ভিয়েনা সম্মেলনের মূল নীতি গুলি আলোচনা কর|ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা কর। ভিয়েনা সম্মেলন PDF 1815?

ভিয়েনা সম্মেলনের মূল নীতি গুলি আলোচনা কর|ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা কর। ভিয়েনা সম্মেলন PDF 1815? সম্পর্কে আজকে এই পোস্টের মাধ্যমে আলোচনা করা হবে। তোমরা যারা ভিয়েনা সম্মেলন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য যেমন ভিয়েনা চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয়? ভিয়েনা কংগ্রেসের তিনটি নীতি ভিয়েনা সম্মেলন কবে কোথায় অনুষ্ঠিত হয় ভিয়েনা কংগ্রেসের নীতি ক? ? শক্তিসাম্য নীতি কিভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি কে ছিলেন? ভিয়েনা সম্মেলনের মধ্য মনি কে ছিলেন? ভিয়েনা সম্মেলন কেন সংঘটিত হয়েছিল? ভিয়েনা সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিনিধি কে ছিলেন? ভিয়েনা সম্মেলনের তিনটি নীতি কি ছিল? ক্ষতিপূরণ নীতি কি?ন্যায্য অধিকার নীতি কি?ভিয়েনা সম্মেলন কখন অনুষ্ঠিত হয়? ভিয়েনা সম্মেলনের মূল নীতি কি? 

এছাড়াও ভিয়েনা ঘোষণাপত্রের মূল বিষয়বস্তু কি ছিল? ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য? ভিয়েনা সম্মেলনের ফ্রান্সের প্রতিনিধি কে ছিলেন? ভিয়েনা সম্মেলনের নীতি গুলি কি কি?ভিয়েনা সম্মেলনের গুরুত্ব? ভিয়েনা সম্মেলনে কোন কোন নীতি ঘোষিত হয়েছিল ইত্যাদি প্রশ্ন সম্পর্কে তোমরা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এই পোষ্টের মাধ্যমে পেয়ে যাবে তো বন্ধুরা তোমরা নিচের পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়ে নাও সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে

ভিয়েনা সম্মেলনের মূল নীতি গুলি আলোচনা কর|ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা কর। ভিয়েনা সম্মেলন PDF 1815? 

Table of Contents

ভিয়েনা সম্মেলন বলতে কী বোঝো ?|ভিয়েনা সম্মেলন কেন সংঘটিত হয়েছিল

লিপজিগের যুদ্ধে (১৮১৩ খ্রিঃ) শােচনীয় পরাজয়ের পর নেপােলিয়নকে ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয় (১৮১৪ খ্রিঃ)। তিনি রাজ্যজয় ও সাম্রাজ্য বিস্তারের দ্বারা ইউরােপের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তাই তার নির্বাসনের পর ইউরােপীয় রাজ্যগুলির পুনর্গঠন,সীমানার পুনর্বিন্যাস এবং নেপােলনীয় যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত অপরাপর নানা সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে ইউরােপীয় শক্তিবর্গ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মিলিত হয় (১৮১৫ খ্রিঃ) যা ইতিহাসে ভিয়েনা সম্মেলন নামে পরিচিত।

ভিয়েনা সম্মেলন কে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন বলা হয় কেন?

ইতিমধ্যে নেপােলিয়ন অকস্মাৎ ফ্রান্সে প্রত্যাবর্তন করলে (১লা মার্চ, ১৮১৫ খ্রিঃ) ইউরােপীয় নেতৃমণ্ডলী সাময়িকভাবে সম্মেলনের কাজকর্ম স্থগিত রেখে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই জুন ওয়াটার্লুর যুদ্ধে তার চূড়ান্ত পরাজয়ের পর পুনরায় সম্মেলনের কাজকর্ম শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের রাজা, রাজনীতিজ্ঞ ও সাংবাদিকদের উপস্থিতির ফলে ভিয়েনা সম্মেলন এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের রূপ ধারণ করে।ইউরােপে এর আগে এত জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন আর হয় নি। 

অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস এই সম্মেলনে যােগদানকারী প্রতিনিধিদের জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার পাউন্ড মুদ্রা ব্যয় করতেন। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের এই সম্মেলন সমগ্র ইউরােপ তথা সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। বস্তুত এত বড়াে রাজনৈতিক সমাবেশ ইতিপূর্বে আর কখনও অনুষ্ঠিত হয় নি। 

ভিয়েনা সম্মেলনে কোন কোন দেশ অংশগ্রহণ করেছিল ?

পােপ ও তুরস্কের সুলতান ছাড়া ইউরােপের সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই সম্মেলনে যােগ দেন। সমসাময়িক তিনজন রাজা এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন অস্ট্রিয়ার রাজা প্রথম ফ্রান্সিস, প্রাশিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিক উইলিয়ম এবং রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার। উপস্থিত কূটনীতিকদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ, ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসালরি ও ডিউক অফ ওয়েলিংটন, প্রাশিয়ার মন্ত্রী হার্ডেনবার্গ ও হামবােল্ড, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেসেলরােড। এছাড়াও এখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ছােটো ছােটো দেশের রাজা ও কূটনীতিজ্ঞরা। ঐতিহাসিক হ্যাজেন (Hazen)-এর মতে, এই সম্মেলনে আলােচিত সমস্যাবলীর জটিলতা, ব্যাপকতা, গৃহীত সিদ্ধান্ত, গুরুত্ব এবং সম্মেলনে যােগদানকারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে একে ইউরােপের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ বলা যায়।

বিগ ফোর বা চার প্রধান নামে কারা পরিচিত 

ইউরােপের সব দেশের কূটনীতিকরা এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও, নেপােলিয়নের পতনে বিশিষ্ট ভূমিকা-গ্রহণকারী চারটি রাষ্ট্র-অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রাশিয়া ও ইংল্যান্ড এই সম্মেলনে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। এই চার শক্তি ‘চার প্রধান’ বা ‘Big Four’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চার শক্তি ব্যতীত সম্মেলনে যােগদানকারী অন্যান্য প্রতিনিধিদের বিশেষ কোনও ভূমিকা ছিল না—তারা সম্মেলনের শােভাবর্ধনকারী ছিলেন মাত্র। এই সম্মেলনের প্রধান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ, রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার, ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট স্টিয়ার্ট ক্যাসালরি এবং পরাজিত ফ্রান্সের প্রতিনিধি তালেরা। 

ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি 

সম্মেলনের সভাপতি মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও মূল নিয়ন্ত্রক। তিনি ছিলেন এক বর্ণময় চরিত্র—সুদর্শন, সুবক্তা এবং অতি বিচক্ষণ কূটনীতিক। তিনি নিজেকে বিজয়ীর বিজয়ী’ (‘Conqueror of Conqueror’) বলে গর্ববােধ করতেন। ভিয়েনা সম্মেলনের ঘূর্ণিজলে তিনি স্বচ্ছন্দে ভেসে বেড়াতেন। এই সম্মেলনে মেটারনিখের পরেই সর্বাধিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার। নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরােপীয় শক্তিবর্গকে যথেষ্ট সাহায্য করার জন্য ভিয়েনা সম্মেলন এবং ইউরােপীয় রাজনীতিতে তিনি প্রভূত সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করেন। ফরাসি প্রতিনিধি তালেরাঁ এই সম্মেলনে যথেষ্ট গুরুত্ব অর্জন করেন। পরাজিত ফ্রান্সের প্রতিনিধি হয়ে তার লক্ষ্য ছিল সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের সম্মিলিত ক্ষোভ থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করা। এ কাজে তিনি যথেষ্ট সফল হন।

ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য |ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান সমস্যা 

সম্মেলনের প্রতিনিধিদের সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা উপস্থিত হয়েছিল। নেপােলিয়নােত্তর যুগের ওই জটিল সমস্যাগুলির সমাধানই ছিল এই সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। সমস্যাগুলি হল—(১) নেপােলিয়নের আগ্রাসনের ফলে সমগ্র ইউরােপের মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছিল। ইউরােপের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামাের পুনর্গঠন, (২) নেপােলিয়ন কর্তৃক বিতাড়িত পুরােনাে রাজবংশগুলির পুনঃপ্রতিষ্ঠা, (৩) ফ্রান্স যাতে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ইউরােপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা, (৪) নেপােলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত গােপন চুক্তিগুলির মর্যাদা দান, (৫) পােল্যান্ড, ইতালি ও জার্মানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা, (৬) ব্যাভেরিয়া, স্যাক্সনি ও রাইন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করা, (৭) নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলির ক্ষতিপূরণ করা এবং (৮) ভবিষ্যতে ইউরােপে যাতে শক্তিসাম্য বজায় থাকে তার ব্যবস্থা করা।

ভিয়েনা সম্মেলনে কোন কোন নীতি ঘোষিত হয়েছিল|ভিয়েনা সম্মেলনের নীতি গুলি কি কি|ভিয়েনা সম্মেলনের তিনটি নীতি কি ছিল|ভিয়েনা কংগ্রেসের তিনটি নীতি

ইউরােপের পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবর্গ প্রধানত তিনটি নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতিগুলি হল—(১) ন্যায্য অধিকার নীতি (Principle of Legitimacy), (২) ক্ষতিপূরণ নীতি (Principle of Compensation) এবং (৩) শক্তিসাম্য allo (Principle of Balance of Power) |

নায্য অধিকার নীতি|ভিয়েনা সম্মেলনের ন্যায্য অধিকার নীতি 

(১) ন্যায্য অধিকার নীতিঃ- ন্যায্য অধিকার নীতির পক্ষে সর্বাপেক্ষা জোরালাে সমর্থক ছিলেন ফরাসি প্রতিনিধি ট্যালির্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরােপে যথাসম্ভব প্রাক্-বিপ্লব যুগের পুনঃপ্রবর্তন। এই নীতি অনুসারে ফরাসি বিপ্লবের আগে যে রাজা বা রাজবংশ যেখানে রাজত্ব করতেন সেখানে তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে ফ্রান্সে বুরবো শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের যে রাজ্যসীমা ছিল তাই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। স্পেন, সিসিলি ও নেপলস্-এ বুরবো বংশের আরেক শাখা কর্তৃত্ব ফিরে পায়। হল্যান্ডে অরেঞ্জ বংশ, স্যাভয়, জেনােয়া, সার্ডিনিয়া ও পিডমন্টে স্যাভয় বংশ এবং মধ্য ইতালিতে পােপের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এইভাবে ইতালি আবার একটি ভৌগােলিক সংজ্ঞায় পরিণত হয়। এই নীতি অনুসারেই উত্তর ইতালি ও জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বলা বাহুল্য, এই নীতি কিন্তু সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রযােজ্য হয় নি। ভেনিস ও জেনােয়ায় প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নি। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে বিলুপ্ত জার্মান রাজ্যগুলি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি—সেখানে অস্ট্রিয়ার সভাপতিত্বে ৩৯টি জার্মান রাজ্য নিয়ে একটি ‘বুন্ড’ বা রাজ্য-সমবায় গঠিত হয়। বেলজিয়ামকে জোর করে হল্যান্ডের সঙ্গে এবং নরওয়েকে ডেনমার্কের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সুইডেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। সুতরাং ন্যায্য অধিকার নীতি নয়-নেতৃবর্গ নিজ স্বার্থ দ্বারাই পরিচালিত হয়েছিলেন।

ক্ষতিপূরণ নীতি|ভিয়েনা সম্মেলনের ক্ষতিপূরণ নীতি 

(২) ক্ষতিপূরণ নীতিঃ- নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরােপের বহু রাষ্ট্র, বিশেষত ইংল্যান্ড, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, সুইডেন প্রভূত ক্ষতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ক্ষতিপূরণ নীতি অনুসারে তারা বেশ কিছু অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। (১) অস্ট্রিয়া উত্তর ইতালিতে লম্বার্ডি ও ভেনেশিয়া, পােল্যান্ডের অংশবিশেষ, টাইরল ও ইলিরিয়ান প্রদেশগুলি লাভ করে। মধ্য ইতালির পার্মা, মডেনায় অস্ট্রিয়ার হ্যাপস্বার্গ বংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া, নবগঠিত জার্মান কনফেডারেশনের নেতৃত্বও অস্ট্রিয়ার হাতে আসে। (২) প্রাশিয়া পায় স্যাক্সনির উত্তরাংশ, পােজেন, থর্ন, ডানজিক, রাইন অঞ্চল ও পশ্চিম পােমেরেনিয়া। (৩) রাশিয়া পায় ফিনল্যান্ড, তুরস্কের বেসারাবিয়া এবং পােল্যান্ডের বৃহদংশ। এ সময় থেকে ইউরােপীয় রাজনীতিতে রুশ প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। (৪) ইংল্যান্ড ইউরােপীয় মহাদেশের বাইরে কিছু সামরিক ও বাণিজ্যকেন্দ্র লাভ করে। সেগুলি হল—ভূমধ্যসাগরের মাল্টা দ্বীপ, আইওনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, হেলিগােল্যান্ড, কেপ কলােনি, ত্রিনিদাদ, মরিশাস ও সিংহল।

শক্তিসাম্য নীতি|ভিয়েনা সম্মেলনের শক্তিসাম্য নীতি 

(3) শক্তিসাম্য নীতিঃ- শক্তিসাম্য নীতির মূল কথা হল আগামীদিনে ফ্রান্স যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠে ইউরােপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে এবং বিজয়ী শক্তিবর্গের মধ্যে কেউ যাতে একে অন্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী না হয়ে ওঠে, সেদিকে লক্ষ রাখা। এই নীতি অনুসারে ফ্রান্সের সীমানাকে বিপ্লব-পূর্ব সীমারেখায় ঠেলে দেওয়া হয়, ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে সেখানে পাঁচ বছরের জন্য মিত্রপক্ষের সেনাদল মােতায়েন করা হয়, এই সেনাদলের খরচ ফ্রান্সের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ফ্রান্সকে ৭০ কোটি ফ্রাঙ্ক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া, ইউরােপের নিরাপত্তার তাগিদে ফ্রান্সের চারপাশে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রবেষ্টনী গড়ে তােলা হয়। (ক) ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে, (খ) ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তে রেনিস প্রদেশ বা রাইন জেলাগুলিকে প্রাশিয়ার সঙ্গে, (গ) ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বে কয়েকটি জেলাকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এবং (ঘ) ফ্রান্সের দক্ষিণে স্যাভয় ও জেনােয়াকে পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত করে ফ্রান্সের চারপাশে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তােলা হয়, যাতে ফ্রান্স কখনােই । ইউরােপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে। 

ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ন 

মূল্যায়ন (Evaluation) আধুনিক ইউরােপের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হলেও ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যাবলী কিন্তু কখনােই সমালােচনার উর্ধ্বে নয়। এর পক্ষে ও বিপক্ষে ঐতিহাসিকরা নানা মত ব্যক্ত করেছেন।

ভিয়েনা সম্মেলনের সমালোচনা 

বিরুদ্ধ মত:- 

(১) ভিয়েনা সম্মেলন নামেমাত্রই ইউরােপীয় রাষ্ট্রবর্গের সম্মেলন ছিল। ইউরােপের বিভিন্ন রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যােগ দিলেও অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া ও ফ্রান্স—এই পাঁচটি রাষ্ট্রই ছিল সব। সম্মেলনের বাইরে নিজেদের গােপন বৈঠকে তারা সব কিছু ঠিক করে রাখত। এই সম্মেলন ছিল তাদের সেই পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তগুলিকে আইনানুগভাবে গ্রহণের অনুষ্ঠান-মাত্র। ঐতিহাসিক রাইকার-এর মতে, ভিয়েনা সম্মেলন কখনােই কোনও সম্মেলন ছিল না। পাঁচটি বৃহৎ শক্তির বিদেশমন্ত্রীরাই ছিলেন সম্মেলন। 

(২) সম্মেলনের লক্ষ্য হিসাবে উদ্যোক্তারা ‘ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে’ ইউরােপের পুনর্গঠন, ‘ইউরােপের সমাজ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস’, ‘ইউরােপের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ’ প্রভৃতি বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা বললেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরাজিত দেশগুলির রাজ্যাংশ গ্রাস এবং নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা। ফলাফলের বিচারে অনেকেই এই সম্মেলনকে ‘একান্ত প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা’ (a great deception and a betrayal’) বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক ডেভিড টমসন-এর মতে, এই সম্মেলন ছিল ‘আত্মস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে দর কষাকষি ও সমঝােতার প্রতিফলন’ (‘A network of bargains and negotiated compromises.”)। ঐতিহাসিক হ্যাজেন বলেন যে, ভিয়েনায় সমবেত রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের সম্পত্তির মতােই তাদের ইচ্ছামতাে ইউরােপের পুনর্গঠন করেন। প্রাশিয়ার নেপােলিয়ন-বিজেতা সেনাপতি রুকার এই সম্মেলনকে ‘গবাদি পশুর মেলা’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

(৩) ভিয়েনা সম্মেলনের নেতারা ছিলেন রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল। অষ্টাদশ শতকের ঘুণধরা মানসিকতা নিয়ে তারা ইউরােপ পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। বিপ্লবের তরঙ্গে ভেসে আসা গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ উপলব্ধি করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পুরােনাে যুগ, মানসিকতা ও মতাদর্শের প্রতিনিধি এইসব নেতৃবৃন্দের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজ নিজ দেশের স্বার্থসিদ্ধি। অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, অষ্টাদশ শতকের মানসিকতায় গড়া ভিয়েনা সন্ধি উনিশ শতকের দ্রুতগামী ঐতিহাসিক জগতে বাতিল হয়ে যায়।

(৪) ভিয়েনা বন্দোবস্তের অস্থায়িত্বই হল এর সবচেয়ে বড়াে ত্রুটি। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃমণ্ডলী পুরাতনতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হন, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরােপে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের ফলেই ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত ও সংশােধিত হতে শুরু করে। অধ্যাপক হেজ (Hayes)-এর মতে, এইসব রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের খুব অল্পই ছিল চিরস্থায়ী এবং বেশির ভাগই ছিল ক্ষণস্থায়ী। বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের সংযােজন মাত্র পনেরাে বছর স্থায়ী হয়—১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের পর বেলজিয়াম হল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘােষণা করে। ইতালি ও জার্মান-ব্যবস্থাও মাত্র পঞ্চান্ন বছরের মতাে স্থায়ী হয়—১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ও জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ে ও সুইডেন পৃথক হয়ে পড়ে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ফিনল্যান্ড রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

(৫) সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ ন্যায্য অধিকার নীতির উপর গুরুত্বের কথা ঘােষণা করলেও সর্বদা তা বাস্তবায়িত হয় নি। শক্তিসাম্য নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ন্যায্য অধিকারের আদর্শ বারংবার লজ্জিত হয়েছে। ফ্রান্স, রােম, সিসিলি প্রভৃতি দেশের ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকারের নীতি প্রযুক্ত হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়ােগ করা হয় নি। নেপোলিয়ন ‘পবিত্র রােমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু ভিয়েনাতে তার পুনরুত্থাপন ঘটানাে হয় নি। জেনােয়া ও ভেনিসের প্রজাতান্ত্রিক লজ্জিত সরকারের পুনর্বাসন হয় নি, পােল্যান্ডের পূর্বাবস্থা ফিরে আসে নি—সেখানে রাশিয়ার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পােল্যান্ড ছাড়া পশ্চিম জার্মানি, স্যানি, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড বা বেলজিয়ামের ক্ষেত্রে বৈধ অধিকার নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করা হয় নি। (ক) আসলে ভিয়েনায় সমবেত কূটনীতিকরা বৈধাধিকার বলতে কেবলমাত্র রাজতন্ত্রের বৈবাধিকারের কথাই ভেবেছেন—প্রজা, প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের নয় (খ) রাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে বৈবাধিকার নীতি পালিত হলেও প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে তা অস্বীকৃত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মেটারনিখ বলেন যে, “এ যুগে প্রজাতান্ত্রিক শাসন অচল হয়ে গেছে।” (গ) বৃহৎ রাষ্ট্রগুলির স্বার্থে এবং শক্তিসাম্য ও ক্ষতিপূরণ নীতি প্রয়ােগ করতে গিয়ে বহুক্ষেত্রেই বৈধ অধিকার নীতি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। অধ্যাপক হ্যাজেন বলে যে, ন্যায্য অধিকার নীতিটি ছিল বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গের ‘আলঙ্কারিক আড়ম্বর মাত্র।

(৬) সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ যুগধর্ম অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত গণতন্ত্র, উদারত ও জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শকে উপেক্ষা করে ইতিহাসের বাতিল হয়ে যাওয়া আদর্শগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এ জন্যই তারা ইতালি,জার্মানি, স্পেন, পােল্যান্ড ও ইউরােপের অন্যান্য স্থানে প্রস্ফুটিত জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছিলেন। এ জন্যই তারা হল্যান্ডের সঙ্গে বেলজিয়াম ও নরওয়ের সঙ্গে সুইডেনকে সংযুক্ত করেন, পােল্যান্ডকে অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে বণ্টন করেন,ইতালি ও জার্মানির ঐক্যের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টিকরেন এবং দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে ফরাসি শাসনাধীনে থেকে ফরাসি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ রাইন নদীর পশ্চিম-তীরবর্তী অঞ্চলগুলিকে প্রাশিয়া, ব্যাভেরিয়া ও হল্যান্ডের মধ্যে বন্টন করেন অধ্যাপক হ্যাজেন বলেন যে, “ভিয়েনা কংগ্রেস ছিল অভিজাতদের সম্মেলন। তাদের কাছে ফরাসি বিপ্লব-ঘােষিত জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র দুর্বোধ্য ও ঘৃণ্য ছিল।” তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভিয়েনা সম্মেলন ছিল প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

ভিয়েনা সম্মেলনের গুরুত্ব | ভিয়েনা সম্মেলনের ইতিবাচক দিক 

নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও ভিয়েনা সম্মেলনকে একেবারে অর্থহীন বা প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দেওয়া যুক্তিসম্মত হবে না।

 (১) বিপ্লব ও যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউরােপের মানুষ শান্তির জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড নিকলসন বলেন যে, ভিয়েনা বন্দোবস্ত দীর্ঘদিন ইউরােপকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। অধ্যাপক ডেভিড টমসন-এর মতে, ভিয়েনা সম্মেলন মােটামুটিভাবে চল্লিশ বছরের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এই শান্তির ফলেই ইউরােপে সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে।

(২) পৃথিবীতে কোনও শান্তিচুক্তিই চিরস্থায়ী নয়। ঐতিহাসিক হারশ (Hearnshaw) এর মতে, ভিয়েনার নেতৃবর্গ কেউই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মহাপুরুষ ছিলেন না—তারা ছিলেন রাজনীতিক মাত্র। সুতরাং, তারা যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী স্থায়িত্ব শান্তিচুক্তি স্থাপনে সক্ষম হবেন, এমন আশা করা অন্যায়। এছাড়া, নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বিভিন্ন শক্তিবর্গ নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন গােপন চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যভাগের বন্দোবস্ত করেছিল। ভিয়েনা চুক্তি সম্পাদনকালে এই গােপন চুক্তিগুলিকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং নেতৃমণ্ডলীর পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনও উপায় ছিল না। এ সত্ত্বেও এই চুক্তির স্থায়িত্ব সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই। বারট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russel) বলেন যে, স্থায়িত্বের বিচারে ভিয়েনা ব্যবস্থা ১৯১৯-এর ভার্সাই ব্যবস্থা অপেক্ষা কৃতিত্বপূর্ণ। ইতিপূর্বে ইউরােপের রাষ্ট্রবর্গের মিলিত কোনও সিদ্ধান্তই ভিয়েনার মতাে দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।

(৩) বলা হয় যে, ভিয়েনার নেতৃবর্গ গণতন্ত্র, উদারনৈতিকতা ও জাতীয়তাবাদকে উপেক্ষা করেছেন। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন-এর মতে, এ অভিযােগ যথার্থ নয়, কারণ “১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে খুব কম লােকই গণতন্ত্র ও উদারতন্ত্রের তাৎপর্য বুঝেছিল। সুতরাং সন্ধি-নির্মাতাদের উপর দোষারােপ করা নিষ্ফল।”২. ঐতিহাসিক ক্রোসি-র মতে, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে উদারনীতি ছিল একটি ‘অর্ধজাগ্রত প্রবণতা এবং সংখ্যালঘিষ্ঠের ধর্ম। সীম্যান (Seaman) বলেন যে, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদের আদর্শ গ্রহণ করা অসম্ভব ও অনভিপ্রেত ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি বেলজিয়াম ও জার্মানির কথা বলেছেন। তাঁর মতে ১৮১৫—এমনকী ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দেও স্বাধীন বেলজিয়ামের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত না করলে তা ফ্রান্সের আক্রমণের শিকার হত। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ঐক্যের কোনও সম্ভাবনা ছিল না, এবং কেউ তা চায়ও নি। ইতালিকে অস্ট্রিয়ার অধীনে না আনলে ফ্রান্স সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হত। অধ্যাপক গর্ডন ক্রেইগ (Gordon Craig) বলেন যে, ভিয়েনার নেতৃমণ্ডলী তখন যদি ইউরােপে ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত ভাবধারা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতেন, তাহলে ইউরােপে অশান্তি দেখা দিত, বিভিন্ন রাজন্যবর্গ তা মানতেন না এবং এর ফলে ইউরােপে শান্তি প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত হত। 

(৪) ভিয়েনা চুক্তির উদারতা অতি প্রশংসনীয়। এই চুক্তি ইউট্রেক্টের সন্ধি (১৭১৩ খ্রিঃ) বা ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯ খ্রিঃ) অপেক্ষা অনেক উদার ছিল। এর মধ্যে নতুন কোনও যুদ্ধ বা অশান্তির বীজ নিহিত ছিল না। ভিয়েনা চুক্তিতে ফ্রান্সের প্রতি কঠোর প্রতিশােধমূলক কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। পরাজিত ফ্রান্সের সঙ্গে যে প্যারিসের দ্বিতীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার নমনীয়তায় দার্শনিক রাসেল বিস্মিত হয়েছিলেন। এই সন্ধি ভার্সাই সন্ধির (১৯১৯ খ্রিঃ) মতাে জার্মানির উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া (‘Dictated Peace’) হয় নিভিয়েনা সন্ধির শর্ত আলােচনায় ফ্রান্স ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অধ্যাপক হবস্ব এই চুক্তিকে বাস্তবােচিত ও যুক্তিসম্মত (realistic and sensible) বলে অভিহিত করেছেন। গ্রান্ট ও টেম্পারলি বলেন যে, ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ পুরাতনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ব্রতী হলেও এবং নতুন মতাদর্শগুলিকে অগ্রাহ্য করলেও পুরাতনতন্ত্রের উৎকৃষ্ট দিকগুলিই তাঁরা তুলে ধরেছিলেন। এটি ছিল প্রকৃতই একটি শান্তির উদ্যোগ। কেটেলবি বলেন যে, এই ভিয়েনা বন্দোবস্তের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ইউরােপ গড়ে ওঠে।

(৫) এই সন্ধির মধ্যে ভবিষ্যতের কয়েকটি সম্ভাবনার বীজ নিহিত ছিল। (ক) ইতালিতে পিয়েডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে জেনােয়াকে যুক্ত করায় পিয়েডমন্ট-সার্ডিনিয়া ইতালির অন্যতম শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয় এবং এই রাজ্যের নেতৃত্বে ইতালির মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়। (খ) রাইন অঞ্চল প্রাশিয়ার অধীনে আসায় প্রাশিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আগামীদিনে প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য আন্দোলন শুরু হয়। (গ) ইউরােপের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার ভূখণ্ড লাভের ফলে তুরস্কের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং প্রাচ্য সমস্যার পুনরুত্থাপন ঘটে। এর ফলে গ্রিস স্বাধীনতা লাভ করে এবং সার্বিয়ায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৬) জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করলেও ভিয়েনা সম্মেলন আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে ‘লিগ অফ নেশনস’ এবং ‘ইউ. এন. ’র ভিত্তি এখানেই রচিত হয়। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন-এর মতে, নানা ত্রুটি সত্ত্বেও “ভিয়েনা ব্যবস্থা ছিল মােটামুটি একটি যুক্তিসঙ্গত ও রাষ্ট্রনীতিজ্ঞমূলক সন্ধি।”

FAQ’S ভিয়েনা সম্মেলন সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর 

১) ভিয়েনা সম্মেলন কবে কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?|ভিয়েনা সম্মেলন কখন অনুষ্ঠিত হয়?

উত্তরঃ- ১৮১৫ খ্রিঃ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে।

২) ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি কে ছিলেন

উত্তরঃ-ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিক

৩) ভিয়েনা সম্মেলন কেন সংঘটিত হয়েছিল

উত্তরঃ- নেপোলিয়ন বিভিন্ন দেশ দখল করে ইউরোপের মানচিত্র পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন সেগুলি পরিবর্তন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভিয়েনা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।

৪) ভিয়েনা সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিনিধি কে ছিলে

উত্তরঃ- রাশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন জার প্রথম আলেকজান্ডার

৫) ক্ষতিপূরণ নীতি কি?|ভিয়েনা সম্মেলনের ক্ষতিপূরণ নীতি কি ?

উত্তরঃ- ভিয়েনা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল ক্ষতিপূরণ নীতি। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেসব রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের সেই ক্ষতি পূরণ করার জন্য যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল তাঁকে ক্ষতিপূরণ নীতি বলা হয়।এই নীতির মাধ্যমে অস্ট্রিয়া উত্তর ইটালিতে লম্বার্ডি ভেনেসিয়া,টাইরল প্রভৃতি লাভ করে। ইংল্যান্ডের তার বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য ইউরোপের বাইরে মাল্টা মরিসাস প্রভৃতি পায়। অর্থাৎ নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য ভুক্ত অংশগুলি থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

৬)ন্যায্য অধিকার নীতি কি? ভিয়েনা সম্মেলনের ন্যায্য অধিকার নীতি কি?

উত্তরঃ-ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ন্যায্য অধিকার নীতি বলতে বোঝায় ফরাসি বিপ্লবের আগে যে রাজা বা রাজবংশ যেখানে রাজত্ব করত সেখানে আবার তাদের রাজত্ব করার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ ইউরোপে প্রাকঃ  বিপ্লব যুগের পুনঃ পরিবর্তন করা। এই নীতি অনুসারে ফ্রান্সের ব্যুরব রাজবংশ, ইংল্যান্ডে অরেঞ্জ রাজবংশ এবং ইতালিতে পোপের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

৭) শক্তিসাম্য নীতি কি? কেন সম্মেলনের শক্তিসাম্য নীতি কি 

উত্তরঃ-ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান তিনটি নীতির অন্যতম ছিল শক্তিসাম্য নীতি। এই নীতির মূল কথা হল আগামী দিনে ফ্রান্স যাতে শক্তিশালী হয়ে ইউরোপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ নীতি অনুসারে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে এবং রাইন প্রদেশগুলোকে প্রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। 

৮)ভিয়েনা সম্মেলনের ফ্রান্সের প্রতিনিধি কে ছিলেন

উত্তরঃ- তালেরা

৯) ভিয়েনা সম্মেলনে কোন কোন নীতি ঘোষিত হয়েছিল ভিয়েনা সম্মেলনের নীতি গুলি কি কি ভিয়েনা সম্মেলনের তিনটি নীতি কি ছিল? ভিয়েনা কংগ্রেসের তিনটি নীতি

উত্তরঃ- নায্য অধিকার নীতি শক্তিসাম্য নীতি  ও ক্ষতিপূরণ নীতি 

১০) ভিয়েনা সম্মেলনে কোন কোন দেশ অংশগ্রহণ করেনি ?

উত্তরঃ- পােপ ও তুরস্কের সুলতান ছাড়া ইউরােপের সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই সম্মেলনে যােগ দেন।

১১) ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি কে ছিলেন? ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন 

উত্তরঃ- সম্মেলনের সভাপতি মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের সভাপতি ও সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও মূল নিয়ন্ত্রক।

১২)ভিয়েনা সম্মেলনের মধ্য মনি কে ছিলেন

উত্তরঃ- অস্টিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিক

File Details
File Name/Book Nameভিয়েনা সম্মেলনের মূল নীতি গুলি আলোচনা কর
File FormatPDF
File LanguageBengali
File Size252 KB
File LocationGOOGLE DRIVE
Download LinkClick Here to Download PDF File
Join Telegram Members

Leave a Comment