বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

বন্ধুরা আজকে তোমাদের সঙ্গে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সম্পর্কে আলোচনা করর|এই পোস্টের মাধ্যমে তোমরা বৈচিত্র্যের লীলাভূমি ভারত সম্পর্কে আলোচনা পেয়ে যাবে।

বৈচিত্র্যের লীলাভূমি ভারত: 

ভারতবর্ষ হল বৈচিত্র্যের লীলাভূমি। প্রাকৃতিক পরিবেশ, জনগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম, সামাজিক আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাত্রা প্রণালী—সব দিকেই এই বৈচিত্র্যের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণী, উত্তাল সমুদ্র, নদীমাতৃক, বিস্তীর্ণ সমভূমি, অসংখ্য নদ-নদী, গহন অরণ্যানী, ঊষর মরুপ্রান্তর প্রভৃতি এদেশকে অপরূপ বৈচিত্র্যে পূর্ণ করেছে। এই বৈচিত্র্যের প্রতি ইঙ্গিত করে ঐতিহাসিকেরা ভারতকে ‘বিশ্বের সারাংশ’ (‘epitome of the world’) বলে বর্ণনা করেছেন।

বৈচিত্র্যের মধ্যে মিলন: 

এই বিপুল বৈচিত্র্যের অন্তরালে একটি স্রোত যুগ যুগ ধরে ভারতীয় জনজীবনে প্রবাহিত। ঐক্য ও সমন্বয়ই হল ভারতীয় জীবনের মূল সুর। ঐতিহাসিক স্মিথ ভারতবাসীর সমন্বয়ের আদর্শকে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে সন্দেহাতীতভাবে ভারতে একটি মূলগত ঐক্য বিদ্যমান। এই ঐক্য ভৌগোলিক একত্ব ও রাজনৈতিক একতা অপেক্ষাও বহু গভীর ও অন্তরতর।

ভৌগোলিক ঐক্য: 

সুপ্রাচীন অতীত থেকেই হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগ ‘ভারতবর্ষ’ নামে পরিচিত। হিন্দু তীর্থস্থানগুলি উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা এবং পশ্চিমে দ্বারকা থেকে পূর্বে কামরূপ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। তীর্থযাত্রার মাধ্যমে একজন হিন্দু ভারতের সব অঞ্চলের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করে। হিন্দুদের আচমন মন্ত্রে কুরুক্ষেত্র, গয়া, গঙ্গা, পুষ্কর, নর্মদা ও কাবেরীর নাম একত্রে উচ্চারিত হয়। বলা বাহুল্য, এই ভাবগত ঐক্য ভারতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

সাংস্কৃতিক ঐক্য:

যুগ যুগ ধরে গ্রিক, পারসিক, শক, কুষাণ, পহ্লব, হন প্রভৃতি জাতির মানুষ পৃথক সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির চিরাচরিত মৌলিক রূপকে তারা কোনোভাবেই বিনষ্ট করতে পারেনি। ভারতবর্ষ যেমন আগন্তুক মতবাদকে গ্রহণ করে নিজ সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছে এবং বিদেশিরাও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে কালক্রমে ভারতীয় সমাজে বিলীন হয়ে গেছে।

ভাষাগত ঐক্য: 

জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময়তা থাকায় ভাষার বিভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক। গবেষণার ফলে জানা গেছে প্রাচ্য ভারতের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ভাষা ছিল খুব সম্ভবত অস্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষা। ওই ভাষার ঘনিষ্ঠতর আত্মীয়তা ছিল মন-খমের ভাষা পরিবারের সঙ্গে এবং কিছুটা আত্মীয়তা ছিল কোল-মুণ্ডা ভাষা পরিবারের সঙ্গে। ওই মুণ্ডা-মনখমের ভাষা ভিত্তির ওপর নতুন পলি রচনা করেছিল দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের স্রোত। আবার দ্রাবিড় ভাষা ব্যতীত অন্যান্য ভাষা মূলত সংস্কৃত থেকেই উৎপন্ন। আর উত্তর ভারতের অধিকাংশ লিপির উৎপত্তি ঘটেছে ব্রাহ্মীলিপি থেকে।

ধর্মীয় ঐক্য: 

বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বাসস্থান এই ভারতবর্ষে ধর্মগত ব্যাপারেও যথেষ্ট বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। হিন্দু, ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—এই চারটি প্রধান ধর্ম ছাড়াও জৈন ও শিখ এই দুটি স্থানীয় ধর্মেরও অস্তিত্ব এখানে বিরাজমান। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, গীতা, রামায়ণ-মহাভারত সকল হিন্দুর কাছেই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। মূল সংস্কৃত রামায়ণ ও মহাভারতকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষায় রামায়ণ-মহাভারত রচিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন ধর্মগুরুরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মপ্রচার করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যের সঞ্চার করেছেন। শঙ্করাচার্য, শ্রীচৈতন্য, মাধবাচার্য, বল্লভাচার্য, তুকারাম, নানক, কবীর, তুলসীদাস, সুফিসন্ত শেখ সেলিম চিস্তি, খাজা মৈনুদ্দিন চিস্তি প্রমুখ ধর্মপ্রচারকদের অবদান এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

প্রাকৃতিক ঐক্য: 

প্রাকৃতিক দিক থেকেও ভারতবর্ষে বৈচিত্র্য বিদ্যমান। কোথাও আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক, আবার কোথাও নাতিশীতোষ্ণ, কোথাও শীত, আবার কোথাও প্রচণ্ড গরম। কোথাও বা বছরের প্রায় সব সময়ই বৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আবার সিন্ধু ও রাজপুতানার কিছু কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম।

রাজনৈতিক ঐক্য: 

প্রাচীন যুগে ভারতে রাজনৈতিক অনৈক্য বিদ্যমান থাকলেও সমগ্র ভারতব্যাপী রাজনৈতিক ঐক্যের আদর্শ কিন্তু সুপ্রাচীন ‘ভারতবর্ষ’ নামটির সঙ্গে বিশাল অধীশ্বর একটি সার্বভৌম রাজতন্ত্রের ধারণাও জড়িত। বেদ, পুরাণ প্রভৃতিপ্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্যে ‘রাজচক্রবর্তী’ ‘একরাট’, ‘বিরাট’, ‘সম্রাট’, ‘রাজাধিরাজ’ প্রভৃতি উপাধি এবং ‘রাজসূয়’, ‘বাজপেয়’, ‘অশ্বমেধ’ প্রভৃতি যজ্ঞের কথা বারংবার উল্লিখিত আছে। প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের আদর্শ কতটা প্রবল ছিল—এগুলিই তার  প্রমাণ।

অন্তরের ঐক্য: 

ভারতীয় ঐক্যের আদর্শ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক স্মিথ ভারতবাসীর এক গভীর আন্তরিক ও মৌলিক ঐক্যের কথা বলেছেন। তাঁর মতে জাতি, ধর্ম, ভাষা ও আচার-আচরণের পার্থক্য সত্ত্বেও এক আন্তরিক ও মৌলিক ঐক্যবোধ ভারতবাসীকে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করেছেন। এই ঐক্যবোধ কোনোপ্রকার রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ঐক্যের উপর নির্ভরশীল নয়—এই একতা হল সম্পূর্ণভাবে ভারতবাসীর অন্তরের একতা।

ভারতবর্ষের ইতিহাস- ভৌগোলিক পরিবেশ- প্রত্নতত্ত্ব প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষ- প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান ও মেহেরগড় সভ্যতা

ভারতের জনগোষ্ঠী

Leave a Comment