সম্পদের নির্গমন বলতে কী বোঝো?|সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব কি?|সম্পদের বহির্গমন বলতে কী বোঝা?|Drain Theory

সম্পদের নির্গমন বলতে কী বোঝো?|সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব কি?|সম্পদের বহির্গমন বলতে কী বোঝা?|Drain Theory সম্পর্কে আজকে এই পোস্টের মাধ্যমে আলোচনা করা হবে|আজকে যে বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করা হবে সেগুলি হল ড্রেন অফ ওয়েলথ বলতে কী বোঝো?|পলাশীর যুদ্ধের পর কিভাবে সম্পদের নির্গমন ঘটেছিল | সম্পদের নির্গমন তত্ত্বটি কে  প্রথম প্রচার করেছিলেন?|সম্পদের বহির্গমন pdf পেয়ে যাবে| সম্পদের নিষ্কাশন এর সমালোচনা করেন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে| কে প্রথম তার গ্রন্থে সম্পদের নির্গমন তত্ত্বটি তুলে ধরেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে |প্রিয় পাঠক বন্ধুরা আপনারা এই সমস্ত তথ্যগুলো এই পোস্টের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন।

সম্পদের নির্গমন বলতে কী বোঝো?|সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব কি?|সম্পদের বহির্গমন বলতে কী বোঝা?|Drain Theory|সম্পদের বহির্গমন তত্ত্বের মূল প্রবক্তা

সম্পদের নির্গমনঃ- 1867 সালে দাদাভাই নওরোজি সর্বপ্রথম সম্পদের ‘নির্গমন তত্ত্বটি’ পোভার্টি অ্যান্ড আন ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া তুলে ধরেছিলেন।পলাশীর যুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও আর্থিক কারণে সমগ্র অষ্টাদশ শতক ধরে বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ স্রোতের মতো ইংল্যান্ডে চলে যায় এবং এর বিনিময়ে ভারত কোন উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা পায়নি। ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতরা এ ঘটনাকে ‘আর্থিক নিষ্ক্রমণ’ ‘আর্থিক নিগমন’ বা ‘সম্পদের বহির্গমন’ বলে অভিহিত করেছেন। সম্পদের নির্গমন নিয়ে পন্ডিত মহলে বিতর্কের শেষ নেই। সম্পদের নির্গমন কি সত্যিই? কিভাবে হয়েছিল? কাদের দ্বারা হয়েছিল? 

সম্পদের নির্গমন (প্রথম কবে হয়েছিল) 

ইংরেজের আগেও বাংলাদেশ থেকে সমকালীন শাসকেরা বহু অর্থ সংগ্রহ করছেন। যেমন সুলতানি যুগে বা মুঘল যুগে। এই সংগ্রহেরও শােষণমূলক চরিত্র ছিল। কিন্তু জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সেই অর্থ দেশের মধ্যেই খরচ হত। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে দেশের অর্থনীতি পুষ্ট হত। তুর্কী বা মুঘলরা বিদেশ থেকে ভারতে এলেও কালক্রমে তারা এখানেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করে। কিন্তু ইংরেজগণ ছিল একান্তভাবেই বিদেশী ও ভাগ্যান্বেষী। তাদের কাছে বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষ ছিল নিছক ভাগ্য-পরিবর্তনের ক্ষেত্র। প্রধানত দুটি ধারায় এই শােষণ ও নিষ্ক্রমণ ঘটেছিল।

সম্পদের নির্গমন (কিভাবে হয়েছিল) 

 (১) কোম্পানির কর্মচারী ও আগত ইংরেজদের ব্যক্তিগত বেসরকারি বাণিজ্য এবং অন্যান্যভাবে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে এবং (২) কোম্পানির বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে। 

১৭৫৭-র পরবর্তীকালে নবাব-বদলের খেলায় লিপ্ত হয়ে কোম্পানির পদস্থ কর্মচারীরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। বাংলার মসনদ পাবার লােভে মীরজাফর ও মীরকাশিম রবার্ট ক্লাইভ-সহ কোম্পানির পদস্থ কর্তাদের প্রচুর অর্থ দেন। উপঢৌকন, পারিতােষিক বা নজরানা হিসেবে তারা এই অর্থ নেন। লিখিত প্রমাণ ছাড়াও তারা বহু অর্থ উপার্জন করেন। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে কোম্পানির পদস্থ কর্তারা তথাকথিত নজরানা হিসাবেই প্রায় ৫০ লক্ষ পাউণ্ড বা ৫ কোটি টাকা, (১ পাউণ্ড = ১০ টাকা) উপার্জন করেছিলেন। ১৭৬৫-তে বাংলায় সংগৃহীত মােট রাজস্বের প্রায় চারগুণ বেশি ছিল ইংরেজ কর্মচারীদের প্রাপ্ত এই অবৈধ অর্থ। এর বাইরে ছিল ইংরেজ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার অর্থ। 

ড. নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহের মতে, পারিতােষিক বা নজরানার থেকে ব্যক্তিগত বেসরকারি বাণিজ্য থেকে পাওয়া মুনাফা ছিল বেশি ক্ষতিকারক। মুঘল বাদশার ফর্মান (১৭১৭ খ্রীঃ) অনুসারে কেবল কোম্পানি তার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের শুল্কছাড়ের অধিকারী ছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা বে-আইনীভাবে ‘দস্তক প্রদর্শন করে বিনাশুল্কে ব্যক্তিগত বাণিজ্য চালাত। সাই, ভেরেলেস্ট, বারওয়েল প্রমুখ ইংরেজ কর্মচারী বিভিন্ন অত্যাবশ্যক পণ্যের ব্যবসা করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিলেন। বারওয়েল নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা উপার্জন করেছিলেন। 

মুর্শিদাবাদের ব্রিটিশ রেসিডেন্ট মি. সাইকস মাত্র দু’বছরে উপার্জন করেছিলেন প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা। কাঠ, সােরা ও রেশম ব্যবসা করে তিনি এই অর্থ উপার্জন করেন। ক্লাইভ বা ওয়ারেন হেস্টিংসের উপার্জন ছিল আরাে বেশি। হেস্টিংস নিজের প্রিয় পাত্রদের উপার্জন বৃদ্ধির জন্য তাদের হাতে সরকারের প্রয়ােজনীয় দ্রব্য সরবরাহ বা নির্মাণ কার্যের দায়িত্ব তুলে দিতেন। 

হেস্টিংসের ইম্পিমেন্টের সময় এইসব অবৈধ লেনদেন প্রধান অভিযােগ হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল। হেস্টিংসের অবৈধ চুক্তি প্রসঙ্গে কার্ল মার্ক লিখেছেন যে, “অ্যালকেমিস্টদের চেয়েও চালাক হেস্টিংসের প্রিয়পাত্ররা শূন্য থেকে সােনা তৈরি করার ক্ষমতা রাখত।” চার্লস গ্রান্ট, চার্লস ক্রাফট, জন সুলিভান প্রমুখ হেস্টিংসের বদান্যতায় অন্যায় পথে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। ড. সিনহা (N. K. Sinha) এই অর্থকে উপার্জন না বলে লুণ্ঠন’ বলা উচিত বলে মতপ্রকাশ করেছেন। ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পীয়ার এই কারণে পলাশী পরবর্তী কালকে ‘প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ লুণ্ঠনের যুগ’ (Age of Open and unashamed plunder) বলে অভিহিত করেছেন। 

অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা অবাধে বাংলার সােনা, রূপা ও সম্পদ হস্তগত করেছিল বলে গবেষক ব্রুকস্ এ্যাডামস (Brooks Adams) এই কাজকে ‘পলাশীর লুণ্ঠন’ বা ‘Plassey plunder’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

উপার্জিত অর্থের প্রায় সবটাই কোম্পানির কর্মচারী বা স্বাধীন বণিকেরা স্বদেশে পাঠিয়ে দিত। এজন্য তারা একাধিক পন্থা অবলম্বন করত। যেমন—

(১) কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মীরা মূল্যবান পাথর বা হীরে-জহরত ক্রয় করে ইংল্যাণ্ডে পাঠাত। সেখানে তা বিক্রি করে নগদ অর্থে পরিণত করা হত। 

(২) বেসরকারি বণিকরা তাদের অর্থ কোম্পানির তহবিলে জমা করে দিত। পরে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে বিল অব এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোম্পানির সদর দপ্তর থেকে সেই টাকা সংগ্রহ করে নিত।কিন্তু এই ব্যবস্থায় তাদের আয়ের গােপনীয়তা থাকত না। তাই তারা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ডাচ, ফরাসী, দিনেমার প্রভৃতি ইউরােপীয় কোম্পানির কাছে টাকা জমা দিতে শুরু করে। ঐসব কোম্পানি ইংল্যাণ্ডের ব্যাঙ্কে তাদের অর্থ হস্তান্তর করে দিত। এই ব্যবস্থায় উভয়পক্ষ লাভবান হয়। ব্রিটিশ বণিকদের আয় ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে গােপন থাকে। 

আবার ঐ অর্থ বিনিয়ােগ করে অন্যান্য ইউরােপীয় বণিকেরা বাংলাদেশ থেকে মাল সংগ্রহ করে বাণিজ্য চালাতে সক্ষম হয়। এজন্য এখন আর তাদের স্বদেশ থেকে সােনা, রূপা আনার প্রয়ােজন থাকে না। আর সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলার অর্থনীতি। দেশের সম্পদ বাইরে চলে যায় ; আবার ওলন্দাজ, দিনেমারদের মাধ্যমে যে সােনা-রূপা আমদানি হত তাও বন্ধ হয়ে যায়।

(৩) ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দের পরে ইংরেজ বণিকেরা নিজেদের বাণিজ্য সংস্থা গড়ে তােলে। এগুলিকে বলা হত ‘এজেন্সী হাউস’। অতঃপর বণিকদের অর্জিত সম্পদ স্বদেশে পাঠানাের দায়িত্ব এই এজেন্সী হাউসগুলি পালন করত। 

সম্পদের নির্গমন এর পরিমান 

ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি নানাভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাংলা থেকে ইংল্যাণ্ডে নিষ্ক্রমণ করতে থাকে। পলাশীর যুদ্ধের আগে কোম্পানি মাল কেনার জন্য স্বদেশ থেকে সােনা-রূপা বা বুলিয়ান আমদানি করত। বছরে প্রায় ৮/১০ কোটি মূল্যের বুলিয়ান তারা এদেশে আনত। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার নবাব বদলের খেলায় লিপ্ত থেক নজরানা হিসেবে বহু অর্থ অর্জন করে এবং ১৭৬৫-তে বাংলার দেওয়ানি পাওয়ার সূত্রে কোম্পানি বাংলার রাজস্বের অধিকারী হয়। বাংলাকে শােষণ করে তারা কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থের (রাজস্ব) মালিক হয়। 

নবাবী আমলের শেষ বছরে (১৭৬৪-৬৫ খ্রীঃ) বাংলার আদায় করা রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৮ লক্ষ ১৭ হাজার পাউণ্ড। ঠিক পরের বছরেই তা বেড়ে হল ১২ লক্ষ ৭০ হাজার পাউণ্ড। কোম্পানি নিজস্ব হিসেব অনুযায়ী ১৭৬৬-১৭৬৮ এই তিন বছরে তারা বাংলা থেকে রাজস্ব বাবদ আদায় করেছিল ৫ কোটি ৭ লক্ষ পাউণ্ড। প্রশাসনিক খরচ বাদ দিয়ে এই রাজস্বের বিশাল অংশ কোম্পানির প্রাপ্য হিসাবে থাকত। এখন কোম্পানি ভারতে পণ্য কেনার জন্য স্বদেশ থেকে বুলিয়ান আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরিবর্তে উদ্বৃত্ত রাজস্বের টাকা দিয়ে মাল কেনে এবং ব্যবসা করে। এই ব্যবস্থাকেই বলা হত লগ্নি’বা Investment | 

১৭৬৫-৬৬ থেকে ১৭৭০-‘৭১ অর্থবর্ষে অর্থাৎ ৬ বছরে কোম্পানি বাংলা থেকে মােট রাজস্ব আদায় করেছিল ১৩,০৬৬,৭৬১ পাউণ্ড। এর থেকে লগ্নি করেছিল ৪,০৩৭,১৫২ পাউণ্ড। অর্থাৎ মােট রাজস্বের ৩০ শতাংশেরও বেশি অর্থ লগ্নি মারফত বাংলার বাইরে চলে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, কোম্পানি তার চীনা বাণিজ্যের জন্যও ভারতীয় সম্পদ বিনিয়ােগ করত। চীনের সবুজ চা ও সাদা রেশম কেনার জন্য কোম্পানি বাংলা থেকে সােনা-রূপা চীনে পাঠাত। ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দের পর এই বাবদ কোম্পানি বার্ষিক প্রায় ২৪ লক্ষ টাকার সােনা-রূপা চীনে পাঠায়। পরে অবশ্য আফিমের বদলে তারা চীনের সাথে বাণিজ্য চালিয়েছিল। 

তৃতীয়ত, বাংলার উদ্বৃত্ত রাজস্ব থেকে কোম্পানি তাদের বােম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীর প্রশাসনিক ব্যয় মেটাত এবং ঐ দুই প্রেসিডেন্সীর বাণিজ্যে লগ্নির জন্য অর্থ সরবরাহ করত। ‘সিক্রের কমিটির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ১৭৭০-৭১ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই খাতে ২৩,৫৮,২৯৮ পাউণ্ড বাংলা থেকে পাঠানাে হয়েছিল। 

চতুর্থত, কোম্পানির ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রসার ও রক্ষার জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহের ব্যয়ভারও বাংলার রাজস্ব থেকে মেটানাে হত। ইঙ্গ-মারাঠা’, ‘ইঙ্গ-মহীশূর’ ও ‘ইঙ্গ-ফরাসী’ যুদ্ধে বাংলার বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সর্বোপরি ছিল কোম্পানির অংশীদারদের প্রাপ্য লভ্যাংশ অর্থ।

ড. জে. সি. সিংহ দেখিয়েছেন (Economic Analysis of Bengal) যে, ১৭৬৬ থেকে ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে কোম্পানি এই খাতে বাংলা থেকে প্রায় ১ কোটি পাউণ্ড স্বদেশে পাঠিয়েছিল।

জেমস্ গ্রান্ট তার Analysis of the Finances of Bengal’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ ইংরেজের লগ্নি, চীনা দ্রব্য ক্রয় এবং ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মুনাফা বাবদ বার্ষিক প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা বাংলা থেকে চালান হত। প্রিন্সেপ (J. A. Princep)-এর হিসাব অনুযায়ী

১৮১৩-২২ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বাংলার আর্থিক নিষ্ক্রমণের পরিমাণ ছিল ৩ থেকে ৪ কোটি পাউণ্ড। পলাশী-পরবর্তী একশাে বছরে ঠিক কি পরিমাণ অর্থ ইংল্যাণ্ডে চালান হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট হিসেব পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই স্বদেশে পাঠানাে হত। তবে এর পরিমাণ যে বিশাল এবং তার পরিণতি যে বাংলার ক্ষেত্রে সর্বনাশাত্মক—একথা কোন কোন ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তির মুখেও শােনা গেছে।

 ব্রিটেনের লর্ড-সভার সদস্য এবং একদা ভারতের বড়লাট লর্ড এলেনবরা পার্লামেন্টে স্বীকার করেছিলেন (১৮৪০ খ্রঃ) যে, “ভারত থেকে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ লক্ষ পাউণ্ড ব্রিটেনে আসে, পরিবর্তে ভারত প্রায় কিছুই পায় না।”মাদ্রাজ রাজস্ব বাের্ডের সভাপতি জন সুলিভান-এর মন্তব্যটি এক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন “আমাদের শাসনব্যবস্থা অনেকটা স্পঞ্জধর্মী। এই স্পঞ্জধর্মী শাসন গঙ্গাতীরবর্তী দেশ থেকে সকল সম্পদ শুষে নেয় এবং তা টেমস তীরবর্তী দেশে এনে নিংড়ে দেয়।

সম্পদের নিষ্কাশন এর সমালোচনা | সম্পদের নির্গমন সমালোচনা

ইংরেজের অর্থনীতির সমর্থনে স্যার জন স্ট্রাচি লিখেছেন যে, ইংরেজগণ ভারতে শান্তি-শৃঙ্খলা বিধান করার মূল্য হিসেবেই অর্থ পেয়েছে, অকারণে নয়। তাঁর মতে, এই অর্থ দ্বারা ইংল্যাণ্ডে ভারতের জন্য দ্রব্য ক্রয় ও কম ঋণে সুদ সংগ্রহ করা হয়েছিল, যা ভারতের সমৃদ্ধির সহায়ক হয়েছিল।

থিওডর মরিসন Economic Transition in India’ গ্রন্থে বাংলার সম্পদ নিষ্ক্রমণকে একতরফা বলে মানতে অস্বীকার করেছেন। তার মতে, আলােচ্য পর্বে বাংলার রপ্তানি বেড়েছিল। এর ফলে কাঁচামাল উৎপাদকরা লাভবান হয়েছিল। কলে প্রস্তুত সূতা আমদানির ফলে বাংলার তাঁতীরাও লাভবান হয়েছিল। পি. জে. মার্শালও তার ‘East India Fortunes Bengal’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, বাংলার সম্পদ থেকে ইংরেজ যেমন লাভবান হয়েছিল, তেমনি কোম্পানির শাসনে বাংলাদেশও তাদের সেবা (Service) ভােগ করার সুবিধা পেয়েছিল। বাংলার প্রশাসন পরিচালনা ও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত কোন অর্থ বাংলাকে ব্যয় করতে হয়নি। তাছাড়া কোম্পানির সহযােগী দেশীয় গােমস্তা বা বেনিয়ানরাও এতে উপকৃত হয়েছিল। 

কিন্তু ড. রমেশচন্দ্র দত্ত, এন, কে, সিংহ, ড. অম্লান দত্ত প্রমুখ ভারতীয় ইতিহাসবিদ এই যুক্তি মানতে অস্বীকার করেছেন। এঁরা মনে করেন, লুণ্ঠনের সমর্থনে স্ট্রাচির বক্তব্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অর্থনীতির সংজ্ঞা আদৌ সমর্থনযােগ্য নয়। মরিসন বা মার্শালের মন্তব্যও অন্ধ জাতীয়তাবােধে দুষ্ট। আলােচ্য একশাে বছরে যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদ আমদানি হয়েছিল, তার থেকে রপ্তানি ছিল অনেক বেশি। 

তাছাড়া আমদানিকৃত পণ্যাদিও মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে সম্পদ নির্গমনের পথ প্রশস্ত করেছিল। এজেন্সী-প্রথার মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের ফলে উৎপাদকরাও সীমাহীন অবিচারের শিকার হয়েছিল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বাংলার আর্থিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ধ্বসে পড়েছিল। তাই নিরপেক্ষ কোন ইংরেজ রাজনীতিবিও কোম্পানির এই নগ্ন অর্থনীতি ও সীমাহীন শােষণের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি।

File Details
File Name/Book Nameসম্পদের বহির্গমন pdf
File FormatPDF
File LanguageBengali
File Size185 KB
File LocationGOOGLE DRIVE
Download LinkClick Here to Download PDF File
Join Telegram Members

Leave a Comment