহীশুরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতারই নামান্তর ছিল না ।

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো:

Leave a Comment