হায়দারের অভ্যন্তরের কারণ :

হায়দারের অভ্যন্তরের কারণ :

হায়দারের অভ্যন্তরের কারণ: হায়দারের চঞ্চল ও অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মলধন করে ধীরে ধীরে হায়দর তাঁর ক্ষমতা বিস্তার করতে সচেষ্ট হলেও তাঁর চমকপ্রদ উত্থানের জন্য একদিকে দায়ী ছিল মহীশরের আভ্যন্তরীণ সঙ্কট ও রাজনৈতিক শন্যতা এবং অন্যদিকে কণটিকে ইঙ্গ-ফরাসী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা তাঁকে খুব কাছ থেকে ইউরোপীয় যুদ্ধনীতি ও রণকৌশল পাঠ করার এক দলভ সুযােগ এনে দিয়েছিল। মহীশরের রাজা চিক্কা কৃষ্ণরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে দুই ভাই-দলবই বা সেনাধিনায়ক দেবরাজ ও সবাধিকারী অথাৎ রাজধ ও অর্থবিভাগের বিভাগের প্রধান নঞ্জরাজ সমস্ত ক্ষমতা দখল করেছিলেন। হায়দর প্রথমে নঞ্জরাজের অধীনে সামান্য সৈনিকের কাজ করতেন। এদিকে মহীশরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সুযোগ গ্রহণ করে নিজাম ও পেশবা বালাজী বাজীরাও উভয়েই মহীশরে নিজ নিজ প্রভাব প্রতিপতি বিস্তারে উদ্যোগী হন।

১৭৫০ এর দশকে পর পর চারবার মারাঠারা মহীশূর আক্রমণ করে ( ১৭৫৩, ১৭৫৪, ১৭৫৭ ও ১৭৫৯)। নিজামও মনে করতেন মহীশরের উপর তর সার্বভৌম অধিকার আছে। এই সঙ্কটজনক মহর্তে দেবরাজ ও নঞ্জরাজের মধ্যে বিরােধের সূত্রপাত হয় এবং দেবরাজকে হঠিয়ে নঞ্জরাজ সমস্ত ক্ষমতা দখল করেন। রাজ দ্বিতীয় কাটিকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে প্রথমে ইংরেজদের ও পরে ফরাসীদের পক্ষ অবলম্বন করেন। হায়দর ত্রিচিনাপল্লীর যুদ্ধে সব সময়েই নঞ্জরাজের সঙ্গে ছিলেন। এই সময়ে তাঁর দুত পদোন্নতি হয় এবং তিনি দিন্দিগলের ফৌজদার পদে উন্নীত হন। দ্বিতীয় কাটিকের যুদ্ধের সময়েই তিনি ইউরােপীয় রণকৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা লাভ করেন। ১৭৬১ সালে তিনি নঞ্জরাজকে অপসত করে নিজে সমস্ত ক্ষমতা দখল করেন। ১৭৪১ থেকে ১৭৬১ সালের মধ্যে এই ভাবে সুযােগসন্ধানী হায়দর নানা বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে মহীশরের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হন। অষ্টাদশ শক ছিল উদ্যমী, সুযােগসন্ধানী ও তৎপর রাজনীতিবিদদের যুগ, যাঁরা নিজেদের যােগ্যতায় ধাপে ধাপে ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। হায়দরের অভ্যুত্থান এটাই প্রমাণ করলাে প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই হায়দর মহীশরের সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন। এন. কে সিনহা যথার্থই বলেছেন—“Haidar’s rise, like that of many other great men, was as much due to his energy, enterprise and daring as to his opportunities.

মারাঠা-মহীশূর সম্পর্ক হায়দর আলির জীবনে ১৭৬১ সাল খুবই গুরত্বপূর্ণ। ঐ বছর যে কেবল তিনি মহীশরের ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন তাই নয় ঐ বছরেই মারাঠারা পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালীর হাতে পরাজিত হয়। ফলে মারাঠারা সাময়িকভাবে হীনবল হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে হায়দর তাঁর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিস্তারে উদ্যোগী হন। ১৭৬১ থেকে ১৭৬৩ সালের মধ্যে তিনি হসকোট, দোদবল্লাপর ও সেরা অধিকার করেন। এরপর বেদনার ও শােন্ডাও তাঁর অধিকারভুক্ত হয়। Wilks এর মতে বেদনর লুঠ করে হায়দর ১ কোটি ২০ লক্ষ স্টারলিং লাভ করেন। এর ফলে তাঁর আর্থিক অবস্থার যথেট উন্নতি ঘটে। কিন্তু ইতিমধ্যে পেশবা মাধব রাও-এর হাতে মারাঠা শক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটায় হায়দারের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। ডঃ সিংহের মতে যুদ্ধক্ষেত্রে হায়দর আলির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পেশবা মাধব রাও। ইংরেজদের বিরদ্ধে তিনি সাফল্যলাভ করলেও মাধব রাওকে তিনি কোনদিন পরাজিত করতে পারেন নি। বস্তুতঃ মহীশরের অভ্যুত্থানের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ছিল মারাঠারা। তবে ভাগ্য হায়দরের সহায়ক ছিল। মাধব রাও-এর অকাল মৃত্যুর ফলে হায়দর তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পান ও নেতৃত্বহীন হয়ে মারাঠারা কণটিকে দুর্বল হয়ে পড়ে। যাই হােক হায়দরের দুতে অভ্যুত্থান মারাঠাদের হিংসার উদ্রেক করে। হায়দরের লক্ষ্য ছিল তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি তুঙ্গভদ্রা নদীর পর পার পর্যন্ত বিস্তৃত করা। তাঁর এই পরিকল্পনা মারাঠাদের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ অনিবার্য করে তােলে।

হায়দারের অভ্যন্তরের কারণ :

১৭৬৪ সালের মে মাসে তিনি রাতেল্লির যুদ্ধে মারাঠাদের হাতে পরাজিত হন। এর পর পেশবা বেদনােরের দিকে অগ্রসর হন। এই অবস্থায় পেশবার পিতৃব্য রঘুনাথ রাও-এর হস্তক্ষেপে উভয় পক্ষের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। হায়দর ২৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন। তা গুটি ওসাভানরে তাঁর হস্তচ্যুত হয়। ১৭৬৫ সালে সম্পাদিত এই চুক্তির ফলে পেশা হায়দরকে কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হন। ১৭৬৫ সালের এই চুক্তিতে মাধব রাও খুব একটা খুশী ছিলেন না। রঘুনাথ রাওএর ইচ্ছায় তিনি এই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। ফলে এই চুক্তিতে মারাঠা-মহীশূর প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হয় নি। হায়দরও স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে পনবার মারাঠা আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয় ও ১৭৬৬ সালে মাধব রও আবার হায়দারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হায়দর এই অবস্থায় ইচ্ছা করলে নিজাম অথবা ইংরেজদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু সেই ধরণের কোন পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। এদিকে পেশবা হায়দারের বিরুদ্ধে নিজামের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই অবস্থায় নিজাম ইংরেজদের সঙ্গেও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে মারাঠাদের প্রতি নিজামের পুরােপুরি আস্থা ছিল না। গ্রান্ট ডাফের মতে নিজামের ভয় ছিল ইংরেজরা তাঁর পাশে এসে না দাঁড়ালে মারাঠারা নিজেদের খুশীমত মহীশূর রাজ্য ভাগাভাগি করবে। নিজামের মতিগতিতে পেশা বিরক্ত হন এবং কারও সাহায্যের প্রত্যাশা না করেই তিনি মহীশূর আক্রমণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হায়দর সধি স্থাপন করতে উদ্যোগী হন। তিনি পেশাকে ৩৩ লক্ষ টাকা দিতে স্বীকৃত হন এবং সেরা, চিকবল্লাপুর ও কোলার ফিরে পান। কিন্তু দোদবল্লাপুর, ইসকোট প্রভৃতি অঞ্চল তাঁর হস্তচ্যুত হয়। এইভাবে পেশবা নিজামকে বােকা বানান। কিন্তু নিজামের অব্যবহিত চিত্তের জন্যই মারাঠারা হায়দরকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারলেন না। এইভাবে মারাঠা ও নিজামের পারস্পরিক সন্দেহ ও অনাস্থা হায়দরের অস্তিত্বের সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়।

মারাঠা-মহীশূর সম্পর্কের উন্নতি ঘটলাে না। আসলে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক প্রাধান্যের কোন মীমাংসা তখনও হয় নি। পেশার সঙ্গে হায়দরের সম্পর্কের অবনতির কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমতঃ হায়দর পেশবার শত্রুদের, বিশেষতঃ রঘুনাথ রাও ও জানোজ ভোঁসলের সঙ্গে গােপনে যােগাযােগ রাখছিলেন। দ্বিতীয় কারণটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। হায়দর যে কেবল বিগত দু বছর যাবৎ কোন প্রকার কর প্রদান করেন নি, তাই নয় ; সাভার ও গুটি থেকে তিনি জোরজবস্তি করে কর আদায় করেন। এইভাবে মারাঠা প্রভাবিত অঞ্চলে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করে তিনি পেশবার বিরাগভাজন হন। ফলে ১৭৬৯-৭০ সালে মারাঠারা আবার তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ১৭৭১ সালে চিকরলির যুদ্ধে মারাঠাদের হাতে হায়দর আবার পরাজিত হন। তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তনের পতন আসন্ন হয়। মারাঠাদের তৎপরতার অভাবে অবশ্য তিনি রক্ষা পান। এই বিপদের সময় তিনি ইংরেজদের সাহায্য প্রত্যাশা করছিলেন, কারণ প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর এক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজরা তাঁর সঙ্গে কোন সহযোগিতা করে নি। এরপর থেকেই হায়দর তীব্র ভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ শুর করেন।

১৭৭২ সালে মাধব রাও-এর মত্যুর ফলে হায়দরের বিপদ অনেকাংশে কেটে যায়। মাধব রাও-এর মত্যুর পরে মারাঠাদের মধ্যে যে গহবিবাদ শুর হয়, তার পর্ণ সুযােগ গ্রহণ করে হায়দর তাঁর রাজ্যসীমা কৃষ্ণা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ১৭৭৪ থেকে ১৭৭৬ সালের মধ্যে তিনি তাঁর শুধু হৃত এলাকাগুলিই পুনরুদ্ধার করেন নি সেই সঙ্গে বেলারী কডাপা, গুটী ও কণলও অধিকার করেন। ১৭৮০ সালের কগ তাঁর হস্তগত হয়। তিনি অবশ্য রঘুনাথ রাওকে পেশা হিসাবে স্বীকার করেন ও তাঁকে বাৎসরিক ৬ লক্ষ টাকা প্রদান করতে স্বীকৃত হন। রঘুনাথ তাঁকে কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণ তীর পর্যন্ত মারাঠা অঞ্চল দখল করার অনুমতি দেন। কিন্তু পরে যখন রঘুনাথ রাও-এর উচ্চাকাঙ্খার ফলে প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত হয় ও নানা ফড়নবীশ মারাঠা নেতৃত্বের হাল ধরেন, তখন নানা ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দারের মৈত্রীর গুরুত্ব বিবেচনা করে মারাঠা-মহীশূর চুক্তির পথ প্রশস্ত করেন। ১৭৮০ সালে মারাঠা মহীশূর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক হায়দার আলী ও টিপু সুলতান:

Leave a Comment