মীরকাশিম ও বাক্সরের যুদ্ধ (১৭৬৪) :

মীরকাশিম ও বাক্সরের যুদ্ধ (১৭৬৪) :

মীরকাশিম ও বাক্সরের যুদ্ধ (১৭৬৪) : পলাশীর যুদ্ধের পরে মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসালেও ইংরেজরা যেমন প্রত্যক্ষভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে নি, মীরকাশিমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কোম্পানীর অর্থনৈতিক সঙ্কট ও সমস্যা সমাধানের জন্যই মীরকাশিমকে নবাবীপদে অভিষিক্ত করা হয় । বলা বাহুল্য অর্থ নৈতিক শর্তগুলি পালন করতে মীরকাশিমকে যথেষ্ট অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। রাজকোষ তখন প্রায় শূন্য। সুতরাং নানাভাবে ব্যয় সংক্ষেপ করে, চনীলাল, মনিলাল ও অন্যান্যরা যাঁরা সরকারী তহবিল ও অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন, তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ও জগৎ শেঠের কাছে প্রচুর ঋণ করে মীরকাশিম অবস্থা কিছুটা সামলে নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজত্বের গােড়া থেকেই তাঁকে এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয় বলে তাঁকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

মীরকাশিম অবশ্য মীরজাফরের মত অপদার্থ ও অযােগ্য ছিলেন না। নিজের ব্যক্তিত্ব ও সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। ইংরেজদের বিরােধিতা সত্বেও তিনি যে ভাবে মুঘল সম্রাট শাহ আলমকে বিতাড়িত করেন (১৭৬০ ) তা তাঁর স্বাধীনচেতা মনােভাবের পরিচায়ক । অন্যদিকে ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে যাওয়ায় ইংরেজরাও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভ্যান্সিটাট নবাবের প্রতি কিছু, সহানুভূতিশীল ছিলেন। বস্তুতঃ রাজত্বের গোড়ার দিকে মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজদের সপক ভালই ছিল। কিন্তু পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পকের এত দ্রুত অবনতি ঘটে যে, ইংরেজরা ১৭৬৩ সালের মীরকাশিমকে অপসত করে মীরজাফরকে আবার বাংলার মসনদে বসান।

মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজদের বিরােধের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে যথেষ্ট মতবৈষম্য আছে। সমসাময়িক ইংরেদের মধ্যে ভেরেলে মনে করেন যে, মীরকাশিম বেশ, কিছুদিন ধরেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হছিলেন এবং দস্তকের অপব্যবহারকে অজুহাত করে তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবতীর্ণ হন। তার মতে ইংরেজদের সঙ্গে মীরকাশিমের সংঘর্ষের দুটি কারণ ছিলএকটি তাৎক্ষণিক ও অপরটি আসল বা মূল কারণ। তাৎক্ষণিক কারণ ছিল আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রশ্ন। কিন্তু মূল কারণ ছিল মীরকাশিমের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খ। মীরকাশিমের লক্ষ্য ছিল পরিপণ স্বাধীনতা। ভেরেলেন্টের উপর নির্ভর করে ডডওয়েল মন্তব্য করেছেন যে, মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজদের সংঘর্ষের জন্য কখনই আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দায়ী ছিল না। আসলে এটা ছিল একটা তুচ্ছ অজুহাত মাত্র। ডঃ নন্দলাল চট্টোপাধ্যায়ও প্রায় অনুপ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে নবাবের আসল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এদের বক্তব্যের মূল কথা হলো নবাবের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙখা ও ইংরেজদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করাই হলাে এই সংঘর্যের প্রকৃত কারণ। ডডওয়েল অবশ্য এই বিরােধের আরও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে এই বিরােধ কিছুটা অনিবার্য ছিল, কারণ ইংরেজ ও নবাবের স্বার্থ ছিল পরস্পরবিরােধী।

নবাব চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে। অন্যদিকে ইংরেজরা এমন সব সুযােগ সুবিধা দাবৃী করেছিলেন, যা ছিল নবাবের স্বাধীনতার পরিপন্থী। এই বক্তব্য অবশ্য তাঁর প্রথম বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে স্বয়ং ভ্যাটিটি এই অভিমত পােষণ করেন যে, ইংরেজ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য নীতির এমন একটা স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, নবাবের পক্ষে তা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইংরেজ বণিকদের বেপরােয়া মনােভাব ও অপমানসূচক আচরণ তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। এর ফলে বিরােধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। পি. জে. মাশালের মতে নবাব ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন বলে মনে হয় না। তবে বাংলাদেশে ইংরেজদের শক্তিবদ্ধি তিনি সনজরে দেখেন নি। ইংরেজদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের প্রসার এই বহত্তর অভিযােগের খণ্ডাংশমাত্র। বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্লাইভের সমর্থক বেশ কিছু ইংরেজ তাঁর প্রতি আদৌ সদয় নয়। সুতরাং ইংরেজ কর্মচারীদের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সমস্যা জটিল আকার ধারণ না করলেও তিনি হয়ত অন্য কোন কারণে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হতেন। ইংরেজদের সঙ্গে মীরকাশিমের সম্পর্কের অবনতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নবাব এটাও মূলত দুটি বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়। প্রথমটি হলাে নবাবের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ও অপরটি হলাে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের প্রশ্ন। ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক গড়ে উঠেছে এই দুটি বিষয়ের পারস্পরিক গুরুত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক ডঃ বিনয় চৌধুরীর মতে মীরকাশিমের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খর উপর অযথা গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে। মীরকাশিমের পক্ষে ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার কোন প্রশ্নই ছিল না, কারণ আসলে এই ধরণের কোন নিয়ন্ত্রণই ছিল । অন্যদিকে নবাবও প্রথমে এমন কোন কাজ করেন নি, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজ বিরােধিতা।

মীরকাশিম ও বাক্সরের যুদ্ধ (১৭৬৪) :

ইংরেজরা যে সমস্ত জেলার জমিদারীর মালিক হয়েছিলেন বা শােরার ব্যবসায়ে একচেটিয়া কারবার ও শ্রীহট্ট থেকে চণ কেনার অধিকার অর্জন করেছিলেন, এগুলির কোনটাই প্রত্যাহার করার কোন পরিকল্পনা মীরকাশিমের ছিল । নবাব কেবলমাত্র ইংরেজদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের প্রসার পছন্দ করেন নি। অনেক সময় বলা হয় বিহারের শাসনকতা রামনারায়ণ ইংরেজদের প্রিয় পাত্র ছিলেন এবং সেই কারণেই মীরকাশিম তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এই অভিযােগ সত্য নয়। আসলে অর্থনৈতিক কারণে রামনারায়ণকে পদচ্যুত করা হয়। মীরকাশিমের অর্থনৈতিক অবস্থা মােটেই ভাল ছিল না। রামনারায়ণের কাছে মীরকাশিমের অনেক টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু বার বার তাঁকে হিসাব নিকাশ দাখিল করতে বলা সত্বেও রামনারায়ণ নবাবের কথায় কর্ণপাত করেন নি। এমন কি শেষ দিকে ভ্যান্সিটাটও রামনারায়ণের উপর অত্যন্ত বিরক্ত হন। এই অবস্থায় বিহার থেকে রামনারায়ণকে সরানাে খুবই জরুরী ছিল। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণেও রামনারায়ণের অপসারণ নবাবের কাছে অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। নবাবের প্রতি তাঁর আনুগত্য সন্দেহাতীত ছিল না এবং তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙখাও দিন দিন বেড়ে চলেছিল। -তবে রামনারায়ণের অপসারণ যে পরােক্ষভাবে বিহারে ইংরেজ প্রাধান্য ও প্রতিপত্তি ক্ষুন্ন করেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ভেরেলেস্টের মতে মীরকাশিমের সামরিক সংস্কারেরও মুল কারণ ছিল তাঁর স্বাধীনতা পহা। এই অভিযােগও ভিত্তিহীন। মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজদের এমন কোন চুক্তি হয় নি যে, তিনি সামরিক সংস্কার করতে পারবেন না। তাছাড়া এমন কোন প্রমাণ নেই যে, ইংরেজদের শক্তি ধংস করার জন্যই তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। ভ্যাসিটার্টের মতে নবাব সামরিক সংস্কারের কাজে ব্রতী হয়েছিলেন নেপাল জয়ের জন্য। ইংরেজদের শক্তি ধংস করাই যদি তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে নেপাল আক্রমণ করে অযথা শক্তিক্ষয় তাঁর নিবন্ধিতার পরিচায়ক।

আসলে নবাবের সঙ্গে চড়ান্ত সংঘষের জন্য ইংরেজদের অন্যায় একগয়ে মনােবত্তি ও বেপরােয়া স্বভাবই দায়ী ছিল আর আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সমস্যাকে কেন্দ্র করেই ইংরেজদের চরিত্রের এই দিকটি উন্মােচিত হয়ে পড়ে। পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজ কর্মচারীরা যে ভাবে তাঁদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তকের অপব্যবহার করছিলেন তার ফলে নবাব যে কেবলমাত্র তাঁর প্রাপ্য শক থেকেই বঞ্চিত হচ্ছিলেন তা নয়, এর ফলে দেশীয় বণিকরাও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। নবাব হিসাব করে দেখেছিলেন যে ইংরেজ কর্মচারীদের এই বেআইনী ব্যবসার ফলে সরকারের বাৎসরিক ২৫ লক্ষ টাকা লােকসান হচ্ছিল। মীরকাশিমের আর্থিক সঙ্কট যতই তীব্র আকার ধারণ করছিল, ততই তাঁর পক্ষে এই ক্ষতির বােঝা বহ বলে মনে হচ্ছিল।

এফড়িত হয়ে পড়ে। নবাবের পক্ষে এই দবিসহ অবস্থা মেনে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ইংরেজরা যেভাবে জোরজবস্তি ও বলপ্রয়ােগ করে নিজেদের ব্যবসা চালাছিল, তা নবাবের সার্বভৌম রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর আক্রমণের সামিল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ধীরে ধীরে ইংরেজ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের প্রশ্নটি একটি রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে মােড় নিতে থাকে। ভ্যাম্পিটাট নিজে অবশ্য মীরকাশিমের সমস্যাটিকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করেছিলেন এবং এই দুনীতি দূর করার জন্য নবাবের পক্ষেও ছিলেন। সমস্যাটির চুড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এমন কি প্রয়ােজন হলে বলপ্রয়ােগের কথাও তিনি নবাবকে দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ এই সঙ্কটের জন্য কোম্পানীও মীরকাশিমকে দায়ী করেন নি। স্বয়ং ক্লাইভ কোর্ট অব । ডিরেক্টরের সঙ্গে একমত হন যে, কোম্পানীর কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্যই বাংলায় যত অশান্তির সূত্রপাত হয়। ১৭৬৬ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী তারিখে লিখিত একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন-“The whole trade of Bengal has,I find, been monopolised by your servants, their agents and gomastahs. Thousands of the natives are starving for want of those accustomed profits, which are now diverted and confined to the particular channel.” তাঁর এই কথার মধ্যে যেন আমরা মীরকাশিমের অভিযােগেরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।

ভ্যান্সিটার্ট প্রথমে ভেবেছিলেন যে, কোম্পানীর কর্মচারীদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করেও তিনি নবাবের সঙ্গে একটা বােঝাপড়ায় আসতে পারবেন। অবশ্য নবাবের স্বার্থও যাতে রক্ষিত হয়, সে বিষয়েও তাঁর লক্ষ্য ছিল। তিনি নবাবকে বােঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে দেশের স্বার্থের পক্ষে ব্যবসার প্রসার কাম্য। ইংরেজ কর্মচারীরা। যাতে কিছু, শক দেয় ও তাদের দেশীয় গোমস্তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি ভাবনা চিন্তা করছিলেন। কিন্তু কলকাতা কাউন্সিলের উপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেবার কোন ক্ষমতা তাঁর ছিল না। সুতরাং সদিচ্ছা থাকলেও তিনি কিছুটা অসহায় ছিলেন। যাই হােক তিনি নবাবের সঙ্গে তাঁর নতুন রাজধানী সাক্ষাৎ করে তাঁর সঙ্গে আলাপ আলােচনার পর স্থির করলেন যে, ইংরেজ কর্মচারীরা। ৯% শুল্ক দেবেন এবং তাদের গােমস্তারা নিজেদের কাজকর্মের জন্য নবাবের কর্মচারীদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। ভ্যান্সিটাট ভেবেছিলেন যে, ইংরেজ কর্মচারীরা তাঁর এই ব্যবস্থা মেনে নেবেন, কারণ এর ফলে তাঁদের বেআইনী ব্যবসা আইনসিদ্ধ বলে স্বীকৃত হবে। কিন্তু এই ব্যবস্থার কথা জানার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ কর্মচারীরা এর বিরুদ্ধে সােচ্চার হয়ে ওঠেন। তাঁরা অবশ্য কিছু শক দিতে যে পরােপরি অরাজী ছিলেন, তা নয়। কিন্তু তাঁদের গােমস্তার উপর নবাবের কর্তৃত্বের পুনঃস্থাপনা তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে রাজী ছিলেন না। যাই হােক এই চুক্তিটিকে অনুমােদন করার জন্য কলকাতা কাউন্সিলের কাছে উপস্থিত করা হলে এক উত্তপ্ত বিতর্কের সূত্রপাত হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক আলাপ আলোচনার পর এই চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইংরেজরা কেবলমাত্র লবণের উপর ২২, শুল্ক দিতে স্বীকৃত হয় ও গােমস্তাদের উপর নবাবের ক্ষমতা অস্বীকার করা হয়। মুঙ্গের চুক্তির জন্য ভ্যান্সিটার্টের কড়া সমালােচনা করেন ভেরেলেষ্ট। ভ্যান্সিটাট নাকি এই চুক্তির জন্য মীরকাশিমের কাছ থেকে সাত লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন বলেও অভিযােগ করা হয়।

ভ্যান্সিটার্টের সমালােচনা করে বলেন যে তাঁর দুর্বল নীত্তি ফলে বাংলায় ইংরেজদের স্বার্থ ক্ষম হবার সম্ভাবনা ছিল। এদিকে মীরকাশিম যখন বুঝলেন যে ইংরেজরা কিছুতেই নতি স্বীকার করবে না, তখন তিনি সমস্ত আভ্যীণ শুক তুলে দিয়ে দেশী বিদেশী সব বণিককে সমান দৃষ্টিতে দেখার নীতি ঘােষণা করলেন। এই ভাবে এক বিরাট আর্থিক লোকসানের ঝুকি নিয়ে মীরকাশিম ইংরেজদের কোপের শিকার হলেন। ইংরেজদের পক্ষে মীরকাশিমের ব্যবস্থা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল , কারণ এর ফলে তাঁদের একচেটিয়া সবিধার অবসান ঘটলাে। দেশীয় বণিকদের সঙ্গে সমগােত্রীয় হওয়ায় তাঁদের ব্যবসার যথেষ্ট ক্ষতি হবার আশঙ্কা দেখা দিল। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা প্রশ্ন তুললেন সম্রাটকে ডিঙিয়ে নবাবের এক তরফা এই সিদ্ধান্ত নেবার কোন অধিকার নেই। তাঁরা পষ্ট বুঝতে পারলেন নবাবকে সরানাে ছাড়া এই অবস্থা মােকাবিলা করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। এই অবস্থায় নবাবের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে (১৭৬৩)। কিন্তু নবাবের সৈন্যসংখ্যা ইংরেজদের থেকে বেশী হলেও মীরকাশিম পর পর কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, উদয়নাল ও মুঙ্গেরের যুদ্ধে পরাজিত হন। নবাব পাটনা হয়ে শেষ পর্যন্ত অযােধ্যায় উপস্থিত হন।

মীরকাশিমের সঙ্গে যখন যুদ্ধ চলছিল, তখনই ইংরেজরা তাঁকে পদচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ইংরেজদের মধ্যে মতবিরােধ দেখা দেয়! ওয়াটস, ম্যারিয়ট, কার্টিয়ার প্রভৃতি ব্যক্তি বাংলার শাসনভার সরাসরি গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। ১৭৬৩ সালের জুলাই মাসে মীরজাফরকে আবার বাংলার মসনদে বসানাে হলাে। তাঁর সঙ্গে যে চুক্তি হলাে তাতে ইংরেজদের প্রায় সব দাবী মেনে নেয়া হলাে। সমস্ত শক তুলে দেবার যে আদেশ মীরকাশিম জারী করেছিলেন তা প্রত্যাহার করে নেয়া হলাে। বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামে ইংরেজদের অধিকার নতুন করে স্বীকৃত হলাে। মুর্শিদাবাদের টাকশালে তৈরী “সিক্কা মুদ্রার পাশাপাশি কলকাতার মুদ্রাও কোন বাট্টা ছাড়াই আইনতঃ গ্রাহ্য হবে বলে নবাব ঘােষণা করলেন। আরও স্থির হলাে যে শ্রীহট্টের চণ উৎপাদনে নবাব ও কোম্পানীর যৌথ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তাছাড়া মীরজাফর ৩০ লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। চাপে পড়ে তাঁকে এই ধরণের । অসম্ভব শর্ত মেনে নিতে হয়েছিল। যাই হােক ১৭৬৩ সালে তৃতীয় বার রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলাে। মীরকাশিমের জায়গায় আবার মীরজাফর এলেন। মীরজাফর অবশ্য বুঝতেই পেরেছিলেন যে, নবাবী পদের মােহটুকু ছাড়া আর কিছুই তাঁর কপালে জুটবে না। তবও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়ার চেয়ে পুতুল নবাব পদই তার কাছে অধিকতর কাম্য ছিল। অন্যদিকে ইংরেজরা আবার প্রমাণ করলো যে তাঁরাই বাংলার সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

মীরকাশিম কিন্তু পরাজিত হওয়া সত্বেও হাল ছাড়েন নি। তিনি অযােধ্যার নবাব ওয়াজির সুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলমের সঙ্গে যােগাযােগ করে এক চরম শক্তিপরীক্ষার জন্য তৈরী হন। তিন শক্তির মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজদের সংঘর্ষ বাঁধলো বক্সারের প্রান্তরে (২২.১০.৬৪)। এই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মনরাের হাতে এই মিলিত বাহিনীর পরাজয় ঘটলাে। শাহ অালম সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ পক্ষে যোগদান করলেন। সুজাউদ্দৌলা রেহিলখণ্ডে পালিয়ে গেলেন ও মীরকাশিম আত্মগোপন করলেন। অবশেষে ১৭৭৭ সালে দিল্লীর কাছে তাঁর মৃত্যু হয়। কোম্পানীকে বাংলার দেওয়ানীর দায়িত্ব দেন। এর ফলে বাংলায় ব্রিটিশ অধিকার অইতঃ স্বীকৃত হয়। বাংলার শাসনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার অর্জন করে কোম্পানী অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়। এই দিক দিয়ে বিচার করলে বক্সারের রে গুরত্ব পলাশীর যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশী।

বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। বক্সারের যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের কাজ সম্পূর্ণ হয়। বস্তুতঃ পলাশীতে যার সনা, বক্সারে তার পরিসমাপ্তি। কিন্তু, পলাশীর যুদ্ধে ইংরাজদের সামরিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় নি। পলাশীর যুদ্ধের মীমাংসা হয়েছিল কূটনীতি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। যদি কেবলমাত্র এই যুদ্ধের উপরই বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপিত হতাে, তাহলে তা ইংরেজদের কাছে চিরদিন এক অত্যন্ত ঘৃণ্য ও কলঙ্কজনক ঘটনা বলে নিন্দিত হতাে। বাহবল নয়, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাকতাই ছিল বাংলা জয়ের মুলধন। বক্সারের যুদ্ধ সম্পর্কে এই ধরণের কোন অপবাদ দেবার সুযােগ ছিল না। বক্সারের যুদ্ধ ইংরেজদের সামরিক উর্ষতার পরিচায়ক। তাছাড়া বক্সারের যুদ্ধে কেবলমাত্র মীরকাশিম পরাজিত হন নি; বরং শাহ আলম ও সুজাউদ্দৌলাও পরাজিত হয়েছিলেন। সুতরাং এক অর্থে দিল্লী থেকে বাংলা পর্যন্ত সমগ্র উত্তর ভারত ইংরেজদের করতলগত হয়। পলাশীর যুদ্ধের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় নি।

মীরজাফরের পদচ্যুতি সম্পর্কে জানার জন্য এখানে ক্লিক করো: (১৭৬০)

Leave a Comment