দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ :

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ :

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধ : প্রথম ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধের অবসানে হায়দর ইংরেজদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তার অন্যতম শর্ত ছিল যদি হায়দর অথবা ইংরেজ তৃতীয় কোন শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে একে অপরকে সাহায্য করবে। হায়দরের পক্ষে এই শত ছিল খুবই গুরুত্বপর্ণ, কারণ তিনি জানতেন মারাঠারা তাঁর রাজ্য আবার আক্রমণ করবে এবং সে ক্ষেত্রে ইংরেজদের সাহায্য খুবই লাভজনক ছিল। অন্যদিকে ইংরেজদের পক্ষে এই শত মােটেই লাভজনক ছিল না। যাই হােক হায়দারের আশা কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরােপুরি নিরাশায় পরিণত রাও মহীশর আক্রমণ করেন, তখন ইংরেজরা হায়দরের পাশে এসে দাঁড়ালেন না। নানা অজুহাতে তারা হায়দরকে সাহায্য দান থেকে বিরত থাকেন। ইংরেজদের এই বিশ্বাসঘাতকতায় হায়দর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। মারাঠাদের হাতে পরাজিত হয়ে হায়দর তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর থেকেই তিনি ঘােরতর ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। ইংরেজদের সততা ও বন্ধুত্বের মূল্য কতটুকু, তা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। হায়দারের প্রতি ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতকতা দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধের পটভূমি প্রস্তুত করে। এই ঘটনা ছাড়া আরও কয়েকটি কারণেও হায়দরের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

১৭৭০ সালে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুযায়ী বোম্বাই-এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষ গােলমরিচ ও চন্দন কাঠ কেনার একচেটিয়া অধিকারের বিনিময়ে মহীশরকে গােলা, বারদ প্রভৃতি নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম দিতে স্বীকৃত হয়। কিন্তু ইংরেজরা তাদের কথার খেলাপ করে। শেষ পর্যন্ত হায়দর এই সব জিনিস সংগ্রহ করার জন্য ফরাসীদের শরণাপন্ন হন। ফরাসীরা তাঁকে নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়মিত যােগান দিতে থাকে। ১৭৭২ সালে কোর্ট অব ডিরেক্টরস এই চুক্তি অনুমােদন করলেন । ইংরেজদের এই আচরণের ফলে হায়দর বাধ্য হয়ে ফরাসী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বস্তুতঃ ইংরেজ ও তাদের মিত্র কণটিক্সে নবাব মহম্মদ আলির ভ্রান্ত নীতির জন্য হায়দর ফরাসী ও মারাঠাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অথচ হায়দর ইংরেজ ও মহম্মদ আলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। এদিকে ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসীদের যুদ্ধের সূত্রপাত হয় এবং ইংরেজরা ফরাসীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি মাহে দখল করে নেয় (১৭৭৯)।

হায়দর এই আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি মনে করতেন মালাবার উপকূলের সমস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র তাঁর এক্তিয়ারভুক্ত। তিনি ফরাসীদের সাহায্যের জন্য একটি সেনাবাহিনীও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ইংরেজর। মাহে অধিকার করায় তিনি ইংরেজদের উপর বিরক্ত হন। ডঃ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহের মতে ইংরেজদের মাহে অধিকার দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশর যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। আরও একটি কারণে হায়দর ইংরেজদের উপর অসন্তুষ্ট হন। ইংরেজরা নিজামের ভাই বালাসৎ জঙ্গের জাগির আদনি ও গুন্টুর নিজেদের কতৃত্বাধীনে আনতে সচেষ্ট হন। বালাসৎ জঙ্গের সঙ্গে ফরাসীদের দহরম মহরম ইংরেজদের আশঙ্কার কারণ ছিল। সুতরাং ইংরেজরা গরে সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। কিন্তু নিজাম বা হায়দর কারও কোন অনুমতি ছাড়াই ইংরেজ বাহিনী নিজাম ও হায়দরের রাজসীমার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। ফলে নিজাম ও হায়দর উভয়েই ইংরেজদের উপর ক্ষিপ্ত হন। নিজামের প্রশ্রয়ে হায়দর গরে সেনাবাহিনী পর্যন্ত প্রেরণ করেন। এই ঘটনায় নিজাম ও হায়দর উভয়েই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রয়ােজনীয়তা সবশেষে ইংরেজদের সঙ্গে হায়দরের প্রায়ই সীমান্ত সংঘর্ষ লেগে থাকতাে। হায়দর ইংরেজদের সঙ্গে শান্তিপণ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী হলেও উপলখি করেন।

১৭৭০ সালে যখন মাধব ইংরেজরা তাঁর সঙ্গে সদ্ভাব ও মৈত্রীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিলেন না। ইংরেজদের এই অনুমনীয় মনােভাবই হায়দরকে ঘােরতর ইংরেজ বিদ্বেষী করে তােলে। হায়দর জীবনের প্রথম দিকে মারাঠাদেরই তাঁর প্রধান শত্র, বলে বলে মনে করতেন এবং মারাঠাদের আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তােলায় উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু যেদিন থেকে ইংরেজদের বন্ধুত্বের মুখােশ খুলে গেল, তখন থেকে তিনি মারাঠাদের পরিবর্তে ইংরেজদেরই তাঁর প্রধান শত্র, বলে মনে করতে শুরু করলেন এবং বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদ হিসাবে মারাঠাদের সঙ্গে শত্রতার সম্পর্ক পরিত্যাগ করে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ে তোলায় আগ্রহী হলেন। নিজাম যে মিত্র হিসাবে আদৌ নির্ভরযোেগ্য নন, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের ফলে তিনি মারাঠাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার, সুযােগও পেয়ে গেলেন। ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের ফলে মারাঠারাও তাঁর সঙ্গে একটা বােঝাপাড়ায় আসতে বাধ্য হয়। ১৭৭৯ সালে নিজাম, হায়দর ও মারাঠারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে এক ত্রিশক্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হন।

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ :

১৭৮০ সালের জুলাই মাসে হায়দর ইংরেজ সৈনাপতি বেইলিকে পরাস্ত করেন ও আকট অধিকার করেন। অন্যদিকে বক্সার যুদ্ধের নায়ক মুনরো হায়দরের ভয়ে নিজ গােলন্দাজ বাহিনী ছেড়ে মাদ্রাজে পালিয়ে যান। এই সময়ে ইংরেজরা এক চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হন। কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংশ এই বিপদও মানসিক ভারসাম্য হারান নি। তিনি দভাবে এই পরিস্থিতির মােকাবিলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রথমতঃ তিনি ইংরেজ সামরিক শক্তি জোরদার করার জন্য আয়ার কুটকে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। তাছাড়া সেনাপতি পিয়ার্সকেও তিনি বাংলা থেকে মাদ্রাজ অভিমুখে রওনা হবার নির্দেশ দেন। দ্বিতীয়তঃ কূটনীতির মাধ্যমে তিনি ত্রিশক্তির মৈত্রীতে ফাটল ধরাতে চেষ্টা করেন। তিনি নিজামকে ত্রিশক্তি মৈত্রী থেকে বার করে আ সক্ষম হন। গুন্টুর নিজামকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। নিজাম অবশ্য ত্রিশক্তির মৈত্রী ত্যাগ করলেও হায়দরের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলান নি। মদজী ভোঁসলেকেও ইংরেজরা হাত করে। এদিকে সিন্ধিয়া ইংরেজদের সঙ্গে এক চুক্তি করতে বাধ্য হন। ইংরেজরা চেয়েছিল হায়দরের বিরুদ্ধে মারাঠারা ইংরেজের সঙ্গে একটা সরাসরি চুক্তিতে আবদ্ধ হােক। নানা ফড়নবিশ অবশ্য এতে আপত্তি করেন। ইতিমধ্যে ১৭৮১ সালের জুলাই মাসে পােটোনােভের যুদ্ধে আয়ার কুট জয়লাভ করেন। ঐ বছরই আরাে দুটি যুদ্ধে কুট হায়দরকে আবার পরাজিত করেন। তিনি ভেলাের অধিকার করতেও সক্ষম হন। পর পর এইভাবে পরাজয়ের ফলে হায়দারের মর্যাদা যথেষ্ট ক্ষপ্ত হয়।

১৭৮২ সালের গােড়াতেই হায়দরের পুত্র টিপর হাতে ব্রেথওয়েটের পরাজয়ের ফলে ইংরেজরা একটা বড় ধরণের ধাক্কা খায়। ব্রেথওয়েট কারারুদ্ধ হন। এদিকে সার্ফের নেতৃত্বে একটি ফরাসী নৌবহর ঘাটে ভেড়ায় ইংরেজরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। হায়দর ইংরেজকে বাধা দেবার জন্য টিপকে মালাবার পাঠান। কিন্তু দ্বিতীয় ইঙ্গমহীশূর যুদ্ধ শেষ হবার আগেই ডিসেম্বর মাসে (১৭৮২) হায়দরের মত্যু হয়। এর ) কিছু পরে কুটও মত্যুমুখে পতিত হন। হায়দরের মত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু ১৭৮৩ সালে ইউরােপে ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসীদের সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ায় তিনি ফরাসী সাহায্য থেকে বঞ্চিত হন। এদিকে ইংরেজ সেনাপতি মাথজ বেদনাের অধিকার করেন। ম্যাঙ্গালােরও ইংরেজদের অধিকারভুক্ত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিপ, এই সব স্থান পনরধিকার করতে সক্ষম হন। তবে ফুলারটন কোয়েম্বাটোর দখল করেন ও শ্রীরঙ্গপত্তম আক্রমণ করতে উদ্যত হন। কিন্তু মাদ্রাজের গভর্ণর ম্যাকার্টনে টিপুর সঙ্গে সন্ধি করতে আগ্রহী হওয়ায় ১৭৮৪ সালে ম্যাঙ্গালােরের চুক্তি স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়।

টিপু সুলতানের তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:

Leave a Comment