ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসার (১৭৫৬-১৮৫৭)

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসার (১৭৫৬-১৮৫৭)

১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রথম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। কণটিকে ফরাসী ইষ্ট-ইডিয়া কোম্পানীর সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙখা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ও বাংলায় নবাবদের হাত থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দখল করে ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা ক্রমশঃ বদ্ধি পেতে থাকে। বাংলায় যে বিপুল ধন সম্পদ তাঁর দু-হাতে লুটতে থাকেন, তা যেমন কোম্পানীর আর্থিক শ্রীবদ্ধি করে, তেমনি বাংলাকে কেন্দ্র করে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের এক সুবর্ণ সুযােগ এনে দেয়। প্রাপ্ত সুযােগের সদ্ব্যবহার করতে ইংরেজরা সব সময়েই তৎপর ছিল। দেশীয় রাজ শক্তিগুলির অবক্ষয় এবং পারস্পরিক বােঝাপড়ার অভাব ও অনৈক্য ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের পথ প্রশস্ত করে। ১৭৬৫ সাল থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে ইংরেজদের ভারত বিজয় প্রায় সম্পূণ হয়। ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের পথে ইংরেজদের এই সময় তিনটি প্রধান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। প্রথমটি হলো হায়দর আলি ও টিপ; সুলতানের নেতৃত্বাধীন মহীশর। অষ্টাদশ শতকের একেবারে শেষ লগ্নে মহীশরের পতন ঘটিয়ে জাত সাম্রাজ্যবাদী ওয়েলেসলী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিষ্কণ্টক করেন। দ্বিতীয় ও সর্বাপেক্ষা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মারাঠা শক্তি। অষ্টাদশ শতকের শেষ পবে ইংরেজরা মারাঠাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তারপর অন্তদ্বন্দ্ব ও মারাঠা নেতাদের অনৈক্যের সুযােগ গ্রহণ করে ইংরেজরা মারাঠাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনের স্বপ্ন ভেঙ্গে দেন।

১৮১৮ সালের মধ্যেই মারাঠা শক্তির চড়ান্ত পতন ঘটে ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিন্ত হয়। তৃতীয় ও শেষ যে শকি টি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রবল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, তা হলাে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে নবজাগ্রত শিখ শক্তি। কিন্তু, শিখরাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রথের চাকা থামাতে পারে নি। অন্যান্য দেশীয় শক্তিগুলি ছিল অসহায় ও দুর্বল। তাদের পক্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য বাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রশ্নই ছিল না। বরং নিজাম বা অযােধ্যার নবাবের মত দুর্বলচেতা ও ব্যক্তিত্বহীন শাসক অনেকাংশে ইংরেজদের উপরই নির্ভরশীল ছিলেন আত্মরক্ষার তাগিদে। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের পথে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ওয়ারেন হেষ্টিংশ, লড ওয়েলেসলী ও লর্ড ডালহৌসীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় । যেন তেন প্রকারে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বাথ অক্ষর রাখাই ছিল এদের প্রধান লক্ষ্য। ন্যায় নীতি বা বৈধ অধিকার নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাননি। ভারতীয় দষ্টিতে এরা শ্রদ্ধার পাত্র না হলেও ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের জন্য ইংরেজরা এদের কাছে চির ঋণী থাকবেন।

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসার (১৭৫৬-১৮৫৭)

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দুটি জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়। প্রথমতঃ ১৭৬৫ সালে কোম্পানীর দেওয়ানী লাভের সঙ্গে সঙ্গেই বােঝা গিয়েছিল কোম্পানী একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে র্যজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষার বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছিল এর ফলে কোম্পানীর সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্ক নতুন করে স্থির করার প্রয়ােজনীয়তা দেখা দেয়, কারণ কোম্পানীর পক্ষে মুঘল সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতা দখল করা বা ভোগ করার আইনসঙ্গত কিছু অসুবিধা ছিল। প্রায় প্রশ্ন উঠেছিল ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ভারতের শাসন দায়িত্ব সরাসরি গ্রহণ করা সঙ্গত হবে কি না। আসলে কোম্পানীর অনিয়ন্বিতভাবে ক্ষমতা ও সুবিধা উপভােগ করার বিরুদ্ধে জোরালাে আন্দোলন গড়ে উঠছিল। যাই হােক সমকালীন পরিস্থিতিতে আচমকা কোম্পানীর হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা পুরােপুরি কেড়ে নেওয়াও সম্ভব ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে কোম্পানীর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার নীতি গ্রহণ করা হয়। এই নীতির প্রথম প্রয়ােগ দেখা যায় ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং এ্যাঙ্গে। তারপর ধাপে ধাপে কোম্পানীর ক্ষমতা ও সুযােগ সুবিধা সঙ্কুচিত হতে থাকে। অবশেষে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর কোম্পানীর শাসনের অবসান হয়। ভারতের সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা চলে আসে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার ও পালামেন্টের হাতে। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে যেন কোম্পানীর প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজদের প্রশাসনিক দায়িত্বও গ্রহণ করতে হয় । অথচ এর জন্য ইংরেজরা আদৌ মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে ইংরেজরা যত না বেগ পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশী তাঁদের মাথা ঘামাতে হয়েছে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে।

১৭৬৫ সালে দেজ্ঞানীর দায়িত্ব পেলেও প্রথমে তাঁরা তা এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন দায়িত্ব এড়িয়ে থাকাও সভব ছিল না। আসলে ইংরেজরা তখন এক উভয় সঙ্কটে পড়েছিল। ইংরেজদের এই সঙ্কটের মূল কারণ ছিল ভারতীয় ব্যবস্থা ও কাঠামাে সম্পর্কে তাদের নিরুপায় অজ্ঞতা। রাতারাতি ভারতীয় প্রথা ও ব্যবস্থা তাঁদের পক্ষে আরত্ত করা সম্ভব ছিল না। দেশীয় ভাষা তাঁরা জানতেন না; রীতিনীতি অচার পদ্ধতিও তাঁদের অজানা ছিল। দেশীয় বিশেষজ্ঞরাও প্রশাসনের গােপন কথা তাঁদের কাছে ফাঁস করে বােকামির পরিচয় দিতে চান নি। অন্যদিকে ইংরেজদের পক্ষেও পশ্চিমী শাসন কাঠামাে এ দেশে আমদানি করার সুযােগ ছিল না। কারণ সেই কাঠামাের সঙ্গে এদেশের লােকের কোন পরিচয় ছিল না। ফলে নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে ইংরেজদের এই সমস্যার মােকাবিলা করতে হয়। বাংলাদেশেই প্রথম ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটেছিল বলে এখানেই প্রথম ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামাে গড়ে ওঠে। পরে অন্যত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটলে বাংলার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ইংরেজরা তাঁদের প্রশাসনিক কাঠামে গড়ে তােলেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার গােড়া পত্তন করেন ওয়ারেন হেষ্টিংশ ও লর্ড কর্ণওয়ালিস। লর্ড বেন্টিক ও লর্ড ডালহৌসী ব্রিটিশ প্রশাসন গড়ে তােলার কাজ সম্পণ করেন। পরে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণ অবশ্য কখনই নিবিয়ে সম্পন্ন হয় নি। কেবলমাত্র দেশীয় শক্তিগুলির সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষে জয়লাভেক্স ফলেই ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়েছিল বললে ভুল করা হবে। ভারবাসী বিনা প্রতিবাদে কখনই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করে নি। আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্য ভাবেই ভারতের জন জীবনে কয়েকটি গুরুত্বপণ পরিবর্তন দেখা দেয়। ভারিেচরাচরিত গ্রামীণ ওকৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক স্বার্থে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। ব্রিটিশ পজি ও বাণিজ্যের প্রয়ােজনে ভারতের সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত কুটির শিল্পেরও পতন ঘনিয়ে আসে। অন্যদিকে ইংরেজ আমলে ভারতের প্রশাসন থেকে ক্ৰমশঃ ভারতীয়দের হঠিয়ে দিয়ে ইংরেজ কর্মচারীরা জাঁকিয়ে বসতে থাকেন।

তলা অধিকার করেছিলেন, হিন্দু-মুসলমান নিবিশেষে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তাঁর। অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলেন না। ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে কোম্পানীর সরকার ভারতীয়দের সামাজিক ও – ধর্মনৈতিক জীবনে কোন রকম হস্তক্ষেপ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু ইংরেজী শিক্ষা ও সংস্কৃত্রি স্পর্শে এসে কিছ, প্রগতিশীল ভারতবাসী তাঁদের সমাজ ও ধর্ম থেকে সব ধরণের কুসংস্কার ও কপ্রথা দূর করতে বদ্ধ পরিকর হন। তাঁর নানা আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারী সহযােগিতার প্রত্যাশী হন। লর্ড বেন্টিঙ্কের মত সহৃদয় ও উদারনৈতিক গভর্ণর জেনারেলও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সতীদাহ প্রথা, গঙ্গাসাগরে সন্তান নিক্ষেপ প্রভৃতি নিষ্ঠুর প্রথা তিনি তুলে দেন। খষ্টান মিশনারীদের কার্যকলাপ ও খষ্ট ধর্মের প্রসার এবং হিন্দ, সমাজ ও ধর্মের উপর আক্ৰমণ রক্ষণশীল হিন্দর সুনজরে দেখেন নি। ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারও অনেকের মনঃপত ছিল না। আজকের দষ্টিতে এই সব আন্দোলন প্রগতিশীল বলে মনে হলেও তখন অনেকের কাছেই এই সব সংস্কার হিন্দ, ধর্ম ও সমাজের উপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ বলে মনে হয়েছিল। যাই হােক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ মাঝে মাঝেই ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহের আকারে ফেটে পড়তো। ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রায় জন্ম লগ্ন থেকেই পর্যায়ক্রমে নানা বিদ্রোহ বারংবার ঘটতে থাকে। এর মধ্যে কিছু কিছু বিদ্রোহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় ছাড়া আদিবাসীরাও নানা কারণে বিদ্রোহের সামিল হন। কোল ও সাঁওতাল বিদ্রোহ তার প্রমাণ। অবশেষে ১৮৫৭ সালে ভারতে এক বহৎ এলাকা জুড়ে যে মহাবিদ্রোহের সুত্রপাত হয়েছিল, তা কোম্পানীর মত্যুলগ্ন সমাসন্ন করে। অনেক রক্তক্ষয়ের পর এই ভয়াবহ বিদ্রোহের অবসান হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ইতিহাসেও এক নতুন অধ্যায় সূত্রপাত হয়।

মীরকাশিম বক্সারের যুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করুন :

Leave a Comment