সামন্ততন্ত্র বলতে কি বোঝো? ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো

প্রিয় বন্ধুরা আজকে আমরা আলোচনা করবো সামন্ততন্ত্র বলতে কি বোঝো? ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো। তোমরা যারা একাদশ শ্রেনীর শিক্ষার্থী তারা এই প্রশ্নটির উত্তরটির সহজেই পেয়ে যাবে। এছাড়াও তোমরা পেয়ে যাবে ভারতের সামন্ত প্রথার অস্তিত্ব নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি নিয়ে আলোচনা করো| প্রাচীন ভারতে গুপ্ত যুগের সামন্ত প্রথার অস্তিত্বের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি গুলি আলোচনা করো 

সামন্ততন্ত্র বলতে কি বোঝো? ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো

সামন্ততন্ত্রের সংজ্ঞা

সামন্ততন্ত্রের সংজ্ঞাঃ- ইংরেজি Feudalism কথাটির এসেছে লাতিন শব্দ ‘ফিওডালিস (Feodalis) এবং ফরাসি শব্দ ফেডালিতে’ (Feodalite) থেকে। যার বাংলা প্রতিশব্দ হল সামন্ততন্ত্র বা সামন্তপ্রথা। সামন্ততন্ত্রের সঙ্গা নিয়ে পণ্ডিত মহলে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও সাধারণভাবে সামন্ততন্ত্র বলতে এক বিশেষ শাসনতান্ত্রিক কাঠামােকে বােঝায় যেখানে কেন্দ্রীর শক্তির পরিবর্তে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি প্রাধান্য লাভ করে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরন ঘটে। আবার একটু অন্যভাবে বলা যায় যে, ভূমি মালিকানা ও ভুমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বা ব্যবস্থায় হল সামন্ততন্ত্র।

ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো

ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য 

ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মতামত দিয়েছেন যে, 300 থেকে 1200 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব বিকাশ এবং অবক্ষয় সম্পন্ন হয়েছিল। ভারতের সামন্ততন্ত্রের কাঠামো ইউরোপের মতাে না হলেও ভারতের সামন্ততন্ত্রের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা গিয়েছিল সেগুলি হল –

১) স্তরবিন্যাসঃ- ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের কাঠামো লক্ষ্য করলে এর স্তরবিন্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমাজে বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীদের আবির্ভাব  হয়েছিল। এরা ছিল রাজা ও কৃষকের মধ্যে মাঝের শ্রেণী। ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন স্তর তথা মহাপতি, স্বামী কর্ষকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে যেখানে মহাপতি হল রাজা, স্বামী হল জমির মালিক এবং কর্ষক হল কৃষক।

২) কৃষিভিত্তিক সমাজঃ- কৃষিভিত্তিক সমাজ ভারতীয় সামন্ততন্ত্র একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সমাজের নিম্ন স্তরের মানুষ কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং কৃষিকাজকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হত।ভারতীয় সামন্ততন্ত্রে শিল্প ব্যবসা বাণিজ্য ছিল অপ্রধান বা গৌন।

৩) নগরায়নের অভাবঃ- ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের যুগে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছিল। বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ার ফলে শিল্পোৎপাদন অপ্রয়োজনীয়’হয়ে পড়ে।এর ফলে নগরেরও পতন ঘটে। এই সময় কৌশাম্বী কুশিনগর শ্রাবস্তী  ইত্যাদি নগরের পতন হয়েছিল।  

৪)স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম্য জীবনঃ- ভারতীয় সামন্ততন্ত্র যুগে বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ার ফলে একদিকে যেমন নগরের পতন ঘটে তেমনি অন্যদিকে গ্রামগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে অর্থাৎ তারা নিজেরাই সকল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উৎপাদন করত এবং নিজেদের মধ্যে বন্টন করত। গ্রামীণ অর্থনীতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

৫)ভূমি ও মানুষের সম্পর্ক:- ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের উৎপাদন ব্যবস্থার মূল উপকরণ ছিল ভূমি। ভূমিকে কেন্দ্র করেই কৃষি কাজ চলত তাই ভূমি আর মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। 

৬)জমির ব্যক্তিগত মালিকানার অভাব: এই সময় জমিতে কৃষক উৎপাদকের ভূমিকা পালন করলেও তাদের জমিতে মালিকানা বা স্বত্ত্ব ছিল না। জমির মালিকানা ছিল ভূস্বামী, সামন্ত প্রভু এবং স্বয়ং রাষ্ট্রের হাতে।

ভারতের সামন্ত প্রথার অস্তিত্ব নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি নিয়ে আলোচনা করো | প্রাচীন ভারতে গুপ্ত যুগের সামন্ত প্রথার অস্তিত্বের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি গুলি আলোচনা করো 

ভারতের সামন্তপ্রথার বিতর্ক :- মধ্যযুগের ইউরােপের মতাে ভারতে গুপ্ত যুগে বা তার পরবর্তীকালে সামন্তপ্রথার অস্তিত্ব ছিল কি না তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন ভারতে ওইসময় সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। অপর দল মনে করেন মধ্যযুগের ইউরােপের মতাে ভারতে সামন্ততন্ত্রের কোনাে অস্তিত্ব ছিল না।

সামন্ত ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকার পক্ষে যুক্তি বা মতামত 

সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব থাকার পক্ষে মত :- ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ড. রামশরণ শর্মা, ড. ডি. ডি. কোশাম্বী, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঝা, অধ্যাপক এস. গােপাল, বি. এন. এস. যাদব, ভক্ত প্রসাদ মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন প্রাচীন ভারতে সামন্তপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। তাঁদের মতে প্রাচীন ভারতে সামন্তপ্রথার অস্তিত্ব ছিল এবং তারা সামন্ত প্রথার বিভিন্ন উপাদানগুলি তুলে ধরেছেন। যেমন-

i. এই সময় ভারতে দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। 

ii. এ সময়ে অগ্রহার ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। 

এই প্রথার থেকে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব হয়। 

iii. কৃষকদের জীবনে এ সময়ে কোনাে স্বাধীনতা ছিল না। তারা ছিল জমির সঙ্গে যুক্ত। 

iv. ভারতের বাণিজ্য ক্ষেত্রে এ সময়ে ক্রমশই অবনতি হচ্ছিল। 

v. ভারতের প্রাচীন নগরগুলির অবক্ষয় ঘটে। তবে এই মতের সমর্থকরা মনে করেন-পশ্চিম রােমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরােপে যে ধরনের সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটে ভারতের সামন্ততন্ত্র ঠিক সেই রকম ছিল না।

সামন্ত ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকার বিপক্ষে যুক্তি বা মতামত 

সামন্ততন্ত্রের বিপক্ষে যুক্তি : ড. ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, রণবীর চক্রবর্তী, ড. দীনেশ চন্দ্র সরকার, হরবনস মুখিয়া প্রমুখ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন মধ্যযুগের পশ্চিম ইউরােপের মতাে প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না। তারা তাঁদের মতের সমর্থনে প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন সামন্ত বিরােধী উপাদানগুলির কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, 

i) প্রাচীন ভারতে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল। যেমন- গুপ্ত বা হর্ষবর্ধন প্রমুখ। অতএব শাসকরা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রবর্তন করেন। 

ii) প্রাচীন ভারতে জমির মালিক ছিল কৃষকরা। ভূস্বামীরা ছিল রাজস্ব আদায়কারী মাত্র। 

iii). কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি এই সময় ভারতের ব্যাবসাবাণিজ্যের সমৃদ্ধি ঘটে। 

iv. প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন স্থানে নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। 

মূল্যায়ন:-একথা সত্য যে পশ্চিম ইউরােপের ধাঁচে ভারতে সামন্ততন্ত্র প্রাচীনকালে ছিল না। তবে প্রাচীনকালে ভারতের সমাজব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক সমাজের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য ছিল। এজন্য ঐতিহাসিক ড: এল ব্যাসাম ভারতের আর্থসামাজিক কাঠামোকে  ‘আধা-সামন্ততান্ত্রিক’ বা ‘সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের’ বলে অভিহিত করেছেন।

File Details
File Name/Book Nameসামন্ততন্ত্র বলতে কি বোঝো? ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো
File FormatPDF
File LanguageBengali
File Size112 KB
File LocationGOOGLE DRIVE
Download LinkClick Here to Download PDF File
Join Telegram Members

Leave a Comment